fbpx

অবাক ভ্রমণ: একটি মানসিক হাসপাতালের সমাচার

বিচিত্র এই দেশে মানসিক হাসপাতালও ঘুরার জায়গা। মানুষের বিনোদনের এত অভাব পরিবর্তন হচ্ছে স্বভাব। মানসিক হাসপাতালটি যে নিজেই রোগাক্রান্ত। বিশ্বের সব দেশেই পরিবারের সংস্পর্শে রেখে করা হয় মানসিক রোগের চিকিৎসা। আর বাংলাদেশে ঠিকানাবিহীন রোগী এই পাগলা গারদের চার দেয়ালে বন্দি হয়ে থাকে বছরের পর বছর। তাদের নিতে আসে না কেউ খোঁজ, না নিতে আসে কেউ খবর। উদাস নয়নে আকাশের ঠিকানায় হয়তো চিঠি পাঠায়।

মানসিক হাসপাতালের মূল গেট। ছবি: কায়েস আহমেদ

লাল বিল্ডিংয়ের ভবনটিকে প্রিজন সেল ছাড়া কিছুই মনে হচ্ছে না। অথচ সে ভবনের আশেপাশে কি মানুষের ভিড়। এরা সবাই পাগল দেখতে এসেছে। আমরা নিতান্ত কৌতুহল বসত মানুসিক হাসপাতালটি দেখতে এসেছিলাম। ভয়ংকর সব চিৎকার শোনা যাচ্ছে ভিতর থেকে। এরপরও মানুষের পাগল দেখার শখ মিটে না। নিজেদের সাথে নিয়ে এসেছে ছোট বাচ্চাকাচ্চার দল।

হাসপাতালের পাশে ছিল খোলা মাঠ। ছবি: লেখক

হাসপাতালের গার্ড খুব ভাব ধরে গেটে দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে ঢুকতে দিচ্ছে না কাউকে। মানুষ ৫০-১০০ টাকা হাদিয়া দিয়ে ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। গার্ডের মুখেও কুটিল হাসি। শুধু চিন্তা করি মানুসিক রোগী এত মানুষ দেখে হঠাৎ ভায়োলেট হয়ে গেলে সামাল দিবে কিভাবে। দেশের একমাত্র সরকারি মানসিক হাসপাতাল যে নিজেই জড়াগ্রস্থ। ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে পাগল দেখার মহাযজ্ঞে আমরা সামিল হতে পারলাম না। মানসিক হাসপাতালে প্রধান অংশ থেকে তাই সরে এলাম।

হাঁটতে হাঁটতে আর খানিকটা দূরে আর একটা লাল বিল্ডিং দেখতে পেলাম। সেখানে দেখলাম মানুষের ভিড়। কৌতুহল নিবারনের জন্য সেখানে গেলাম। এবার খানিকটা শান্তি যেন পেলাম। এই অংশে রোগীদের সাথে আত্মীয় পরিবারের সদস্যরা দেখা করতে আসে। কিন্তু সে ভাল লাগাটাও সাময়িক। রোগীদের মলিন চেহারাগুলো জানান দিচ্ছে বিষণ্ণতার গল্প। উদাস নয়নে তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, কেউ গান গাইছে কেউ বা অনেক দিন পর পরিবারের সদস্য দেখতে পেয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।

হাসপাতালে আর এক অংশ। ছবি লেখক

এই দৃশ্য বেশিক্ষণ চোখে সহ্য করা যায় না। শুনতে পেলাম একজন বলছে ২২ জন রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবার পরও ফিরে যেতে পারছে না আপন ঘরে। আপনজন যে ভুল ঠিকানা দিয়েছে। অবহেলা, বুক ভরা অভিমান নিয়েই হয়তো কোনদিন চলে যাবে এই পৃথিবী ছেড়ে। এই পাবনা মানসিক হাসপাতালের এক রোগী বেশ কয়েক বছর আগে ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছিল।  নামটিও হয়ে গিয়েছিল তার বেশ বাহারি, গিটার বাবু। কি করুণ সুরে জন ডেনভারের মিউজিক ঝংকারের মত বাজিয়েছিলেন তার গিটারে।

