fbpx

শিখর ছোঁয়ার গল্প: জো-ত্লংয়ের পাথুরে রাজ্যে

হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। ঠাণ্ডায় কাঁপুনি উঠে গিয়েছিল। ভালো করে কম্বল মুড়িয়ে নিলাম। চোখটা বন্ধ করতেই বেরসিকের মতো এলার্ম বাজতে শুরু করলো। সময় ভোর চারটা। আলস্য কাটিয়ে উঠে পড়লাম। পাঁচটার ভেতর বের না হলে ঝামেলা হয়ে যাবে। রোদ উঠে গেলে ট্রেকিং কষ্টকর হয়ে যায়। সবাই উঠে মোটামুটি হাতমুখ ধুতে ধুতেই আমরা তৈরি। তেহজীবকে ডাক দিলাম। মা, পাহাড়ে যাবে? সেও চোখ কচলে উঠে পড়লো। ওকে তৈরি করে চলে গেলাম খেতে। সকালের খাবারটা ভরপেট না হলে এনার্জি পাওয়া যাবে না। 

খাওয়া শেষ করে দুইজন গাইডসহ আমাদের ১৯ জনের গ্রুপের রওনা হতে সাড়ে পাঁচটা বেজে গেল। চায়ের দোকানের পাশ দিয়ে নিচের দিকে যে রাস্তাটা গিয়েছে, সেটাই হচ্ছে পথ। অন্ধকারে, ঠাণ্ডায় জবুথবু আমরা হেঁটে চলছি। কুয়াশায় মাটি ভেজা। চারপাশ থেকে ঠাণ্ডা আসছে এমন মনে হচ্ছে। ছোটখাটো ঝিরিগুলোতে পা দিয়ে চমকে উঠছি, হিমশীতল পানি!

অভিযাত্রী। ছবি: রিফাত ভাই

কিছুটা পাহাড়ি পথ, কিছুটা ঝিরিপথ, এভাবে পার হয়ে ঘন্টা খানেক পর পৌঁছালাম অবশেষে ওয়াই জংশন। ওয়াই জংশন হচ্ছে ইংরেজি Y অক্ষরের মতো দেখতে একটা জায়গা, যার বাম দিকে গেলে যোগী হাফং আর ডানদিকে গেলে জো-ত্লং। আমরা ডানের রাস্তা ধরে হাঁটা দিলাম। গাইড পারোয়াত দাদা সবসময় ছিলেন আমাদের পাশে। আমাদের সাথে যেহেতু তেহজীব আছে, কাজেই আমরা ধীরে সুস্থে, সতর্কতার সাথে যাচ্ছি। তেহজীবের জন্য তার বাবা, মাসুম চাচ্চু, রিফাত চাচ্চু, রাসেল চাচ্চু সর্বদা প্রস্তুত। এদিকে আশিক ভাই আর জয় ভাইও ছিল। আর ছিলাম আমি আর সুমাইয়া। দুরন্ত ভাই, মমিনুল ভাই, অনন্যা আপু, মামুন ভাই, শাফায়েত ভাই, বিপু ভাই, পলাশ ভাই, রাব্বানি ভাই ওনারা আরেক গাইড দাদার সাথে অনেক দ্রুতই চলে গিয়েছিলেন।

হিট দ্য ট্রেইল! ছবি: মাসুম ভাই


জো-ত্লংয়ের শুরুতে হচ্ছে ঝিরিপথ। জানতাম, এই পুরো ঝিরি পথটাই বড় বড় সব বোল্ডারে ভরপুর। কিন্তু ধারণা ছিল না, সেগুলো কি ভয়ংকর হতে পারে। পাথুরে ঝিরির এই ওঠানামাই এই ট্রেইলের মূল চ্যালেঞ্জ। প্রায় ২,০০০ ফিট পর্যন্ত শুধু এরকম ঝিরি ধরেই উপরে উঠতে হয়। একেকটা বোল্ডার টপকে যাবেন আর পিছনে তাকিয়ে ভাববেন, এটা কিভাবে পার হয়ে আসলাম? আমি শুধু ভাবছিলাম, উঠে তো যাচ্ছি, নামবো কিভাবে? তারপর ‘পরেরটা পরে দেখা যাবে’ ভেবে আবার পাহাড়ে ওঠায় মন দিলাম। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে ভয়াবহ পর্বতারোহণের অভিজ্ঞতা আমার। যেমন উঁচু, তেমন খাড়া। পারোয়াত দাদা বললেন, এই পাথুরে ঝিরির নাম নাকি ‘লোহো ঝিরি’।

