fbpx

বাবাকে সাইকেলে নিয়ে কিশোরী মেয়ের ১২০০ কিলোমিটার

দিল্লী থেকে বিহারের দ্বারভাংগা গ্রামের দূরত্ব ১২০০ কিলোমিটার। ভারতের চতুর্থ দফা লকডাউনের সময় পরিযায়ী (মাইগ্রেটেড) শ্রমিকদের হাজার কিলোমিটার পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরার ঘটনা সবাই শুনেছেন। কিন্তু কিশোরী মেয়ের বাবাকে সাইকেলের পেছনে নিয়ে ১২০০ কিলোমিটার চালিয়ে বাড়ি ফেরার ঘটনা হার মানিয়েছে সব কিছুকেই। অবিশ্বাস্য এ ঘটনার জন্ম দিয়েছেন জ্যোতি কুমারী।

দিল্লীর গুরুগ্রামে ই-রিকশা চালাতেন জ্যোতির বাবা মোহন পাশওয়ান। কিন্তু লকডাউনে সব কিছু বন্ধ থাকাতে ই-রিকশা (ইজি বাইক) ফেরত দিতে হয়েছিলো রিকশা মালিককে। এদিকে পায়ের ব্যথার সমস্যার কারণে বাবার পক্ষেও সাইকেল চালানো সম্ভব ছিলোনা। দিল্লীর সাথে সব জায়গার ট্রেন বন্ধ, খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন ট্রাক ভাড়া করে যাওয়া সম্ভব তবে সেজন্য দিতে হবে ৬,০০০ রুপি।

বাবার মোহনের সাথে কিশোরী জিয়তি কুমারী। ছবি: ফেইসবুক থেকে সংগৃহীত

এদিকে আয় রোজগার না থাকায় বাবা-মেয়ের হাতে টাকা নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় বাবাকে সাইকেলের পেছনে বসিয়ে বিহারে নিজেদের গ্রামে ফিরে যাওয়ার অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্ত নেন অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া মাত্র পনের বছর বয়সী জ্যোতি কুমারী। ১০ই মে চতুর্থ দফা লকাডাউনের মধ্য দিয়ে তাদের যাত্রা শুরু হয়।

৫০০ রুপি দিয়ে তারা একটি সেকেন্ড হ্যান্ড সাইকেল কিনে নেন। আর মাত্র ৬০০ রুপি হাতে নিয়েই বেড়িয়ে পড়েন ১,২০০ কিলোমিটার পেছনে কাউকে নিয়ে সাইকেল চালানোর অসাধ্য সাধনে। ১০ই মে শুরু হওয়া তাঁদের এই যাত্রার শেষ হয় ১৬ই মে ২০২০। তার মানে প্রতিদিন জ্যোতি বাবাকে নিয়ে সাইকেল চালিয়েছেন গড়ে ১৭০ কিলোমিটারেরও বেশি। একটু বোঝার সুবিধার্থে বলি, ট্যুর ডি ফ্রান্সের মতো আন্তর্জাতিক সাইক্লিং প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগীরা সাত দিনে এধরণের দূরত্ব সাইকেল চালায়।

তবে জ্যোতি বলেছেন সে একটুও ভয় পায়নি এ যাত্রার ব্যপারে। মেয়েদের জন্য যেখানে শহরের বাইরেই সাইকেল চালানো কঠিন ব্যপার সেখানে হাইওয়েতে দিনের পর দিন সাইকেল চালানো কথা চিন্তা করাও অসম্ভব। জ্যোতি বলেছেন তার ভয় ছিলো পেছন থেকে তাদেরকে কোন গাড়ি ধাক্কা দেয় কিনা, কিন্তু রোড একসিডেন্ট ছাড়াই তারা শেষ করতে পেরেছে এই দুঃসাহসিক যাত্রা।

এভাবেই পরিযায়ী শ্রমিকরা পায়ে হেঁটে পাড়ি দিচ্ছে হাজার কিলোমিটার। ছবি: India Tv

পথে পথে হাজারো পরিযায়ী দিনমজুররা পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলো। তাই হাইওয়েতে দিন রাতে সবসময় মানুষ থাকাতে তাদের ভয় লাগেনি। প্রতি রাতে ২-৩ ঘণ্টা করে বিশ্রাম ছাড়া প্রায় পুরোটা সময় চালিয়েছেন তারা। রাতের বিশ্রাম নিয়েছেন পেট্রোল পাম্পগুলোতে। আর পথে পথে খেয়েছেন মানুষের ত্রাণের দেয়া খাবার দাবার। সবাই তাদেরকে যথাসাধ্য সাহায্য করেছেন।