নারিকেল গাছের সারির মাঝে ফুটে উঠে লাল। ছবি: লেখক

‘অলমোস্ট হেভেন, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, ব্লু রাইজ মাউন্টেন, শেনানডোয়াহ রিভার। লাইফ ইজ ওল্ড দেয়ার, ওল্ডার দেয়ার, ওল্ডার দ্যান দ্যান দ্য ট্রিজ, ইয়ংগার দ্যান দ্য মাউন্টেইনস, ব্লোয়িং লিক অ্যা ব্রিজ… কান্ট্রি রোড টেক মি হোম। টু দ্য প্লেস আই বিলোঙ…’

অসম্ভব প্রতিভাবান এই লোকটির শেষ সম্পদ এই একোয়েস্টিক গিটার। গত ২২ বছর ধরে সেই গিটার তার একমাত্র সংগী। মাদক মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে বাবুদের মত প্রতিভাবান মানুষরাই তার জ্বলত্ব উদাহরণ।

পুরুষ রোগী ভিজিটরের বিল্ডিং। ছবি: লেখক

মানসিক হাসপাতাল কবে থেকে হল দর্শনীয় স্থান। সেই শেকড়ের জড় খুঁজে বের করতে একটু পিছে ফিরে যাই। ১৯৫৭ সালে পাকিস্তান পিরিয়ডে প্রথম এই অঞ্চলে একটি মানসিক হাসপাতাল তৈরি করার প্রয়োজনিয়তা অনুভব করে তৎকালীন সরকার। এই পাবনা শহরের শিতলাই জমিদার বাড়ির ৬০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করে অস্থায়ী মেন্টাল হাসপাতাল। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত সেবা দানের পর অনুধাবন করা হয় স্থায়ী একটি হাসপাতাল হওয়া দরকার। তখন শহরে থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে এক সময় বহমান প্রমত্তা পদ্মার তীরে হেমায়েতপুরে গড়ে উঠে বাংলাদেশের প্রথম স্থায়ী মানসিক হাসপাতাল। এই হাসপাতাল তৈরির সময় অনুকূল ঠাকুর অনেক জায়গা দান করেন।

১১১ দশমিক ২৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্টিত নতুন এ হাসপাতালটি কালক্রমে ২০০ থেকে শুরু করে ৫০০ শয্যায় উন্নিত হয়। বর্তমানে হাসপাতালে ১৫০টি পেয়িং শয্যা ও ৩৫০টি নন-পেয়িং শয্যা আছে। এই মানসিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন পাবনা তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ হোসেন গাঙ্গুলি। 

স্বজনদের ভিড়। ছবি: লেখক

বর্তমানে এখাবে মাদকাসক্ত নিরাময়সহ মোট ১৮টি ওয়ার্ড আছে। বর্হিবিভাগ, আন্তবিভাগ, বৃত্তি ও বিনোদনমূলক চিকিৎসা বিভাগসহ রয়েছে এক্স-রে, প্যাথলজি, ইসিজি, ইইজি পরীক্ষার সুবিধাসমূহ। তবে দুর্নীতি ও অনিয়মের আখড়াও বলা যায় এই হাসপাতালকে। ভাবতে অবাক লাগে দেশের প্রায় দেড় কোটি মানসিক রোগীর জন্য একমাত্র এই সরকারি হাসপাতালে মাত্র ৫০০ শয্যা। নেই কোন ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার। জরুরি রোগে এসে ফিরে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু প্রতিকার চাইবে কার কাছে। দেশের পথে ঘুরতে গিয়ে শুধু যে প্রকৃতির মাঝে ডুবে যাব তা নয়। মানুষের কথাও তুলে ধরতে হবে পরিব্রাজকের ডায়েরিতে। তবে এই অবস্থা থেকে উত্তরনের চেষ্টা হচ্ছে। হাসপাতালের কলেবর বাড়ানোর জন্য বিশাল কর্মযজ্ঞের পরিকল্পনাও হয়ে গেছে। বাস্তবায়ন কবে হবে তা না হয় ঈদের পর জানানো হবে। সেই ঈদ কোন বছর আসবে সে না হয় উহ্য থাকুক।

ঘড়িতে প্রায় আড়াইটা বাজে। বেপরোয়া রৌদ্দুর গুলোও মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেছে। এবার আমাদের ও ছুটে চলার পালা। বৃষ্টি যে কোন সময় আসবে আমাদের ছুয়ে দিত। দুঃখ ভারাকান্ত মন নিয়ে বের হলাম মানসিক হাসপাতাল থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top