fbpx

উপবন এক্সপ্রেস: এক বিষণ্ণ ট্রেন যাত্রা

পরিব্রাজকের পথে দেখা হয় কত মানুষের সাথে৷ কেউ আপন হয়ে যায় কেউবা পর৷ এরপর থামে না সৃষ্টিশীল এই পথ৷ তার যে এই পথের চলাতেই মায়া। আজকে স্মৃতিচারণ করতে ফিরে যেতে হয় প্রাণের শ্রীমঙ্গল শহরে৷ আর প্রিয় মটর সাহেব জুয়েল রানার ডেরায়৷ তখন সে হিড বাংলাদেশে অনেক হিট। ভাব দেখলে হয়ে যেতাম ফিট৷ ঢাকা টু সিলেটের প্যারা নিয়েই রানা সাহেব গ্রেজুয়েশন শেষ করার প্রতিজ্ঞা নিয়েছিল। সদা হাস্যজ্জ্বল লোকটি তখনও এক বিয়ে নিয়ে সন্তুষ্ট৷ তার তিন বিয়ের রহস্য নিয়ে লিখতে গেলে হয়তো রচিত হবে মহাকাব্য৷ সেই দিকে না গিয়ে না হয় গল্পে গল্পে সেই ২০১৭ সালের সিলেট শহর আর রানা সাহেবের বাসায় কাটানো মুহূর্ত গুলো স্মরণ করা যাক৷

একটি ট্রেনের গদ্য। ছবি: লেখক

কোন কারণে মনটা বিষণ্ণ ছিল৷ ভেবেছিলাম একা বের হয়ে যাই বঙ্গমাতার বুকে। কিন্তু সেই ভাগ্য কোথায়। কপালে জুটবে যখন জুয়েল রানা সেইটা আর খণ্ডাই কেমনে। সারা দেশে বন্যা পরিস্থিতিও বেশ খারাপ অবস্থা৷ যাব যাব ভাবছি এর মধ্যে জুয়েল রানা বলে বসলেন ছেড়ে দিন সব জীবনের লেনদেন, অপেক্ষা করছে শ্রীমঙ্গলের ট্রেন৷ মুখের বুলি বন্দুকের গুলি ফসকিয়ে গেলে কি ফিরত নেওয়া যায়৷ সে ভেবেছিল হয়তো যাব না৷ তবে তাকে অবাক করে দিয়ে উপবনের দুইটা টিকেট কেটে ফেললাম৷ রানা সাহেবের মুখের বুলি বন্ধ হয়ে গেল আমাকে দেখে৷ এরপর দুইটা হাঁড়ি এক সাথে রাখার মত টক্কর খেতে খেতে যাত্রার হল শুরু৷

রাতের শ্রীমঙ্গল স্টেশন। ছবি: লেখক

চলছে রাতের উপবন এক্সপ্রেস৷ ঢাকা ছেড়ে নরসিংদী ক্রস করে চলছে তার গন্তব্যে৷ হুহু করে বাতাসও যেন আমাদের গীত শুনাতে পিছু নিল৷ বর্ষা এখন শেষের দিকে শরতের আলিঙ্গনের অপেক্ষায় প্রকৃতি৷ তবুও থেমে নেউ উপবন৷ যেন রাতের মানুষের গল্প শুনাতে ছুটছে তার গন্তব্যে৷ দেখতে দেখতে ব্রাম্মনবাড়িয়া স্টেশন পারি দিয়ে উপবন চলছে শায়েস্তাগঞ্জের পথে৷ শীত ও যেন জাঁকিয়ে বসার নিয়তি নিয়ে এসেছে৷ ছুটছে ট্রেন। আমি জানলা দিয়ে বাহিরে তাকলাম।

কালিগোলা আঁধারে রাতের আকাশে গুটি কয়েক তারার ঝলকানি নস্টালজিক করে তুলে৷ পিছে ফেলে যাচ্ছে লোকালয়ের পর লোকালয়, শহরের পর শহর৷ আমি প্রবেশ করলাম অতীতের কোন দিনে৷ তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার জগৎতে দুয়ার খুলে দিলাম৷ জীবনবোধের এক চমৎকার অনুভূতি ছুঁয়ে গেল৷ অনুভূতির শব্দে যেন বুনেছি আমার গল্প। সেই গল্পে নায়িকা ছিল, ছিল গল্পের নায়ক৷ সেই গল্পের সুতোটা ছিড়ে গেছে কবে৷ যেন মান্না দের গান গুনগুনিয়ে কেউ শুনিয়ে যায় ‘আজ আবার সে পথে দেখা হয়ে গেল, কত সুর কত গান মনে পড়ে গেল৷ বল ভালো আছো তো।’ ট্রেনের হুইসেল আমাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে৷ পাশে জুয়েল রানা ভাবীর সাথে ফোনে বকবকানিতে মশগুল৷ এবার বাহিরে তাকিয়ে দেখতে পেলাম শায়েস্তাগঞ্জ এসে পড়েছি৷

