fbpx

৩৬০ আউলিয়ার দেশে অবাক ভ্রমণ

হিড বাংলাদেশের সকালটা মিষ্টি রোদে মাখা ছিল। বেপরোয়া রৌদ্দুর সবুজের বুকে হেলে পড়েছে। পাশেই তো লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। কর্মচঞ্চল জুয়েল রানা বেশ আমুদেই আছে। অফিস থেকে অ্যাসাইনমেন্ট এসেছে বিভিন্ন চা বাগানে হিড বাংলাদেশের অফিসে অফিস ফার্নিচার পৌঁছে দেওয়ার। পিক-আপে মাল লোড হয়ে গেছে। যেতে হবে বহুদূর সাথে-সঙ্গী বেপরোয়া রৌদ্দুর। ইচ্ছা হলেই ছোয়া যায় তবে সে বহুদূর।

পথ মিটাবে পথের দাবি। ছবি: লেখক

দে দৌড় কমলগঞ্জ টু রাজানগর টু কুলাউরা হয়ে জুড়ি, বড়লেখা ভায়া সিলেট, জৈন্তা। এভাবেই কোনদিন ঘুরা হয়নি। রানা সাহেবের কল্যানে চলছে গাড়ি হিড বাংলাদেশের স্পন্সরে। ছুটে চলছে পিক-আপ ৩৬০ আউলিয়ার দেশের আদিপ্রান্তে। কমলগঞ্জ যাবার রাস্তায় যেন এক রাশ সবুজ আমাদের পিছু নিল। যেখানে তাকাই সেখানেই সবুজ। সামনে সবুজ বিস্তৃত ধানক্ষেত। উপরে খোলা আকাশ। আকাশের সেই নীলাভ মায়া হারিয়ে যাচ্ছে সবুজের মাঝে। যেন সবুজের মাঝেই সে বাঁচে।

শ্রীমঙ্গল কথা বলে। ছবি: লেখক

ধান ক্ষেতের আইল দিয়ে ছুটে চলা কিশোরের শৈশব যে হারিয়ে গেছে ইলেকট্রিক খাম্বার দৌরত্বে। যেন খাম্বা বাবার উন্নয়নের কথা বলে বিষণ্ন খাম্বাগুলো। ২০২০ সালে এসে সিলেট আজ খাম্বা শূণ্য। আহা সিলেট তুমি কখনও আমায় হতাশ করোনি। প্রথম স্টপেজ শমশেরনগর। শমশেরনগর যাবার পথের দুধারে সবুজ বৃক্ষগুলো যেন সৈনিকের মত পাহারা দিচ্ছে। বেপরোয়া রৌদ্দুর সবুজের মাঝে হারিয়ে শরীরে মৃদু উম দিয়ে যাচ্ছে। আমরা ভাবছি বন্যা পরিস্থিতির কথা। এখন পর্যন্ত রোডঘাট ভালই দেখা যাচ্ছে। জানি না সামনে কোন চমক নিয়ে অপেক্ষা করছে।

কোন চা বাগানের রাস্তা। ছবি: লেখক

বিএএফ স্টেশন পার দেবার সময় ছবি তুলে রাখলাম। নতুন জোয়ানের রিক্রুটিং স্কুল এখানেই অবস্থিত। সকালের প্রথম ঘণ্টায় বেশ কর্ম চাঞ্চল্যতা দেখলাম। দেখতে দেখতে চলে এল শমশেরনগর অফিস। কমলগঞ্জের এই ইউনিয়নেও যে চা বাগান আছে সেইটা রানা সাহেবের কল্যানেই জানা হল। কেতা দূরস্ত রানা সাহেব ঠাট নিয়ে নামলেন এবং জয় করে আসলেন। এবার পিক-আপ ছুটছে রাজানগরের উদ্দেশে।

এত বছর আগের স্মৃতিচারণ করা বেশ কষ্টসাধ্য। তবে মনে আছে রাজানগরের হিড বাংলাদেশের অফিস বেশ সুন্দর ছিল। রাজানগর, কুলাউড়ার চা বাগানও আমায় মুগ্ধ করেছিল। ডানকান ব্রাদার্সের করিমপুর চা বাগান। শত বছরের ঐতিহ্য কে ধারন করেছে এই করিমপুর চা বাগান। রাজনগর উপজেলার মুন্সীবাজার ইউনিয়নে সবুজ পাহাড় বেষ্টিত গড়ে উঠা এই চা বাগান কিংবদন্তির কথা বলে। নয়নাভিরাম সেই চা বাগানের দৃশ্য মলিন হয়ে শ্রমিকদের করুণ ইতিহাসের আড়ালে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই চা বাগানের অভিশাপ কুড়িয়ে বেড়াচ্ছে। চায়ের পাতার কুড়িতেই যেন হারিয়ে গেছে এদের জীবন।

