fbpx

শিখর ছোঁয়ার গল্প: দলিয়ান পাড়া, বেসক্যাম্প

তেহজীবের জন্মদিনে হিট দ্য ট্রেইল পরিবার যখন ওর তাজিংডংয়ের চূড়ায় দাঁড়ানো ছবি দেয়া কেক নিয়ে আসলো, তখনই প্ল্যান হয়ে গিয়েছিল ডিসেম্বরে গ্রুপের যোগী-জো-ত্লং সামিটে আমরাও যাচ্ছি। ওর স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষাটা শেষ হতে যা দেরি, আমাদের প্রস্তুতি নিতে দেরি হলো না। মনে আনন্দ, মাথায় দুশ্চিন্তা। আনন্দ কারণ, প্রিয় মানুষগুলোর সাথে অনেকদিন পর পাহাড়ে যাচ্ছি। আর দুশ্চিন্তা কারণ, বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে কঠিন আর দূর্গম ট্রেইলে হাঁটতে হবে এইবার। 

জো-ত্লং বা মোদক মুয়াল বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাহাড়। উচ্চতা ৩,৩৪৫ ফিট।৷ উচ্চতার দিক থেকে দ্বিতীয় হলেও আরোহণের দিক থেকে অসম্ভব কষ্টকর এবং খুবই এক্সট্রিম। অন্যদিকে, যোগী হাফং বা কংদুক ৪র্থ সর্বোচ্চ পাহাড়। যোগী হাফংয়ের উচ্চতা ৩,২২২ ফিট। 

ডলফিন পরিবহনের জন্য অপেক্ষায় ছিলাম যখন, একে একে মামুন ভাই, পলাশ ভাই, দুরন্ত ভাই হাজির হলেন। জানলাম, তাজিংডং ট্যুরের প্রায় নয়জন যাচ্ছি আমরা এইবার একসাথে। বাহ! তাজিংডংয়ের গেট টুগেদার ট্যুর হতে যাচ্ছে এটা, ভাবলাম আমি। বাকি আটজন আমাদের অপরিচিত। যদিও শেষ পর্যন্ত কেউ আর অপিরিচিত ছিলেন না। ট্যুরে গেলে এমনই হয়। কুম্ভের মেলায় হারিয়ে যাওয়া সব ভাইবোন পাওয়া যায়! 

আমাদের হাওয়াই গাড়ি। ছবি: মোস্তাক হোসেন

বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে ছুটিকে কেন্দ্র করে অনেক ইভেন্ট ছিল তখন। খোদ যোগী-জো-ত্লংয়েই চেনাশোনা চারটা গ্রুপের ইভেন্টের কথা জানতাম। ভেবেছিলাম অনেক জ্যাম হবে, রাস্তায়ই আটকে থাকবো। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ভোরেই ডলফিন আমাদের বান্দরবান শহরে নামিয়ে দিলো। বাস থেকে নেমে পরিচিত মুখগুলোকে দেখে খুশি হলাম। বিশেষ করে, সুমাইয়াকে দীর্ঘ আট মাস পর দেখছিলাম। খুব ভালো লাগছিল। অচেনা যারা ছিলেন, চান্দের গাড়িতে তাদের সাথেও কথা হয়ে গেল। থানচি রওনা হলাম আমরা। যেতে যেতে এক জায়গায় দেখি সাদা মেঘের ভেলা। সেখানে নেমে সবাই ছবি তুললাম। থানচি যাবার পথে বলিপাড়া আর্মি ক্যাম্পে নামতে হয় এন্ট্রি করতে। সেখানে দেখা টুম্পার সাথে। ও বেঙ্গল ট্র‍্যাকার্স গ্রুপের সাথে আমিয়াখুম যাচ্ছিলো। বলিপাড়ায় সবাই টুকটাক খেয়ে নিলাম। তারপর আবার যাত্রা শুরু। চান্দের গাড়িতে গান গাইতে গাইতে কিভাবে যেন সময়টা চলে যায়, টের পাওয়া যায় না। 

