fbpx

পর্যটন মোটেল সিলেট: প্রকৃতির একরাশ ছোঁয়া

সিলেট শহরে ফেরার পর রাতে দেখা হল আতিক ভাইয়ের সাথে। গল্পগুজব পর্ব সেরে জুয়েল ভাইয়ের বিবাহিত ব্যাচেলার বাসায় আসতে আসতে প্রায় ১১টার কাছাকাছি বেজে গেল। রাতে অনেক সুখ দুঃখের আলাপের মাঝে জানতে পারলাম ভাবি জুয়েল ভাইয়ের ছাত্রী ছিলেন। এমন গুরুজিকে কি সমাজ চেয়েছিল? সারাদিনের ক্লান্তি দেহে জাকিয়ে বসেছে এবার ঘুম দেবার পালা।

মোটেলের সাইনবোর্ড। ছবি: লেখক

সকালে উঠে দেখতে পেলাম জুয়েল ভাই রেডি অফিসের জন্য। নাস্তা সেরে আজকে যে যার রাস্তায় চলে গেলাম। আমার জন্য আজকে একাকি ভ্রমণ। একটি লোকাল অটোতে করে যাচ্ছি সিলেট এয়ারপোর্ট রোড। কথা হল মামার সাথে আমাকে পর্যটন মোটেলের সামনে নামিয়ে দিবে। যে কথা সেই কাজ, এই বার মোটেলে ঢুকে খই ভাজ।

আহা সবুজের মাঝে বাঁচি। ছবি: লেখক

পর্যটন মোটেল এক টিলার উপরে অবস্থিত। উপরে উঠতে উঠতে দেখতে লাগলাম আশেপাশের প্রকৃতি। দুই দিকের রাস্তায় বৃক্ষের সমাহার। নিচে পর্যটনের বার দেখতে পেলাম। এরই ভিতর উপর দিকে উঠে গেছে পাকা রাস্তা। অনেক দিন পাহাড়ে উঠা হয় না। ৯২ কেজি ওজন নাদুস-নুদুস দেহ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির সন্তান। এইটুকু রাস্তা উঠতে খানিকটা বেগ পেতে হল।

স্বাগতম। ছবি: লেখক

উপরে উঠে পেয়ে গেলাম পর্যটন মোটেলের মেইন গেট। ভিতর ঢুকে দেখতে পেলাম দুইটা ডানায়ালা পরীর ভাষ্কর্য। স্বাগতম জানিয়ে আমার জন্যই যেন সে অপেক্ষা করছিল। এর পাশেই একটা বাঘের মুখ দেখতে পেলাম। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখতে পেলাম পর্যটনের সেই টিপিক্যাল একতলা মোটেল। একেবেকে চলে গেছে কোন প্রান্তে সেইটা দেখার জন্য ভিতরে ঢুকতে হবে।

পরীর সাথে বাঘ মামার হা। ছবি: লেখক

ক্ষুধা অনুভূত হচ্ছে না। তবে এত অখণ্ড সময় কাটাই কেমনে। ঢুকে গেলাম পর্যটনের রেস্টুরেন্টে। ভিতরে একেবারে ছিমছাম পরিবেশ। ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন খুবই সুন্দর। এত ছিমছাম পরিবেশ ক্ষুধা চাগিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। অর্ডার করে বসলাম ডিম ভাজা, পরোটা। ১০ মিনিট পর খাবার এসে পড়লো। পরিবেশনে রুচির পরিচয়। তাদের পরিবেশনের মুগ্ধতার রেশ না কাটতেই খাবারের স্বাদ এক ভিন্ন আমেজ এনে দিল। মাঝে মাঝে বিলো এভারেজ থেকে একটু উপরের খাবার ও রুচিশীলতার জন্য ভোজর রশিকের সম্মান অর্জন করে নেয়।

মোটেলের রেস্টুরেন্ট। ছবি: লেখক

খাবার পর্ব শেষে এক কাপ চায়ের অর্ডার করলাম। এই রকম খাবারের পর এক কাপ ধুমায়িত চা ছাড়া জমছে না। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ভাবছি কিভাবে কাটানো যায় সময়। এবার আমুদি আমেজ থেকে বের হবার পালা। এখানে নাকি ওয়াচ টাওয়ার আছে। সেখানেই বসেই না হয় উপভোগ করবো প্রকৃতি।

ডিম, পরোটা। ছবি: লেখক

বের হলাম মোটেল থেকে। বাঘের মুখের পাশ দিয়ে একটি রাস্তা চলে গেছে। সে রাস্তা ধরে কিছুটা নিচে নামার পর আবার উপরে উঠতে লাগলাম। এখানকার প্রকৃতি নীরব হলেও বাতাসে শোনা যায় কপোত কপোতির ফিসফাস। এখানে কবি নীরব থাকতে চায় না। প্রকৃতির মাঝে শরীর চর্চা খারাপ তো নয়। প্রকৃতি আজ মেতেছে নানা আয়োজনে। কথার প্রসংগ না হয় হক পরিবর্তন।

