in ,

বাইক ট্যুরে বান্দরবান: কাপ্তাইয়ে ক্যাম্পিং

শেখ রাসেল ইকো পার্ক পার হওয়ার পরে একটা ছোট্ট বিরতি নিলাম, আসিফ ভাই বাইক চালাচ্ছে কিন্তু ব্যাগ নিয়ে পিছনে বসে থাকতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিলো। একটা হোটেলে বসে বিশ্রাম নিলাম, নাস্তা করলাম মোগলাই পরোটা আর চা দিয়ে। তারপর আবার যাত্রা শুরু প্রশান্তির উদ্দেশ্যে। এখান থেকে প্রশান্তি পার্ক খুব একটা দূরে নয় কিন্তু হঠাৎ করেই যেনো ঘোর অন্ধকার হয়ে গেলো। মাত্র সন্ধ্যা নামতেই মনে হচ্ছে গভীর রাত। অল্প সময়েই পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে। আগে থেকে ম্যানেজারকে বলে রেখেছিলেন ইউসুফ রানা ভাই, আমরা গিয়ে ম্যানেজারের সাথে পরিচিত হলাম। তারপর ঘুরে ঘুরে প্রশান্তি পার্ক দেখতে থাকলাম।

সোনায় মোড়ানো ভোর। ছবি: লেখক

এটা কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে বন বিভাগের তৈরিকৃত পার্ক ও পিকনিক স্পট। বেসরকারি ব্যাবস্থাপনায় চালানো হয় লিজের মাধ্যমে। বেশ কয়েকটি কটেজ ও জুমঘর আছে থাকার জন্য। যে কেউ ফ্যামিলি বা বন্ধু পরিজন নিয়ে নিরাপদে থাকতে পারেন। পার্কের আয়তন বেশ বড়, সম্পূর্ণ জায়গাটা গাছে পরিপূর্ণ এবং গাছে গাছে বিভিন্ন পাখির ডাকাডাকি মন ভালো করে দিবে যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমীর। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কর্ণফুলী নদী। অপার্থিব সৌন্দর্যের  সবুজাভ জলে কুয়াশার আস্তরন ভেদ করে কায়াক চালানো কিংবা ছলাৎ ছলাৎ বৈঠা বেয়ে কোনো ডিঙি নৌকার ধীরলয়ে ছুটে চলা মন প্রফুল্ল করে। এছাড়া সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো নদীর তীরে আছে ছনের ছাউনিযুক্ত বাশের তৈরি কয়েকটি মাচাং। যেখানে বসে কাটিয়ে দিতে পারেন প্রিয়জনের হাত ধরে কয়েকটি বেলা। কিংবা হারিয়ে যেতে পারেন দীঘির জলে অবিরাম বর্ষিত বৃষ্টি ফোটার শব্দে পুরনো কোনো স্মৃতি রোমন্থনে। সবচেয়ে উপভোগ্য মাচাংয়ে বসে সূর্যোদয়ের মুহূর্তটা। সোনালি আভায় চারপাশ উদ্ভাসিত করে চিকচিক করা রৌদ্র কণা নদীর জলে বিচ্ছুরণ করে নিজের সূয্যি মামার উদয় মনে গেথে রবে বহুদিন।  

সোনালি আভায় সূর্যোদয়। ছবি: লেখক

সবে বসন্ত শুরু হয়েছে, এখনো প্রকৃতিতে রয়ে গেছে শীতের রেশ। হিম হিম ঠাণ্ডার অনুভূতি আর আকাশে চাঁদের উপস্থিতি মিলিয়ে অন্যরকম মায়াময় এক পরিবেশ তৈরি হলো। এরমধ্যে আমরা গাছের সাথে হ্যামক ঝুলিয়ে শুয়ে পড়লাম। আগের রাতের নির্ঘুম ডিউটি সেইসাথে সারাদিনের ভ্রমণ ক্লান্তিতে আমার চোখ খুলে রাখা অসম্ভবের পর্যায়ে চলে যাচ্ছিলো। কখন যেনো নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। সম্বিৎ ফিরলো আসিফ ভাইয়ের ডাকে। রাতের খাবার খেতে হবে। প্রশান্তি রেস্টুরেন্টে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে সেটা আগে থেকে বলে দিতে হয়। আমরা যেহেতু আগে বলেনি তাই সেরকম ভালো খাবারের ব্যবস্থা হলোনা।