যদি লক্ষ্য থাকে অটুট। ছবি: মাসুম ভাই

এদিকে, তেহজীবও কিন্তু হাঁটছে। কিছু জায়গায় বোল্ডার তার চেয়ে উঁচু। সেখানে তাকে পার করে দিতে হচ্ছে। আর যে জায়গাগুলো সে বুঝতে পারছে একাই পারবে, সেখানে তাকে কেউ ধরতে আসলেই বকা খাচ্ছে। এক জায়গায় টিজিবি গ্রুপের গাইড দাদা দড়ি বেঁধে দিয়েছিলেন। আমরা দড়ি ধরে পার হলাম। এদিকে জয় করলো কি, তেহজীবকে কোলে করে পার করে দিল। আর মেয়ের কান্না কে দেখে! শুরু করলো জয়কে বকা। জয় আবার ওকে আগের জায়গায় রেখে আসলো। সে সবার মতো দড়ি ধরে ঝুলে পার হলো। তারপর শান্তি! আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো, ‘মা, আমি মোগলি হয়েছি!’ 

ট্রেইলে ছোট্ট মোগলি। ছবি: মাসুম ভাই

এভাবে একসময় শেষ হলো ঝিরিপথ। তারপর শুরু হলো বাঁশঝাড় আর ঝুরা মাটি। এক পা ফেললে আরেক পা হড়কে পড়ে যাওয়ার উপক্রম। তাজিংডং ট্রেইলে এই মাটির নাম দিয়েছিলাম আমরা ‘বেইমান মাটি।’ এখানে লম্বা লম্বা সব বাঁশ ধরে পার হতে হয়। দেখে মনে হচ্ছিলো, বাঁশগুলো যদি ছুটে চলে আসে? এতো মানুষ যাচ্ছে! এসব ভেবে মনোযোগের অভাবে প্রথমে ব্যালেন্স করতে পারছিলাম না। পরে ভাবলাম, বিশ্বাস রাখতে হবে এবং নিজের শরীরের কন্ট্রোল নিতে হবে। তারপর দেখা গেল, ব্যাপারটা আর অতো কঠিন হচ্ছে না। একটা জায়গা বেশ খাড়া আর ঝুরঝুরে পাথুরে ছিল। সেখানে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে পার হতে হয়েছে। চূড়ার কাছে পৌঁছার আগের আধাঘন্টা একেবারেই ঘন বাঁশঝাড়। বাঁশের ফাঁকফোকর দিয়ে হাঁটছি তো হাঁটছি। পথ আর শেষ হয় না।

শারীরিক যে কসরতগুলো করেছি এতোক্ষণ, তাতে আমার সিজারিয়ান ব্যাকপেইন হঠাৎ করে ফেরত আসলো। আমি বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। মুশতাক আর রিফাত ভাই কিন্তু আমার সাথে। আমি বললাম, আমি আর যাবো না। জীবনে কিছু শুরু করে শেষ না করা অব্দি চেষ্টা চালিয়ে যাই। কখনো মাঝপথে থেমে যাই না। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার সত্যিই মনে হচ্ছিলো, আমি এখানেই থামবো। আর সম্ভব না। এবং এখানেই একটা গ্রুপ এবং গ্রুপের লিডারদের দায়িত্বশীলতা এবং আন্তরিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। রিফাত ভাই এরপরের পুরো সময়টা আমাকে মোটিভেশনাল স্পিচ দিতে থাকলেন। ‘আপু পারবেন, আর বেশিক্ষণ নাই’ বলে বলে আমাকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। এবং ভাবেসাবে বুঝলাম, আমাদের ফেলে উনি যাবেনও না। আমিও বা থামি কি করে! 

বাঁশঝাড়ের ফাঁকে। ছবি: মাসুম ভাই

এদিকে, তেহজীব ততোক্ষণে চূড়ায় পৌঁছে গিয়েছে তার মাসুম চাচ্চু আর রাসেল চাচ্চুর সাথে। আমাদের গ্রুপের বাকি যারা আগেই পৌঁছে গিয়েছিলেন, ওনারা তখন নেমে আসছেন। এর মাঝে কে যেন আমাকে বললো, তেহজীব আপনাদের জন্য কান্না করছে। আপনাদের ছাড়া আর যেতে চাচ্ছে না। আমি যেন আবার কোত্থেকে এনার্জি পেয়ে গেলাম। শেষের পথটুকু মেয়ের জন্য হেঁটেছি। আমরা যখন চূড়ায় পৌঁছাই, ঘড়িতে তখন বেলা একটা। জো-ত্লং! আনঅফিসিয়ালি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চূড়া। যে পথটা পারি দিয়ে এসেছি, তাতে সবকিছু স্বপ্নময় লাগছিল। রাব্বানি ভাই কিন্তু নেমে যাননি। আমাদের জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন। যদি নামার সময় সাহায্য দরকার হয়! উনি দেবতাখুমেও আমাদের জন্যে অনেক করেছেন। সবাই মিলে কিছু ছবি তোলা হলো। খাওয়াদাওয়া হলো। বসে বিশ্রাম নেয়ার ফাঁকে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। 

