প্রশান্তি পার্ককে সাময়িক বিদায় জানিয়ে আমরা বান্দরবানের পথে বের হলাম। যখন বের হই তখন ঘড়িতে ৮:৩০ মিনিট। নাস্তা না করেই বের হলাম। ইচ্ছে ছিলো পাহাড়ি পথে কোনো মাচাং বা টং দোকানে বসে নাস্তা করে নিবো। ১৫-২০ মিনিটের মধ্যেও লিচু বাগান ফেরিঘাট চলে আসলাম। পাহাড়ি পথে এরকম ফেরি সার্ভিস দেখে খুব ভালো লাগলো এবং ফেরি নিয়ে বিভিন্ন স্মৃতি মনে পড়ে গেলো। ছোটবেলায় ঢাকা আসার জন্য আমাদের মুক্তারপুর ফেরি পার হতে হতো। এখন সেই ফেরি নেই। ২০০৭ সাল থেকে সেতু হয়েছে। এখনো প্রতিবার বাড়ি যাওয়ার সময় সেতুর নিচে ফেরিঘাটের দিকে তাকিয়ে থাকি আর স্মৃতি হাতড়ে বেড়াই। যদিও ফেরির পল্টুন আর কয়েকটা ফেরি এখনো অবহেলায় পরে আছে অর্ধ ডুবন্ত আর ডুবন্ত অবস্থায়। লিচু বাগান ঘাটে ফেরির জন্য খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হলোনা, ওপার থেকে যাত্রী ও যানবাহন বহন করে এসে ঘাটে থামলো সাথে নামার জন্য তারাহুরো শুরু হয়ে গেলো। অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা ফেরিতে উঠে গেলাম।

কর্ণফুলীর পানি অসম্ভব সুন্দর রঙ ধারণ করেছে, খুব ইচ্ছে করছিলো ঝাপিয়ে পড়ি পানিতে আর হারিয়ে যাই ছোটবেলায়। চাইলেই সব ইচ্ছেগুলো এখন আর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়না তাই আফসোস রয়ে গেলো। ফেরি এপারে নোঙর করতেই মানুষের নামার জন্য তারাহুরো শুরু হয়ে গেলো, আমরাও নেমে যাত্রা শুরু করলাম।

রাঙ্গামাটি-বান্দরবান এই সড়কটা বেশ রোমাঞ্চকর, এই সড়কে তিনটা জেলা যুক্ত। প্রথমে প্রশান্তি পার্ক থেকে বের হয়ে আসা যেটা রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলায়। তারপর শেখ রাসেল ইকো পার্ক, লিচুবাগান ফেরিঘাট এলাকা চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলায়। ফেরি পার হলে রাঙ্গামাটির রাজস্থলী উপজেলা, কিছুদূর গেলে আবার চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সুখ বিলাসপুর সহ বেশ কিছু অংশ তারপর বাঙ্গালহালিয়া থেকে শুরু বান্দরবান সদর উপজেলা। এই রাস্তায় রয়েছে দুইটি জাতীয় উদ্যান।

কোথাও সমতল কোথাও উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ পেড়িয়ে আমরা চলতে লাগলাম। আমরা সকালের নাস্তা করে বের হয়নি, উদ্দেশ্য ছিলো কোনো পাহাড়ি দোকানে পেপে, কলা, আনারস দিয়ে সেরে নিবো সকালের নাস্তা। কিন্তু সেরকম না পেয়ে ব্যাগ থেকে বিস্কুট বের করে খেতে হলো। আমরা ধীরে ধীরে সময় নিয়ে এগুচ্ছিলাম। অচেনা পাহাড়ি পথের সৌন্দর্য সময় নিয়ে উপভোগ করা ছিলো আমাদের উদ্দেশ্য।

আমাদের নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য কভার করতে হবে এরকম তারাহুরো ছিলোনা। ভ্রমণ আমার কাছে একটা শিল্প মনে হয়, যদি সময় নিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে ভ্রমণ টাকে উপভোগ করা যায় তাহলেই কেবলমাত্র এর উৎকর্ষ সাধিত হয় । সবাই ভ্রমণ করতে পারেনা, যারা ভ্রমণ করতে বের হয় এরমধ্যে অনেকেই শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু গন্তব্য ছুয়ে দেওয়ার জন্য বের হয়, তাদের জন্য আমার খুব মায়া হয়।

আমরা কোনো যাত্রী ছাউনি, বড় গাছের ছায়া এমনকি ফাকা রাস্তায় কথা বলার মতো কাউকে পেলে সে জায়গায় বিশ্রাম নিয়েছি কথা বলেছি। এভাবে আস্তে আস্তে এগুতে এগুতে একসময় বান্দরবান প্রবেশ করি। যখন বান্দরবান প্রবেশ করি তখন প্রায় সকাল ১১:৩০ মিনিট। আমরা প্রথমেই থাকার জন্য একটা ব্যবস্থা করার চেষ্টা করি। শহর থেকে একটু নিরিবিলি জায়গা খুঁজছিলাম তবে কম বাজেটের মধ্যে। কিন্তু সেদিন শুক্রবার হওয়াতে কোথাও কম বাজেটে রুম পাওয়া যাচ্ছিলো না। এমনকি ১০০০ টাকার নন এসি রুম ১৮০০ টাকার নিচে দিচ্ছেনা।