হ্যামকে ঝুলাঝুলি। ছবি: লেখক

অগত্যা খাবারের খোঁজে চলে গেলাম কাপ্তাই। আমরা কাপ্তাইয়ের বিখ্যাত মাস্টার হোটেলের খোঁজে কিছু সময় ব্যয় করেই সফল হলাম না। মাস্টার হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়াতে অন্য একটা হোটেলে বসে ভাত খেলাম রুই মাছ দিয়ে। কিন্তু আসিফ ভাই মুরগী খুব পছন্দ করে তাই উনি মুরগীর মাংস দিয়েই খাবেন। আমি যেখানে যাই সেখানে যেটা বেশি পাওয়া যায় সেটাই খাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু আসিফ ভাইকে সেন্ট মার্টিন গিয়েও মুরগী খুঁজতে দেখেছি। অথচ আমি সেন্ট মার্টিন যেই কদিন থাকি প্রত্যেক বেলাতেও সমুদ্রের মাছ খাওয়ার চেষ্টা করি। খাবার শেষ করে বাজারে কতোক্ষণ ঘুরাঘুরি করলাম। নদীর ঘাটে গিয়ে দেখি বিশাল কর্মজজ্ঞ চলছে। বিভিন্ন ট্রলারে মালামাল উঠানামা চলছে, শ্রমিকদের ব্যস্ত হাক ডাকে মুখরিত ঘাটের আশপাশ। সবজি বা কাচা তরকারি নিয়ে ব্যস্ততা সবার এর মধ্যে কিছু লোক কাঠে আগুন জ্বালিয়ে সেখান থেকে তাপ পোহাচ্ছে। 

উষ্ণতার খোঁজে ক্যাম্প-ফায়ার। ছবি: লেখক

অতঃপর রওনা দিলাম রাতের আশ্রয়ের উদ্দেশ্য নিয়ে। কাপ্তাই বাজার থেকে প্রশান্তি পার্ক পর্যন্ত জায়গাটুকু প্রায় ৫ কিলোমিটার। এই জায়গা আমাদের কাছে অনন্তকাল মনে হচ্ছিলো। গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ হওয়াতে অত্যধিক ঠাণ্ডা লাগছিলো সেইসাথে বাইক চালানোর ফলে বাতাসের গতিও কয়েক গুণ বেড়ে গেলো। প্রশান্তি পার্কে পৌঁছে আমরা স্থান নিলাম নদীর তীরে স্থাপিত মাচাংয়ে। বাশের তৈরি মাচাং উপরে ছনের ছাউনি। এখানেই তাঁবু স্থাপন করলাম। এখন সারাদিনের ক্লান্ত দেহ একটু প্রশান্তির খোঁজে আজ আশ্রয় নিয়েছে পার্কে কিন্তু প্রশান্তি কি সহজেই মেলে? আমি শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছি আর ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি এরমধ্যে আসিফ ভাই বলে উঠেন উপরে হেঁটে আসি, ঠাণ্ডা লাগতেছে আগুন জ্বালিয়ে ক্যাম্প ফায়ার করি। আবার উঠে আসলাম গাছের ডালপালা খুঁজে আগুন জ্বালানো হলো। দুজন বসে বসে উত্তাপ নিচ্ছি। সেইসাথে দপ করে জ্বলে উঠলো পাশের কটেজে থাকা পিকনিক গ্রুপের গানের গলা। সারারাত চললো বিভিন্ন গান আর চটুল রসিকতা। শেষরাতে কোনোরকমে একটু ঘুমালাম। ভোর হতেই ঘুম ভেঙে গেলো। তাঁবুর চেইন খুলে বাইরে তাকাতেই অবাক দৃষ্টিতে বিস্ময়ভরা মুগ্ধতায় মুখ হা হয়ে গেলো!