রাতের শহরের দেয়াল শিল্প। ছবি: লেখক

এত রাতেও স্টেশনের মানুষের ছুটাছুটি, আলোর ঝলকানি মৃদু হেসে আহ্বান জানায় আর একটি নিদ্রাহীন রাতের৷ এর পরের স্টেশন শ্রীমঙ্গল৷ সেখানেই হারিয়ে গেছে আমার সুরঞ্জনা৷ মানুষ ভিড় ঠেলে উঠছে। বৃহস্পতিবারের রাতের ট্রেন কানায় কানায় ভরপুর। দরজার রড ধরেও ঝুলছে মানুষ৷ সেই ভিড়ে যেন দেখা দিল সাদা ধুতি, দাদু গেঞ্জি পরা জীবনানন্দ। নাকি আমার মতিভ্রম। দুজনই দুজনার সুরঞ্জনাকে হারিয়ে একই পথের যাত্রী৷ রাতের উপবন একটি হৃদয় ভাঙ্গা গল্প এক সাথে মিলেমিশে একাকার। কিছু গল্প না হয় অসম্পূর্ণ থাকুক৷ জীবন ও আনন্দ না হয় এক সাথে চলুক৷ ট্রেনের হুইসেল শায়েস্তাগঞ্জকে বিদায় ঘণ্টি জানালো৷

ভোরের শ্রীমঙ্গল রেল স্টেশন। ছবি: ফ্লিকার

রানা সাহেব আমার কাঁধে মাথা রেখে অতল গহীন ঘুমে৷ জেগে থাকাটা হয়তো আমার জন্য অপূর্ব জীবনবোধের গদ্য ছিল। ঈশ্বর আজ তার ঐশ্বরিক শিল্পের ছোঁয়া নিয়ে নেমে এসেছে ধরণিতে৷ জানলার বাহিরে দেখতে পেলাম চাঁদের পুকুর। আমানিশার আঁধারে রূপালি জলের হাবুডুবু খায় এক অদ্ভুত চাঁদ। এই চাননি পসর রাতেই কি দুনিয়ার তাবত লেখকদের ভাবালুতা জাগে, শখ জাগে মৃত্যুর৷ সাক্ষী ছিল ঈশ্বর আর যাযাবরের দৃষ্টিপাত৷ ঘুমের রাজ্যে পৃথিবীর সব মনুষ্যকূল, জেগে আছে এক সৃষ্টিশীল যাযাবর৷ জ্যোৎস্নার সৌরভ মেখে বাতাসে বাতাসে ছড়িয়ে দিয়েছি এক বেয়ারা নীলাভ চুম্বন সপ্তদশী কাব্যলক্ষ্মীর ললাটে৷ ভালোবাসার অর্ন্তবাস খুলে শুনেয়েছিল সে নক্ষত্রের রূপালি আগুন ভরা রাতের গল্প৷ পুড়ছে এক ফালি চাঁদ, অতীতের অনলে পুড়ছে যাযাবর৷

শহরের পথে। ছবি: লেখক

সে ঠিকই বলেছিল হৃদয় ভরা ভালোবাসা না থাকলে কবিতা লেখা যায় না, লেখক হওয়া যায় না। যেখানেই থাকো তুমি যে ভালোবাসা শিখিয়েছিলে৷ তোমায় আমি অনেক আগেই ক্ষমা করে দিয়েছি৷ তুমি এখন সকল ক্ষমার ঊর্ধ্বে আকাশের তারা হয়ে গেছো৷ আবার হুইসেল জানান দিল উপবনের যাত্রা এখানেই শেষ। ভোর চারটা বাজে। শ্রীমঙ্গলের বুকে পা রাখলাম দুই ভ্রমণকারি৷

এত রাতে হিড বাংলাদেশ যেতে হবে। কুয়াশাচ্ছন্ন রাতের আকাশ ভেদ করে দূরে কোথায় যেন হুক্কাহুয়া ধবনি শুনা যায়। রানা ভাই বললো শ্রীমঙ্গলে এই রকম মধ্য রাতে শিয়াল নাকি রোডে এসে পড়ে। এক অজানা শিহরণ বয়ে গেলে দেহে। স্টেশনে নেমে ধুয়া উঠা লিকার চা খেয়ে কিছুটা উষ্ণতা ফিরে পেলাম। স্টেশন থেকে সিএনজি নিয়ে ছুটে চলছি হিড বাংলাদেশের পথে। নতুন গল্পের শুরুর প্রেরণায় উপবন থেকে না হয় ফিরস্তি দিলাম।

ফিচার ইমেজঃ বাংলাট্রিবিউন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top