এরকম অবস্থায় আমরা বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ রেস্ট হাউজের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম ঢুকে দেখি ব্যবস্থা হয় কিনা। কেয়ারটেকার থেকে জেনে নিলাম রুম ফাঁকা আছে। কিন্তু দায়িত্বশীল কর্মকর্তা অনুমতি না দিলে রুম পাওয়া যাবেনা। কেয়ারটেকার থেকে ফোন নম্বর নিয়ে কর্মকর্তার সাথে কথা বলে দুজনের পরিচয় দেওয়াতে রুম পেয়ে গেলাম। দুই বিছানার এক বিশাল রুম ভাড়া ৩০০ টাকা। একদম আমাদের সাধ্যের মধ্যে, খুশি মনে রুমে প্রবেশ করলাম।

এবার গোসল করে ফ্রেস হয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। তারপর দুপুরের খাবারের জন্য বের হলাম। দুপুরের খাবার খেলাম রেস্টুরেন্টে শুধু ভর্তা, ভাজি, সবজি আর ডাল দিয়ে। খাওয়া শেষ করে ঘুরতে বের হলাম। রুমার রাস্তায় রওনা করলাম। শুরু হলো পাহাড়ি রাস্তায় রোমাঞ্চকর ও চ্যালেঞ্জিং বাইক রাইড। রাস্তার পাশেই রয়েছে বিশাল বিশাল খাদ, চালানোর ক্ষেত্রে একটু এদিকসেদিক হলেই চলে যেতে হবে কয়েকশত ফুট নিচে। কোথাও কোথাও খুব মারাত্মক কিছু বাক এবং সাথে সাথেই আপহিল কিংবা ডাউনহিল, পার হওয়ার সময় অনেক সময়ই আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হওয়ার মতো অবস্থা, এই বুঝি গেলো। কিন্তু আসিফ ভাই দক্ষ চালক, সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করেই উনি ড্রাইভিং করেন কিন্তু এরকম রাস্তায় আপনার অজানা একটা ভয় কাজ করবেই এবং করাটাই স্বাভাবিক।

আমরা এগিয়ে যাচ্ছি সামনের দিকে, দুইপাশে অতুলনীয় সৌন্দর্যময় পাহাড়ি দৃশ্য। দূরে দূরে কোথাও চোখে পড়ে কিছু পাহাড়ি বাড়িঘর। রাস্তার পাশে গড়ে উঠেছে পর্যটকদের আরাম আয়েশের জন্য বিবিন্ন বাহারি নামের অবকাশ যাপন কেন্দ্র বা রিসোর্ট। তবে আমার মনে হয় এরকম আধুনিক সুবিধাযুক্ত রিসোর্ট বা হোটেল তৈরি না করে অধিবাসীদেরকে সংযুক্ত করে যদি কমিউনিটি বেইজড আবাসনের ব্যবস্থা করা যেতো তবে পর্যটকরা পাহাড়ের সংস্কৃতির সাথে নিবিড়ভাবে মিশতে পারতো এবং তাদের সম্পর্কে জানতে পারতো। সেইসাথে স্থানীয়রা আর্থিকভাবে একটা নিশ্চিত আয়ের সুযোগ পেতো।

আমরা প্রথম মিলনছড়ি পুলিশ চেক পোস্টে এসে থামলাম। এখান থেকে সাঙ্গু নদীর চমৎকার একটি ভিউ পয়েন্ট আছে, খুব মোহনীয় একটা সৌন্দর্য পাওয়া যায় এখান থেকে। এখানে বেশ কিছু ছবি তুললাম আমরা, একটা মজার বিষয় আছে এখানে। একটা কাঠের ফ্রেম বানানো আছে যেটার উপরের দিকে লেখা ‘আমি এখন মিলনছড়ি’ আমরা এই ফ্রেমে দাড়িয়ে ছবি তুললাম।

তারপর রওনা দিলাম আবার, শৈল প্রপাতে গিয়ে পরের বিরতি নেওয়ার কথা কিন্তু ঝমঝম শব্দে লোহার ব্রিজ পার হয়ে চলে গেলাম পাহাড়ের ওপারে। এখান থেকে রুমা ৩৯ কিলোমিটার ও নীলগিরি ৩৭ কিলোমিটার। আমরা আর সামনে না এগুনোর সিদ্ধান্ত নিলাম।
(চলবে…)

পূর্বের দুইটি পর্ব দেখুন এই লিঙ্কে:
পর্ব ১:
https://www.vromonguru.com/all-divisions/chattagram-division/bike-tour-1st/
পর্ব ২:
https://www.vromonguru.com/all-divisions/chattagram-division/bike-tour-2nd/
ভ্রমণগুরুতে প্রকাশিত আমার সব পোস্ট পড়তে ভিজিট করুন এই লিঙ্কে:
https://www.vromonguru.com/author/jewel/
পরবর্তী পর্বের জন্য সাথেই থাকুন।
ভ্রমনগুরু your travel adviser