fbpx

সোনালী স্বপ্নের সোনার চর: নির্ঘুম রাত

শুনাবো মানুষবিহীন এক চরের গল্প। যেখানের বাসিন্দা ছিল বন মহিষ, শিয়াল, হরিণ, বানর, সাপ, পাখ-পাখালি আর কিছু স্বপ্নবিলাসী মানুষ। রাতে সাগর পারে যেমন দেখেছি মহিষের পাল সারি সারি লাইন ধরে জঙ্গলে যাচ্ছে তেমনেই শুনেছি শিয়ালের হুক্কাহুয়া৷ রাত জাগা পাখির মত দেখেছি আকাশের তারা। আর ভোরের সিগ্ধতায় ভরিয়ে দিয়েছে এই দেহ মন৷ জলের জীবন পানির মত জীবন।

উড়াবো ফানুশ, রঙের মানুষ। ছবি: জাকারিয়া পারভেজ

পায়ের নিচে মাটির স্পর্শ পেয়ে যেন ধীর‍তা পেলাম। বুনো ওয়াইল্ডনেসের সংজ্ঞা শুধু কিতাবে পড়েছি এখানে এসে যেন অনুভব করতে পারলাম। লিডারের দেওয়া তাঁবু পিচ করতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম মামুন ভাই আর আমি৷ ট্রলারের মাঝি চাচা ভাত আর ইলিশ মাছ আগেই রান্না করে রেখেছিল। তাই তাঁবু পিচ করে আর দেরি না করে খাবারের উপর বুভুক্ষের মত ঝাপিয়ে পড়লাম। ট্রলারের ভিতরে খাটের উপর পা ঝুলিয়ে ইলিশ ভাত খাচ্ছি আর ঘামছি। গরমে কান দিয়ে ধুয়া বের হলেও অসাধারণ স্বাদ লাগছে ইলিশ ভাত।

খাওয়া পর্ব সেরে রমজান, মামুন ভাই আর আমরা গেলাম সি বিচের দিকে। রাতের নির্জন সমুদ্র সৈকত৷ কাছে পিঠে মরা শুশুকের গন্ধে বমির উদ্বেগ হল। এরপরও রাতের নির্জনতায় এক মায়াবী রূপ নিয়ে হাজির হয় সমুদ্র৷ বাতাসের মৃদু স্পর্শে পিছের ঝাউবনের পাতা কেপে উঠছে। এখানকার সমুদ্র কক্সবাজারের মত গর্জন শুনায় না৷ এখানকার সমুদ্রে আছে নির্জনতার আহবান৷ যেন এই নির্জনতা মানুষকে অনেক দূর ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে৷ দূর সমুদ্রে দেখা যাচ্ছে টিমটিমে বাতি নিভু নিভু করছে৷ মাছ ধরার নৌকায় কত শান্তিতে নিড় বেধেছে জলপুত্ররা।

পাখির চোখে সোনার চর। ছবি: জাকারিয়া পারভেজ

ইতিমধ্যে এসে পড়লো ফান্টা হুজুর আরিফ ভাই আর তার বন্ধু মহল। খোস গল্পে মসগুল সবাই। এর মাঝে রমজান কোথা থেকে টাকি মাছ ধরে নিয়ে এল। টাকি তো নদীর মাছ এই সমুদ্রে এল কিভাবে। সে এক রহস্য? সব কিছু ছাপিয়ে লক্ষ্য করলাম মাঝ সমুদ্রে সারি সারি বুনো মহিষের পাল জলে গা ভাসিয়ে তীরের দিকে ফিরে আসছে৷ মহিষের দল হঠাৎ থেমে গেল পানির মাঝে। অন্য প্রাণীর গন্ধে সম্মুহ বিপদের কথা চিন্তা করছে। আগাচ্ছে না আবার পিচ্ছাছে না।

মামুন ভাই আর ফান্টা হুজুরের হুশিয়ারিতে খেয়াল করলাম আমরা মহিষদের জংগলে যাবার রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। আমরা আস্তে করে একটু দূরে সরে গেলাম। এরপরও পুরো পালের মধ্যে অস্থিরতা খেয়াল করলাম। নেতা গোছের মোটা সোটা একটা মহিষ পানি থেকে তীরে এসে উঠলো। বালুকাময় সৈকতে পায়ের খুঁড় দিয়ে চারবার আঘাত করলো। ঠকঠক শব্দ হল। অদ্ভূত ব্যাপার পালের বাকি মহিষগুলো এক লাইন করে উপরে উঠে আসলো।