নাহ! পাহাড় কখনো জয় করা যায় না। পাহাড় খেলে দিয়ে আসা যায় না। পাহাড়কে ভালোবেসে তার বিশালতার কাছে শুধুমাত্র সমর্পিত হওয়া যায়। বেশি সময় চূড়ায় থাকা গেল না। আমাদের মৌমাছি ঘিরে ধরছিল। কয়েকজনকে কামড়ও দিয়েছিল। আর এমনিতেও বেশি দেরি করা যাবে না। চেষ্টা করতে হবে আলো থাকতেই নেমে যাওয়ার। এমনিতেই পাহাড়ে ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসে। আমরা ফেরার পথ ধরলাম। 

জো-ত্লং শিখরে আমরা। ছবি: মাসুম ভাই

আমি সবসময় বলি, পাহাড়ে ওঠার চেয়ে নামা কঠিন। নামার সময় ব্যালেন্স রাখাটাই হচ্ছে মূল কাজ। নামার সময় বাঁশঝাড়ের ফাঁকে দেখা হয়ে গেল ফাসকা, সালমা আপা আর ফখরুল ভাইয়ের সাথে। ওনারা তখন উঠছেন। কি ভালো লাগলো আপাদের দেখে! ছবি তুলে, পাড়ায় আড্ডা হবে বলে আবার নামা শুরু করলাম। ঝুরা মাটিতে সোজা হয়ে হাঁটা আরেক চ্যালেঞ্জ। আমি অবশ্য চ্যালেঞ্জের ধারেকাছে গেলাম না। চূড়ায় ওঠার সময়ই আমার জুতা ছিঁড়ে গিয়েছিল। তাই নিয়ে আমি ‘ছ্যাঁচড়া ট্র‍্যাকার’ নামকরণের সার্থকতা প্রমাণ করতে স্লাইড করে করে নামতে লাগলাম। এক পর্যায়ে জুতাটা খুলেই হাঁটা শুরু করলাম। কিন্তু পায়ের অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো। তাই দেখে রাসেল ভাই ওনার জুতাজোড়া আমাকে দিয়ে দিলেন। তারপর পুরো পথ উনি খালি পায়ে ট্র‍্যাকিং করেছেন। মানে, ভাই হলে যা হয় আর কি! 

ফাসকা, দ্য লিটল ট্র‍্যাকারের সাথে। ছবি: মাসুম ভাই

যে জায়গায় আমরা দড়ি ধরে উঠেছিলাম, সেখানে যেয়ে নামার সময় দড়ি পাইনি। সেখানে সবাই স্লাইড করেই নামছিল। তেহজীব ব্যাপক মজা পেল। ‘ইয়াহু’ বলে চিৎকার দেয় আর নামে। এভাবে আলো থাকতে থাকতেই আমরা মোটামুটি বেশ কিছুদূর এগিয়ে গেলাম। হঠাৎ শুনি এক বিকট চিৎকার। সুমাইয়া পড়ে গিয়েছে। ব্যথাও পেয়েছে। এক পর্যায়ে দেখি সেও আমার মতোই স্লাইড করে নামছে। পড়ে গিয়ে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। আর সবাই যে কি পঁচানি দিচ্ছিলো বেচারিকে! এদিকে রাব্বানি ভাই ক্ষ্যাপা, কেন সবাই এমন হাঁচড়েপাঁচড়ে নামছে। নামা দিয়ে কথা! 