আমাদের তাঁবুবাস। ছবি: লেখক

অপার্থিব এক সৌন্দর্যের জাল বুনেছে প্রকৃতি সারারাত ধরে। কুয়াশাজড়ানো মায়াময় অনাবিল সৌন্দর্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চারিদিকে। স্বচ্ছ সবুজাভ জলে কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ সেই সাথে পুর্বের আকাশে সোনালী আভা ছড়িয়ে সূর্যমামার কিরণে ঝলমলিয়ে উঠছে ধরনী। চাদর গায়ে এক মাঝী ডিঙি নৌকা বেয়ে যাচ্ছে বৈঠার আঘাতে   জলের মায়াবী বাধন ভেঙে। সবকিছু মিলিয়ে অবর্ননীয় এক সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে যার খুব ক্ষীণ অংশই বর্ননা করা যায়। চুপচাপ বসে জীবনের অন্যতম স্বরনীয় এই সকাল উপভোগ করলাম বেশ সময় নিয়ে। 

নতুন আশার সূর্যোদয়। ছবি: লেখক

আমাদের আজকের প্ল্যান বান্দরবান যাওয়া। বান্দরবান যাওয়ার জন্য কাপ্তাই থেকে লিচুবাগান ফেরি পার হয়ে একটি রাস্তা আছে যার দূরত্ব ৫৮ কিলোমিটার। কিছুটা সমতল এবং বেশ কিছু পাহাড়ি পথ। আমাদের যাওয়ার জন্য প্রায় দুই ঘণ্টা লাগবে তাই তাঁবু এবং অন্যান্য জিনিসপত্র গুছিয়ে তৈরি হিয়ে নিলাম। বান্দরবান গিয়ে যেহেতু ক্যাম্পিং করার সুযোগ নেই তাই তাঁবুসহ ক্যাম্পিংয়ের বিভিন্ন উপাদানগুলো এখানেই ম্যানেজারের কাছে রেখে গেলাম। একটা ব্যাগে অতি প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে সকাল ৯ টার আগেই রওনা দিলাম বান্দরবানের উদ্দেশে। 

স্বাগতম নতুন দিনে। ছবি: লেখক

লিচুবাগান ফেরিতে খুব অল্প সময়েই পার হওয়া যায়, যানবাহনের খুব একটা চাপ নেই। বেশিরভাগই মোটরসাইকেল কিছু পিক আপ, ব্যাক্তিগত গাড়ি। মোটরসাইকেল পার হওয়ার জন্য ফেরিতে দিতে হলো ৫ টাকা। ফেরি পার হওয়ার পরেই একটা চা বাগান আছে। আমাদের পরিকল্পনা ছিলো চা বাগানে যাওয়ার কিন্তু ফেরার পথে যাবো বলে আর যাওয়া হয়নি। ফিরতি পথেও আর যাওয়া হয়নি।

(চলবে…)

প্রশান্তি পার্কে যোগাযোগ:
01879-157721

ফেসবুক পেজ:
https://www.facebook.com/kaptaipark/

গুগল ম্যাপ লোকেশন:
http://কাপ্তাই প্রশান্তি পার্ক Chittagong – Kaptai Rd https://maps.app.goo.gl/KkHVdzuwUDuNm1rf6

এই গল্পের প্রথম পর্ব পড়ুন এই লিঙ্কে:
https://www.vromonguru.com/all-divisions/chattagram-division/bike-tour-1st/

ভ্রমণগুরুতে প্রকাশিত আমার সব পোস্ট দেখুন এই লিঙ্কে:
https://www.vromonguru.com/author/jewel/

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বাইক ট্যুরে বান্দরবান: যাত্রা হলো শুরু

ভূষণার রাজা সীতারামের দেশে: রাত্রি শেষে গান