অবশেষে যেদিন ৭ দিন পরে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পর তারা প্রথমে আশ্রয় নিয়েছিলেন গ্রামের পাঠাগারে। সেখান থেকে স্থানীয় প্রশাসনের তাদেরকে ১৪ দিনের কোয়ারাইন্টাইনে পাঠান নির্ধারিত স্কুলে। তবে একমাত্র মেয়ে হওয়াতে জ্যোতিকে বাসায় ফেরত পাঠানো হয়, সেখানেই সে হোম কোয়ারাইন্টাইনে আছে।

ইন্ডিয়া টুডে থেকে টুইট করা ভিডিওতে জিয়তি

জ্যোতির ঘটনায় পুরো ভারতবর্ষজুড়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। একদিকে যেমন এই মেয়ের অসীম সাহস ও শক্তির প্রশংসা চলছে একই সময়ে পরিযায়ী শ্রমিকদের এই দুরাবস্থায় ফেলার জন্য দোষারোপ করা হচ্ছে ভারতের জাতীয় সরকারকে। এখনো ভারতের হাইওয়েগুলোতে দল বেঁধে পরিযায়ী শ্রমিকদের হেঁটে বা সাইকেলে করে বাড়ি ফেরার করুণ দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।

ভিডিওতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে বাড়ি ফিরছে পরিযায়ী শ্রমিকরা

জ্যোতির এত বড় অর্জন কিন্তু তার ভাগ্যও খুলে দিয়েছে। ভারতের সব পত্রপত্রিকায় আসার পর বিষয়টি নজর কেড়েছে সেদেশের সাইক্লিং ফেডারেশনের। ইন্ডিয়ান সাইক্লিং ফেডারশনের সভাপতি অংকার সিংহ জানিয়েছেন তারা জ্যোতির সাথে যোগাযোগ করেছেন এবং ট্রায়ালের সুযোগ দিবেন। লকডাউন উঠে গেলে দিল্লীতে বিশেষ ধরণের কম্পিউটারাইজড বাইসাইকেলে এ পরীক্ষা হবে।

সন্তোষজনক নাম্বার পেলে জ্যোতি সেখানে স্থায়ীভাবে সাইক্লিং দলে যোগ দিতে পারবে। অংকার সিংহ বলেছেন এভাবে ১,২০০ কিমি সাইকেল চালানো মুখের কথা নয়। নিশ্চয়ই তার সেইরকম শারীরিক শক্তি ও প্রতিভা রয়েছে। ট্রায়াল পাশ করতে পারলে সাইক্লিং ফেডারেশন তার সব দায়িত্ব নিবে। এছাড়া ট্রায়ালে আসার জন্য তার ও পরিবারের একজন সদস্যের সমস্ত ব্যয়ভার বহন করবেন তারা।

সর্বশেষ আপডেট:

বিবিসির সাথে সাক্ষাৎকারে জ্যোতি জানিয়েছেন এই ১,২০০ কিমির কিছুটা পথ তারা ট্রাকের সাহায্যে (লিফট নিয়ে) এসেছেন। তবে ঠিক কতোটা পথ ট্রাকে পাড়ি দিয়েছেন সেটা আলাদা করে বলতে পারেননি। এছাড়া সাইক্লিং ফেডারেশনের প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন লেখাপড়া করতে চান বলে। তবে পুরো এলাকায় তার সাহসিকতার গল্প ছড়িয়ে পড়েছে, ভারত সরকার তাদের বাসায় বাথরুমে ও পানির সুবিধা নিশ্চিত করেছে। এছাড়া জ্যোতির পড়ালেখার দায়িত্বও নিয়েছে। এর আগে অভাবের কারণে জ্যোতির পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছিলো।

হিন্দুস্তান টাইমস ও টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে

ফিচার ছবি: Indianexpress.com

Back to top