সন্ধ্যা নেমে এলো। এর মাঝে আরেকটা দূর্ঘটনা ঘটে গেল। আমার চশমাটা গেল ভেঙে। আর আমি হয়ে গেলাম একেবারেই অসহায়। চশমা ছাড়া আমি প্রায় অন্ধ। আমার কনফিডেন্স লেভেল ধুপ করে নেমে গেল। তারপর আক্ষরিক অর্থেই আমি মুশতাকের হাত ধরে, কখনো কাঁধে হাত রেখে বাকি পথটা পার হচ্ছিলাম। আমাদের সাথে আরেক গ্রুপও ছিল। ওরা নিজেরাই গিয়েছিল। আমরা একে অপরের সাহায্য নিয়ে ফিরছিলাম। 

রাতের আঁধারে ট্র‍্যাকিং। ছবি: রিফাত ভাই

এদিকে আমাদের দেরি দেখে পলাশ ভাই আর মামুন ভাই আবারও রাতের আঁধারে ঝিরিপথ পার হয়ে এগিয়ে আসছিলেন আমাদের খোঁজে। সবাই আসার পর এক জায়গায় বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। সেখানে বসে গল্প শুনলাম দুরন্ত, দ্য বেয়ার গ্রিল ভাইয়ের কাঁচা চিংড়ি খাওয়ার। দুরন্ত ভাই একা না যদিও, মামুন ভাই আর পলাশ ভাইও খেয়েছেন। পথে একটা জুমঘর আছে। সেখানে তারা কেশর আলু আর কিছু চিংড়ি পুড়িয়েও খেয়েছেন। গল্প করতে করতে এগিয়ে গেলাম। আকাশে তখন গোল চাঁদ। সেসময় ছিল ‘কোল্ডমুন’, একদম সাদা ধবধবে চাঁদ। সবাই টর্চের আলো নিভিয়ে হাঁটছিলাম। আবছায়া আলো আর আঁধারি মিলেমিশে একাকার!

রাত তখন সাড়ে দশটা। পাড়া প্রায় চলে এসেছে। তেহজীব কিন্তু এখনো নিজের পায়ে হাঁটছে। প্রায় পনেরো ঘণ্টা হয়ে গিয়েছে। পাড়ায় ঢুকে আমরা ফাসকাদের কটেজ ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলাম। ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীরটা আর চলতে চাইছিল না। কোন ঘর দেখলেই মনে হচ্ছিলো, এটাই আমাদের কটেজ। মরীচিকা মনে হচ্ছিলো সব। পথে এক বেঞ্চিতে সবাই বসলাম। তেহজীব ঘুমিয়ে গেল মাসুম ভাইয়ের কোলে। কটেজে যেয়ে কোনরকমে কাপড় পালটে, কিছু খেয়ে শুয়ে পড়লাম। ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করার সাহস হলো না। আগের রাতে গোসলে যেয়ে রিফাত ভাইয়ের যে বিকট চিৎকার শুনেছিলাম!

কোল্ড মুন। ছবি: রিফাত ভাই

এক জায়গায় নাকি কয়েকজন দাঁড়িয়ে ছিলেন ছয় বছরের একটা বাচ্চা এসেছে জো-ত্লং সামিট করতে, এটা শুনে তেহজীবকে দেখতে। বুড়ি তখন গভীর ঘুমে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। বাচ্চাকে নিয়ে দূর্গম অনেক জায়গায় গিয়েছি। কেউ উৎসাহ দিয়েছেন। অনেকে নেতিবাচক কথাও বলেছেন। তবে, প্রশংসা আর সাহস দেয়ার মানুষই বেশি ছিল। তাই হয়তো আজকে এই শিখর ছোঁয়ার সৌভাগ্য হলো ওর। ফাসকাও কিন্তু জো-ত্লং সামিট করেই ফিরেছিল সেই রাতে। এভাবে বাচ্চাগুলোকে আমরা ভালোবাসা দিয়ে, ওদের প্রতি বিশ্বাস রেখে এগিয়ে নিয়ে যাই। বাচ্চারা পারে না এমন কিছু নেই! 

ভিডিওচিত্রে জো-ত্লংয়ের পাথুরে ট্রেইল দেখতে ক্লিক করুন এই লিংকে: https://youtu.be/2k3vIj8H93Y

আমরা গিয়েছিলাম Hit the Trail এর সাথে। তাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দিয়ে দিচ্ছি:
https://www.facebook.com/groups/HitTheTrailBd/

মাসুম ভাই: 01672970714
রিফাত ভাই: 01931800139
রাসেল ভাই: 01873340122

বিঃদ্রঃ ঘুরতে যেয়ে আমরা জায়গা নোংরা করি না। দেশটা আমাদের। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও আমাদেরই দায়িত্ব।

আমার পুরানো ভ্রমণকাহিনীগুলো পড়তে চাইলে ক্লিক করতে পারেন এই লিংকে:
https://www.vromonguru.com/author/azmi/

ফিচার ছবি: আতাউল ইসলাম মাসুম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top