এক কাপ চা। ছবি: লেখক

গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে এক চিলতে চা বাগান দেখা যাচ্ছে। যেন সবুজের মাঝে মিশে যাবার জন্যই তাদের জন্ম। নানা প্রজাতির বানর হনুমানের দেখা এখানে পাওয়া যায়। তাদের প্রসঙ্গ না আসতেই গাছের ফাঁক দিয়ে একটি বানরের আনাগোনা দেখতে পেলাম। সামনে ওয়াচ টাওয়ার। ওয়াচ টাওয়ারে উঠে পাখিদের কুহুতানে ডুবে গেলাম। এখানে থেকে ওসমানি বিমান বন্দর দেখা যায়।

প্রকৃতির ফ্রেম। ছবি: লেখক

প্রকৃতির মাঝে এক বুকখোল নিঃশ্বাস জীবন চলার জড়িবটিকাও বটে। প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য লাভের আশায় আমি আজ এখানেই ফিরে পেলাম যেন সাময়িক স্বস্তি। এখান থেকে নেমে টিনের শেড দেওয়া একটি ছাউনির পাকা বেঞ্চে বসলাম। প্রকৃতির সন্তান শুধু মানুষ নয়। পৃথিবীর সব জীব। সামনে এক কুকুর দেখতে পেলাম। আমুদে মেজাজে আমার দিকে তাকিয়ে লেজ নাড়াচ্ছে। হাতে কিছু নাই তাকে দিব। তাই বলে আদর থেকে তো বঞ্চিত করতে পারি না। তার মাথা বুলিয়ে দিলাম সে আমুদে কুন্ডলি পাকিয়ে শুয়ে পড়লো।  

বৃক্ষের ডালে বানর। ছবি: লেখক

সিলেট শহর থেকে খুব কাছেই যে সবুজের মাঝে হারিয়ে যাওয়া যায় সেই স্বাধীনতা কি আমাদের রাজধানিবাসির আছে। তবে এত কিছুর মধ্যেও কিছু ঠিক নেই। প্রকাশ্যে শরীর চর্চা দৃষ্টি কটুও বটে। মানুষ গুহাবাসি থেকে সভ্য হয়েছে তবে তার আদিম প্রবৃত্তি ছাড়তে পারেনি। পরিবার নিয়ে এখানে আসা তাই একটু বিব্রতকরও বটে। পার্কের প্রবেশের শুরুতেই লেখা ছিল।

প্রকৃতির দৃশ্য। ছবি: লেখক

“দয়া করে শালিনতা বজায় রাখুন এবং কেউ গাছ থেকে ফুল ছিঁড়বেন না, কেউ অভদ্র বা উশৃঙ্খল আচরন করবেন না, কেউ গা ঘেষাঘেষি করে বসবেন না, কেউ এমন কোন অঙ্গভঙ্গি বা আচরণ করবেন না যা দেখে অন্যদের কাছে দৃষ্টিকটু মনে হয় বা খারাপ লাগে। আসুন আমরা সবাই মিলে একটি সুন্দর এবং সুস্থ্য বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তুলি।”

কিন্তু কোথায় সেই শালীনতা, কোথায় সেই ভদ্রতা। পারিবারিক শিক্ষার প্রয়োজন এখানে প্রকট ভাবে ফুটে উঠছে। পরিবর্তন দরকার সব কিছুর। হঠাৎ টিনের চালে বৃষ্টির ফোটা পড়ার শব্দে অসভ্যদের জগৎ থেকে সভ্যতায় ফিরে এলাম। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে প্রকৃতি কে পুত-পবিত্র স্নানে বিশুদ্ধ করতে। সাদা মেঘের মাঝে কালো মেঘের হানা, দমকা হাওয়া যেন শিবের প্রলয়ঙ্করী নৃত্যের পদধ্বনি জানিয়ে যায়।

এই সেই কুকুর। ছবি: লেখক

এই তো বৃষ্টি শুরু হল। গাছের পাতা গুলো আরও সবুজের আমেজে চিকচিক করছে। মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখতে লাগলাম বৃষ্টি। ভুলে গেলাম আশেপাশের অসঙ্গতি। প্রায় আধা ঘণ্টা পর বৃষ্টি থামলো। এবার ফিরে যাবার বার্তা নিয়েই যেন জুয়েল ভাই ফোন দিল। তার কাজ প্রায় শেষ। আমিও ফিরে যাচ্ছি মূল শহরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top