বলিপাড়া ক্যাম্পে এন্ট্রি। ছবি: মোস্তাক হোসেন

থানচি পৌঁছে গেলাম। জুন মাসে আমিয়াখুম ট্যুরের পর আর এদিকে আসা হয়নি। অনেক পরিবর্তন এসেছে থানচিতে। থানচি থানায় নাম-ধাম লিখে পুলিশের কাছে এন্ট্রি করতে হলো। তারা আমাদের গ্রুপ ছবিও তুলে রাখলেন। থানচিতে সাঙ্গুর পাড়ে বিজিবি পরিচালিত একটা ক্যান্টিন চালু হয়েছে, নাম সাঙ্গু ক্যান্টিন। সেখানে দেখা হয়ে গেল সবুজ ভাইদের সাথে। ভাই টিজিবির সাথে যোগী-জো-ত্লং যাচ্ছেন। আরো দেখা হলো অনন্যার সাথে। অনন্যা আমাদের দেখেই জড়িয়ে ধরলো। ফেসবুকের পর এই প্রথম দেখা! সাঙ্গু ক্যান্টিনে বসেই আমরা খেয়ে নিলাম ভাত, আলু ভর্তা, মুরগী। তারপর সেখানেই বিজিবি ক্যাম্পে আবার নাম এন্ট্রি করলাম। এক বিজিবি সদস্য এসে তো আমাদের গাইড শফিউল ভাইকে রীতিমতো জেরা। তেহজীবকে দেখে হাজারটা প্রশ্ন শুরু করলেন। ‘এই বাচ্চা কিভাবে যাবে? কোথায় যাবে?’ একজন আবার বলে বসলেন, ‘এই মেয়ে অনেক জায়গায় গিয়েছে!’ মনে মনে প্রমাদ গুণলাম। না জানি বেফাঁস কিছু বের হয়ে যায়। বেশ কিছুক্ষণ ইতস্তত করার পর অনুমতি মিললো অবশেষে। যার যার লাইফ জ্যাকেট নিয়ে রওনা হলাম। সাঙ্গুর নৌকাভ্রমণে লাইফ জ্যাকেট সাথে রাখতে হবে, এমন নির্দেশনাই দেয়া আছে। 

ডুবো পাথর, চারদিকে উঁচু পাহাড়, নীল আকাশ চিরে শুরু হলো নৌকার চলা। আমি ভেবেছিলাম শীতের সাঙ্গু হয়তো শান্ত হবে। কিন্তু নাহ! স্রোতস্বিনী সাঙ্গুকেই দেখা গেল বরং। তিন্দুতে পৌঁছাতেই নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ করে হাতে বাইতে লাগলো মাঝি। সাঙ্গুর বুকে এতোটুকু সময় পুরোপুরি অপার্থিব। অদ্ভুত, রহস্যময় পাথরের ফাঁকফোকর গলে নৌকাটা যেতে থাকবে। একেক পাথরে মনে হবে একেক গল্প লেখা। স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসায় মাথা নুয়ে আসবে। আহ, সাঙ্গু!

সাঙ্গুর রূপ। ছবি: মোস্তাক হোসেন

ঘণ্টা তিনেক পর পৌঁছালাম রেমাক্রি। চায়ের দোকানে বসে চা, কলা, বিস্কুট খেয়ে নিলাম। আমাদের লাইফ জ্যাকেটগুলো দোকানে রেখে দিলাম। কেউ কেউ রেমাক্রি ফলসের পানিতে হাতমুখ ধুয়ে নিল। আবহাওয়া ঠাণ্ডা থাকায় গা ভেজানোর আগ্রহ নেই কারো। এখান থেকে এখন ট্র‍্যাকিং করে যেতে হবে দলিয়ান পাড়া। গাইড বললেন, তিন ঘণ্টার মতো লাগবে। ঝিরি পথ, পাহাড় পেরিয়ে যেতে হবে। শুরু করলাম হাঁটা। খারাপ লাগছিল না। লাগবেই বা কেন? পথিমধ্যে কতো চেনা মানুষ! পথে একটা পাড়া দেখলাম যার নাম পেনেডং পাড়া। জানা গেল, পেনেডং মানে কাঁঠাল। এই পাড়ায় খুব সুন্দর একটা বৌদ্ধবিহার আছে৷ এক জায়গায় চায়ের দোকান দেখে সবাই থামলো।

পাড়ার উদ্দেশে হেঁটে চলা। ছবি: মোস্তাক হোসেন

আমরা চা খাচ্ছিলাম আর দেখছিলাম পাশে কিছু পাহাড়ি ফুটবল খেলছেন। মুশতাক, পলাশ ভাই, মামুন ভাইসহ কয়েকজন চলে গেলেন খেলতে। মিনিট পনেরো চলা এই ম্যাচ ড্র হলো। আমরা ছবি তুললাম, ভিডিও করলাম। পাহাড়ি লোকগুলো বলছিলেন, যাওয়ার দিন আবার খেলবেন আমাদের সাথে। তারপর সুন্দর করে বিদায় নিয়ে আবার পথ চলা শুরু করলাম। পরে জেনেছিলাম, ওরা সাধারণ কেউ ছিলেন না। আরাকান আর্মির সদস্য ছিলেন। এবং আমরা ভিডিও করেছি দেখে ওরা আমাদের যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু শফিউল ভাই কথা বোঝেননি বিধায় আমাদের নিয়ে রওনা হয়ে যান। পরে যে গ্রুপটা যাচ্ছিলো, তাদের ওরা আটকে রেখেছিল এবং হুমকি দিচ্ছিলো। পরে পাড়ার কারবারি যেয়ে কথা বলে ওদের শান্ত করেন। কি এক অভিজ্ঞতা! 