জানলা দিয়ে তাকালেই হাকালুকি হাওড়। ছবি: লেখক

সে জীবনে যক্ষ্মার মত ব্যাধির সাথে শ্রমিকদের নিত্য বাস। তাই তো হিড বাংলাদেশের অফিস গড়ে উঠেছে সিলেটের প্রায় সব চা বাগানে। তারা স্বর্গের ফেরশতার মত এদের জীবনে এসেছে এক পশলা বৃষ্টির মত। এও রাজানগর উপজেলার আর এক বিখ্যাত চা বাগান হচ্ছে মাথিউরা টি স্টেট। এই চা বাগানের সাথে আছে আবার রবার বাগান। রাজানগর, কুলাউরার কাজ সেরে পিক আপ ছুটছে জুড়ির উদ্দেশে।

পুরা জুড়ি যেন জুড়ে আছে চা বাগানের সবুজ চাঁদরে। পর্যটকগণের সীমাবদ্ধতার আড়ালে রয়ে গেছে আপার সৌন্দর্য্যের এই ভাণ্ডার। দুটি পাতা একটি কুঁড়ির সবুজ রংয়ের নয়াভিরাম সৌন্দর্য্যের দেশের গল্প শুনেই কি ৩৬০ আউলিয়ার পদধূলিতে মুখরিত হয়েছিল সিলেটের মাটি। চোখ মেলে তাকালেই চা বাগান। যেন আমি আজ হারিয়ে যাবে এই সবুজের অরণ্যে, এই মনোলোভা সৌন্দর্য্যে। সবুজের সমরোহের মাঝে নীলাভ চুম্বনের স্পর্শ দিয়ে আকাশ যেন এই সবুজের গালিচার স্পর্শ পেতে চায়। আকাবাকা পাহাড়ি পথে হারিয়ে যায় যাযাবর। চোখের তৃষ্ণা সে কবে মিটেছে এই সবুজের স্পর্শে।

বন্যার পানি আর হাওড়ের পানি মিলে মিশে একাকার। ছবি: লেখক

জুড়ির কাজ সেরে পিক আপ ছুটছে বড়লেখার উদ্দেশে। সৃষ্টিশীল পথ আর সেই পথ জুড়েই আছে হাকালুকি হাওর। যাযাবরের চলার পথে সেও ছুটছে আমাদের সাথে। হাওরের শুরুতেই সবুজ মাঠের এক চিলতে স্পর্শ দিয়ে গেল প্রকৃতি। যেখানেই সবুজের শেষ সেখানেই আকাশ জলের খেলা শুরু। নীলাভ আকাশে কখন তন্তুর মত কখন কটন কান্ডির মত ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘেদের দল। তারই প্রতিবিম্ব দেখা যায় জলে। কোন ভুবন মাঝি তার নৌকার পাল তুলেছে, জেলে সৃষ্টি সুখে জলে জাল ছুড়েছে। জলপুত্রদের সাথে প্রকৃতি মাতাও ছুটছে সৃষ্টির আনন্দে। জল আকাশ প্রকৃতির এক অদ্ভুত সেতু বন্ধন এই হাকালুকি হাওর। যেখান মানব এসে থেমে যায় প্রকৃতির সুধা পান করিতে। বিস্তৃত জলরাশির মাঝে জেগে উঠেছে হিজল, তমাল বৃক্ষের সারি। কোথাও ধু ধু প্রান্তর কোথাও আদি দিগন্ত বিস্তৃত জল, এর মাঝেই ঘর বেধেছে হাকালুকির পাড়ের মানুষ।

পানির নিচে রাস্তা ভাল। ছবি: লেখক

হাকালুকির সৌন্দর্য্যে ডুবে ছিলাম ভুলেই গিয়েছিলাম উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে দেশ। সেই জোয়ারে পানি উঠে এসেছে সড়কে। পিচ ঢালা পথে ভাসছে পাথর কণা ও বিটুমেন। সড়কের এই বেহাল দশা, কোথায় হাওড় কোথায় রাস্তা বুঝা বড় দায়। তাই ওস্তাদ আস্তে। এর মাঝে আমাদের পিক-আপের চাকা ফেসে গেল। আমাদের ধ্যানি বুদ্ধের ধ্যানও ভেঙ্গে গেল। ড্রাইভার মৃদু হেসে বললো ধাক্কা দিতে হবে ভাই। আমি আর জুয়েল রানা প্যান্টের কাপড় গুটিয়ে হাটু সমান পানিতে নামলাম।

চল তুলি সেলফি হিহি হাহা

ধাক্কা দিয়ে পানির নিচের রাস্তা থেকে পিক-আপ উঠালাম মূল সড়কে। পানি ঢুকে ইঞ্জিন স্টার্ট নিতে কিছুটা সময় নিল। ইঞ্জিন গরম হবার পর ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি। বড়লেখার কাজ সেরে পিক-আপ ছুটছে সিলেট শহরের উদ্দেশে। শেষ বিকালের মৃদু রোদ আর এক পসলা বৃষ্টির মাঝে ছুটে চলছে সে। ঠিক সন্ধ্যার আগমনি বার্তা নিয়ে সিলেট শহরে প্রবেশ করলাম। শেষ অফিসের কাজ সেরে এবার সিলেট শহরে জুয়েল রানার বিবাহিত ব্যাচেলার বাসায় উঠার পালা। ৩৬০ আউলিয়ার দেশে অবাক ভ্রমণের স্মৃতি এত বছর পরও তাজা হয়ে সুখের বার্তা দিয়ে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top