fbpx

সুচিত্রা সেনের বাড়ি ঘুরে এসে বলছি

এসে পড়েছি গল্পের একেবারে শেষ প্রান্তে। গল্পের হাড়ি থেকে নতুন গল্প বের করার আগে দুপুরের খাবারটা সেরে নিলাম। ঘড়িতে ঠিক তিনটা বাজে। অটো ছুটছে সূচিত্রা সেনের বাড়ি।  পাবনার সেই সুশ্রী রমা দাশগুপ্তের সুচিত্রা সেন হবার গল্পটি না হয় যাবার পথেই বলি। সে সময়ের অনেক জনপ্রিয় অভিনেতা অভিনেত্রীর মত রমা দাশগুপ্তের পর্দায় অভিষেক হয় কলমি নামে। ১৯৫২ সালে বাংলা সিনেমা অঙ্গনে পা রেখে পাবনার সেই সুশ্রী মেয়েটি হয়ে গেল সুচিত্রা সেন।

বাড়ির আঙ্গিনায় সুচিত্রা সেনের মূর্তি। ছবি: লেখক

রূপালি পর্দায় তার অভিষেক ঘটে ‘শেষ কোথায়’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। উত্তম-সুচিত্রার সেই মহা কাব্যিক জুটির ও অভিষেক হয় ঠিক এক বছর পর ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি পাবনার সেই মেয়েটিকে। ততদিনে সুচিত্রা সেনের আড়ালে হারিয়ে গেছে রমা দাশগুপ্ত।

টাইলসে সুচিত্রা সেন। ছবি: লেখক

তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে হারানো সুর, দেবদাস, দীপ জ্বেলে, উত্তর ফাল্গুনি দর্শকের হৃদয়ের মানসপটে গেথে যায়। তাই তো এত বছর পরও মহা নায়িকার নাম লোকের মুখে মুখে। হিন্দি ভাষায় তিনি বেশ কয়েকটা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এর মধ্যে আধি ছবিটি সর্বজনীন প্রশংসিত হয়। সারা জীবন তিনি মোট ৫৮টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে। তাঁকে শেষ বড় পর্দায় দেখা যায় ১৯৭৮ সালে। প্রণয়পাশা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সুচিত্রা সেন ইতি টানেন তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার। সিনেমার জগতে অবদানের জন্য তিনি সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার ছাড়াও পেয়েছেন পদ্মশ্রী ও বঙ্গভূষণ পুরস্কার।

মহানায়িকার বাড়ির বারান্দায় আমি। ছবি: ওয়াফি আহমেদ

অর্ডে হেপবার্ন ও গ্রেগরি পেকের রোমান হলিডে সিনেমার সেই বিখ্যাত রোমান্টিক দৃশ্যের কথা কার না মনে আছে। ভেসপার পিছে হেপবার্ন সামনে ফিফটিজের সেই হার্টথ্রোব নায়ক গ্রেগরি পেক। রোমের রাস্তায় তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। হারানো সুর সিনেমার এই পথ যদি না শেষ হয় গানটির চিত্রায়নে ছায়া পাওয়া যায় রোমান হলিডের সেই দৃশ্যের। রোমান্টিক বাঙালির হৃদয়ের মানসপটে স দৃশ্য যেন এখনও গেথে আছে।

সুচিত্রা সেনের সিনেমার পোস্টার। ছবি: লেখক

দেখতে দেখতে চলে এলাম মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের বাড়ির সামনে। বাড়ির গেটের সামনে টিকেট কাউন্টার। রোমান্টিক নায়িকা সুচিত্রা সেনকে নিয়ে অনেক লেখায় উঠে এসেছে এ বাড়ির গল্প। মহা নায়িকার বেড়ে উঠা তো পূর্ব বঙ্গের পাবনা জেলা শহরের এ বাড়িতেই। হেম সাগর লেনের এ বাড়ি এখন সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালা হিসাবে পরিচিত। অনেক বছর অবৈধ দখলে ছিল বাড়িটি। ২০১৪ সালে দখলমুক্ত করে দর্শনার্থিদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।  ওয়াফি আর কায়েস ভাই হাল্কা আড়মোড়া ভাঙ্গলো অটো থেকে নেমে। আমুদি আলস্য জেকে বসেছে দেহে। টিকেট কাটার পর সবাই ভিতরে ঢুকলাম।