বুনো মহিষের দল। ছবি: জাকারিয়া পারভেজ

প্রথমে নেতা গোছের মহিষটা বনে ঢুকলো তাকে অনুসরণ করলো পুরো মহিষের পাল। দেখতে দেখতে সবাই ঢুকে গেল। শেষ মহিষটা উঠার পর আবার নেতা গোছের মহিষের মত পা দিয়ে চার বার ঠক ঠক আওয়াজ করলো। অদ্ভূত এদের দলবদ্ধতা। বুঝতে পারলাম পিছে কোন মহিষ থেকে থাকলে পায়ের শব্দে যেন বুঝতে পারে কোথায় যাচ্ছে তার দল। প্রকৃতি প্রতিটা প্রাণীকে শৃঙ্খল হতে শিখায় শুধু আশরাফুল মাখলুকাত ছাড়া৷ এদের মত ইউনিটি আমাদের মাঝে থাকলে দেশের অর্ধেক শান্তি এমনেই ফিরে আসতো। আর কিছুটা সময় কাটিয়ে ফিরে এলাম ক্যাম্প সাইটে৷

লজ্জাবতি মহিষ। ছবি: লেখক

ফিরে এসে দেখতে পেলাম খিচুড়ি করার আয়োজন চলছে আর সাথে ইলিশ মাছ কেটেকুটে লেমেনেড করায় ব্যস্ত জাহিদ ভাইরা৷ আমরাও একটু তাঁবুতে ঢুকে গা’টা এলিয়ে নিলাম। নির্জন সৈকতে খাটানো সেই তাঁবুতে ডুবে গিয়েছিলাম গভীর ঘুমে। ঘুমটা ভাংগলো জাকারিয়া ভাইয়ের ফানুশ উড়ানোর ডাক শুনে৷ মামুন ভাই আমি বের হলাম তাঁবু থেকে৷ ঘড়ির কাটায় ১১টা।

শুশুকের শবদেহ। ছবি: লেখক

মাঝি চাচা আর তার সাগরেদ খিচুড়ি ঘুটায় ব্যস্ত৷ আর আমরা জংগলের পথ ধরে চলে এলাম আবার সমুদ্র সৈকতে৷ দেখি ফানুস উড়ানো প্রস্তুতি চলছে৷ দড়ি দিয়ে জাহিদ ভাইয়ের গ্রুপের লগো বানানো হয়েছে। সেখানে পেট্রোলের হাল্কা স্পর্শে ধরানো হয়েছে আগুন। লগোটা আর সুন্দর ভাবে ফুটে উঠলো৷ জাকারিয়া ভাই ড্রোন নিয়ে এসেছিল৷ উড়ক্কু ক্যামেরা দিয়ে উঠাচ্ছে লগোর ছবি৷

এক সারিতে আমাদের তাঁবু। ছবি: লেখক

এরই মাঝে দুয়েকটা ফানুস আকাশে উড়ে গেল৷ সবার মধ্যে একটা ছেলেমানুষী ভাব দেখলাম ফানুস নিয়ে৷ সমুদ্র সৈকতে তারার মত উড়ে যাচ্ছে ফানুসগুলো৷ উড়ে উড়ে দূর দিগন্তে হারিয়ে যাচ্ছে৷ মাঝরাতে সবাই ফিরে এল তাঁবুতে। কিন্তু আমার চোখে ঘুম নাই৷

ট্রলারে দেখি বসে আছে জাহিদ, জাকারিয়া, টিটু, আফিফ ভাই আর সাথে আমাদের ফান্টা হুজুর৷ ভাবি তাহাদের সাথে ট্রলারেই রাতটা কাটিয়ে দিব। ট্রলারে উঠে জাহিদ ভাইয়ের সাথে কথার মাঝে বুঝলাম মিস ম্যানেজমেন্ট নিয়ে তারাও অনেক কস্ট পেয়েছেন। আসলে ম্যানেজমেন্টের ঘাড়ে সব বোঝা চাপিয়ে তো পার হওয়া যায় না। দুপক্ষেরেই বোঝাপড়ার সমন্বয়হীনতা ছিল। কথা কম বলা ঠাণ্ডা মাথার মানুষ জাহিদ ভাই তাদের পক্ষ থেকে যে মিস ম্যানেজমেন্ট কিছুটা হয়েছে স্বীকার করলেন। কয়জনেরবা এইটা স্বীকার করার সৎ সাহস আছে৷