পথে এমন ছাউনি চোখে পড়বে। ছবি: মোস্তাক হোসেন

আমরা যখন দলিয়ান পাড়ায় পৌঁছাই, সন্ধ্যা নেমে এসেছে পাহাড়ে। আমাদের জন্যে নির্ধারিত কটেজে ব্যাগপত্র রেখে, ফ্রেশ হয়ে নিলাম। পাড়াটা কয়েক স্তরে সাজানো। পাড়ায় ঢুকতেই অন্ধকারে দেখছিলাম প্রথমে সুন্দর, ছোট একটা ছাউনি, সেখানে ক্যারম বোর্ড রাখা। হয়তো পাড়ার বিনোদন কেন্দ্র। ছাউনির আশেপাশে কিছু ঘর। আমাদের থাকার জায়গা ছিল এখানেই। তারপর একটু উপরে উঠলে আবার কয়েকটা ঘর। আরো একটু উপরে উঠলে দেখা যাবে ছোট্ট, ছিমছাম একটা গির্জা আছে। আরেক ধাপ উপর দিকে গেলে চায়ের দোকান। চায়ের দোকান থেকে নিচের দিকে নামলে আরেক প্রস্ত ঘরবাড়ি। তো আমরা চায়ের দোকানের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলাম। দোকানও আমাদের কটেজ থেকে দুই/তিন ধাপ উঁচুতে। মানে, চায়ের দোকানও একটা সামিট পয়েন্ট আর কি! 

দোকানে যেয়ে মেঝেতে হাত-পা ছড়িয়ে বসলাম। পারলে ওখানেই ঘুমিয়ে যেতাম। কিন্তু এইসব জায়গায় যেয়ে ঘুমানো মহাপাপ। আমরা চা, বিস্কুট, চানাচুর গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম। এর মাঝে তেহজীব গান ধরলো। ওর সাথে সবাই তাল মিলাচ্ছিল। আধা ঘণ্টা পর মনে হলো, আমাদের তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে হবে। কারণ, পরদিন খুব ভোরেই রওনা হতে হবে। 

চায়ের দোকান। ছবি: লেখক

আমরা রাতের খাবারের জন্যে গেলাম। যে দিদির বাড়িতে খেয়েছি, উনি খুবই সুন্দর রান্না করেন। অনেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আর কথা বলেন ভীষণ মিষ্টি করে। দিদির বাড়িতে টিভি আছে, ডিশ আছে এবং সেখানে নানারকম মুভিও দেখেন তারা। আমরা সবাই মজা করছিলাম আর খাচ্ছিলাম। কিন্তু রাব্বানি ভাই খাবেন না। কারণ কি? উনি নাকি ডায়েটে আছেন। অটোফেজি ব্যাপারটা উনি নিজে পরীক্ষা করতে চাচ্ছেন। ডায়েট শুরু হয়েছে প্রায় আটদিন। এখনো চলছে এবং চলবে। তাহলে কি খালি পেটে রাত পার করতে হবে? নাহ! রাব্বানি ভাই খাবেন ডিম। তিনটা ডিম উনি ঘি দিয়ে ভেজে খাবেন। ঢাকা থেকে আড়ং ঘি নিয়ে গিয়েছেন। ওনাকে ডিম ভেজে দেয়া হলো। তারপর আমরা শুয়ে পড়লাম। ছেলেরা অবশ্য তখনই শুতে গেল না। পাড়ায় চমৎকার যে ছাউনিটা আছে, ওখানে ক্যারম খেলা হচ্ছিলো। কয়েকজন ক্যারম খেলতে চলে গেল। পরে রাব্বানি ভাই বলছিলেন, ওনারা নাকি পাহাড়িদের হারিয়ে দিয়েছিলেন। 

দিদির রান্না। ছবি: রাসেল ভাই
ক্যারম খেলা। ছবি: মোস্তাক হোসেন

আগেই ঠিক করা হয়েছিল, প্রথমদিন জো-ত্লং যাওয়া হবে। কঠিনটাই আগে হোক। দুরুদুরু বুকে, একরাশ উত্তেজনা নিয়ে, পাহাড়ে নেমে আসা হিম ঠান্ডায় কখন যেন চোখে ঘুম নেমে এলো! 

আমরা গিয়েছিলাম Hit the Trail এর সাথে। তাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দিয়ে দিচ্ছি।

https://www.facebook.com/groups/HitTheTrailBd/

মাসুম ভাই: 01672970714
রিফাত ভাই: 01931800139
রাসেল ভাই: 01873340122

ভিডিওতে আমাদের অভিযান দেখতে ক্লিক করুন এই লিংকে: https://youtu.be/xPhQXZKLNI8

বিঃদ্রঃ ঘুরতে যেয়ে আমরা জায়গা নোংরা করি না। দেশটা আমাদের। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও আমাদেরই দায়িত্ব।

আমার পুরানো ভ্রমণকাহিনীগুলো পড়তে চাইলে ক্লিক করতে পারেন এই লিংকে:
https://www.vromonguru.com/author/azmi/

ফিচার ছবি: আতাউল ইসলাম মাসুম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top