সিনেমেটিক। ছবি: লেখক

বাড়ির সামনে আঙ্গিনায় ফুটে উঠেছে নানান জাতের ফুল। সামনে দেখা যাচ্ছে সাদা রঙের বিখ্যাত সেই বাড়ি। বাড়ির দুয়ার দিয়ে ঢোকার আগেই সুচিত্রা সেনের স্টাচু আমাদের যেন স্বাগত জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে ছিল। সিড়ি বারন্দা পারি দিয়ে ঢুকলাম মূল ভবনে। মূল ভবনের ভিতরে তিন চারটা ঘর। আর এ ঘর জুড়েই সুচিত্রা সেনের সংগ্রহশালা। গুন গুন করে মৃদু সুরে বাজছে তুমি যে আমার ঘর জুড়ে। ঘরের দেয়ালজুড়ে ছোট বড় ছবির ফ্রেম। আর সে ফ্রেম জুড়ে সুচিত্রা সেনের ছবি।

দূরে থেকে কাছে। ছবি: লেখক

বাংলা সিনেমা নিয়ে ওয়াফি আহমেদের খুবই অল্প ধারনা। তার হা করা মুখে কখন মাছি ঢুকে যায় সে খেয়াল কি তার আছে। সুচিত্রা সেনের রূপের মায়ায় আটকিয়ে গেছে ওয়াফি। তার মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বের হয়ে আসলো সুবহান আল্লাহ। মিশরের ক্লিওপেট্রা, গ্রিক প্রেমের দেবীর আফ্রোদিতি আধুনিক রূপ যেন সুচিত্রা সেন। এ রকম অদ্ভুত মায়া নিয়ে তাকিয়ে আছে সে যে কোন পুরুষের হৃদয়ে প্রেমের সুর বেজে যাবে।

কোন ছবিতে সেই ছোট বেলার রমাকে দেখা যায়, কোন ছবিতে তার নায়িকা হবার মুহূর্ত, আবার কোন ছবিতে দেখা যাচ্ছে উত্তম কুমারের সাথে আবার হয়তো কোন ছবি ফাকে দেখা যাচ্ছে সুচিত্রা সেনের পরিবারের সদস্য। তার পছন্দ অপছন্দের, নানা জানা-অজানা বিষয়ের সমাহার নিয়ে লেখা হয়েছে ফেস্টুন। কোথাও দেখা যাচ্ছে তার সেই আমলের রঙিন সিনেমার পোস্টার। আহা আবার গুন গুন করে বেজে উঠছে কোন হারানো সুর। এ পথ যদি না শেষ হয় খুব একটা খারাপ কি হবে।

মহানায়িকার বাড়ির সামনে পাতি নায়ক। ছবি: লেখক

ঘর সাজানোর প্রতি মহা নায়িকার বিশেষ দুর্বলতা ছিল। সে বাড়ি আজও সাজানো গুছানো তার স্মৃতি দিয়ে। এখানেই তো কেটেছে তাঁর শৈশব ও কৈশোরের অনেকটা সময়। ঘরের প্রতিটা কোণ বলে সে সুশ্রী কন্যার গল্প। সুচিত্রা সেন তাঁর সময়ের থেকে ছিলেন আধুনিক। পশ্চিমবঙ্গে আজও পালন হয় তার মহাপ্রয়ান দিবস। আর রোমান্সপ্রেমী বাঙালির উত্তর সুচিত্রা মানে অন্য রকম নস্টালজিয়া।

নস্টালজিয়ার জগৎ থেকে ফিরে এলাম বাস্তবে। ছবি তোলার পর্ব শেষে এবার যে ফিরে যেতে হয় ইট ধূলো বালির শহরের উদ্দেশে। অটো ছুটছে এবার পাবনা বাস স্ট্যান্ডের উদ্দেশে। বাস স্ট্যান্ডের পাশে পাবনার বিখ্যাত মিষ্টি বিতান প্যারাডাইস সুইটস। মিষ্টির দোকান থেকে কিনলাম ইলিশ পেটি সন্দেশসহ স্পঞ্জের রসগোল্লা ও খাটি গাওয়া ঘি। ঘিয়ের গন্ধে ওয়াফি মাতোয়ারা। খাদ্য সংক্রান্ত যে কোন জিনিষই তাকে চুম্বকের মত টানে। ঘড়ির কাটাতে এখন ঠিক সাড়ে চারটা। ভাগ্য ভাল পাচটার বাসের টিকেট পেয়ে গেলাম। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে ফিরে যাব নিজ নিড়ে। বিদায় পাবনা শহর, দেখা হবে আবার বাংলার নতুন কোন শহরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top