সুখী দুই বন্ধু আপু আর হবে তপু। ছবি: লেখক

রাত গভীর হচ্ছে। আশেপাশে নাম না জানা পশুদের পদচারনায় মুখরিত। দূরে শুনা যাচ্ছে বাঁদুরের পাখার ঝাপটানি৷ হুক্কাহুয়া আওয়াজে শরীরে কেমন জানি শিহরণ বয়ে গেল। দূরে কোথাও ডাকছে শিয়ালের পাল৷ সারা বনে যেন প্রতিধ্বনি শুনা যাচ্ছে। একটু খেয়াল করে বুঝতে পারলাম বনের দুই সাইড থেকে শুনা যাচ্ছে শিয়ালের ডাক। যেন এক পক্ষ আর এক পক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

এতক্ষণ পর মনে পড়লো কার্বলিক এসিড ছিটানো হলেও ক্যাম্প ফায়ার করা হয় নাই। শিয়ালকে খামাখা তো আর পণ্ডিত বলা হয় না৷ দলছুট দুই একটা শিয়াল এসে পড়লো আমাদের ক্যাম্প সাইটে। হুসহুস করে তাড়ানোর চেস্টায় যেন সাময়িক ভাবে জেগে উঠলো পুরো ক্যাম্প সাইট। বুদ্ধিমান প্রাণীটি বুঝতে পারলো সংখ্যায় কম। মানে মানে কেটে পড়লেও ভয়ের একটা দলা মাথায় ঢুকিয়ে গেল।

তাঁবুতে পেট ভাসিয়ে আমাদের গণেশদা জিয়া ভাই। ছবি: লেখক

কবে আবার ফিরে আসে। সে চিন্তাটা সাময়িক ছিল। ফান্টা হুজুরের ডাকে ফিরে চাইলাম। আরিফ ভাই বললেন ভাই আকাশে দেখ কত তারা। আকাশ পানে তাকিয়ে আমি অবাক হয়ে গেলাম। চারদিকে পিনপতন নিরবতার মাঝে লক্ষ লক্ষ তারার মেলা বসেছে৷ শহরের অপরিকল্পিত নগারায়ন আর চুরি হয়ে যাওয়া আকাশটার মাঝে তারাগুলো কোথায় হারিয়ে গেল। আর নির্জন এই অরণ্যে রাত জাগা পাখির মত আমি দেখছি রাতের তারা। মেঘমুক্ত অন্ধকার রাতে অগুনতি তারার মেলা মাঝে মনে পড়ে যায় জীবনানন্দের কবিতা:

রয়েছি সবুজ মাঠে—ঘাসে—
আকাশ ছড়ায়ে আছে নীল হ’য়ে আকাশে-আকাশে;
জীবনের রং তবু ফলানো কি হয়
এই সব ছুঁয়ে ছেনে’;—সে এক বিস্ময়
পৃথিবীতে নাই তাহা—আকাশেও নাই তার স্থল,
চেনে নাই তারে ওই সমুদ্রের জল;
রাতে-রাতে হেঁটে-হেঁটে নক্ষত্রের সনে
তারে আমি পাই নাই; কোনো এক মানুষীর মনে
কোনো এক মানুষের তরে
যে-জিনিস বেঁচে থাকে হৃদয়ের গভীর গহ্বরে
নক্ষত্রের চেয়ে আরো নিঃশব্দ আসনে
কোনো এক মানুষের তরে এক মানুষীর মনে।

ব্যস্ত তাবুবাসি। ছবি: লেখক

জীবন সুন্দর, পানির মত সুন্দর, জলের মত সুন্দর৷ ভেবেছিলাম জেগে থাকবো সারা রাত। ভাটার কারণে পানির স্তর কমে যাওয়ায় আমাদের ট্রলার সামান্য বেকে ছিল পুরাটা সময়। ট্রলারের ছাদে গা এলিয়ে দিলাম। ভয় ছিল পড়ে না যাই। কোথায় থেকে বনের দেবী মাথায় আদরের স্পর্শ দিয়ে গেল। আর আমি চলে গেলাম ঘুমের রাজ্যে। অপেক্ষা আর একটা দিনের।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top