fbpx

শীতের রাতে শ্রীমঙ্গলে: হিমাচল রিসোর্টের আতিথেয়তা

সারাদিনের ফেলে আসা এলোমেলো চিন্তা ভাবনাগুলো মাথায় ঘুরপাক করতে করতে কখন যেনো ঘুমিয়ে পরেছিলাম। ঘুম ভাঙ্গলো পাশের সিটে বসা ভদ্রলোকের আলতো ডাকে, ভাই আপনি না শ্রীমঙ্গল নামবেন?

হ্যাঁ তাইতো ট্রেন থেমে গেছে শ্রীমঙ্গল স্টেশনে, তড়িঘড়ি করে নেমে গেলাম। নেমেই টের পেলাম প্রচণ্ড শীতের অনুভূতি। রাত ২:৫০ বাজে এই সময়েই সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনটা আমাকে শ্রীমঙ্গলে নামিয়ে দিয়েছে অসংখ্যবার। যদিও একবার একটা বিপত্তি বেঁধে গেছিলো, তখন শ্রীমঙ্গলেই থাকতাম প্রতি সপ্তাহে ঢাকা আসা যাওয়া করা লাগতো, জানুয়ারি মাস প্রচণ্ড শীত সেইরাতে তাপমাত্রা ছিলো ৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস।  ট্রেন যখন শ্রীমঙ্গল পার হয়ে যায় তখনো ঘুমিয়ে ছিলাম। ঘুম ভাঙ্গে লাউয়্যাছড়া উদ্যান পার হওয়ার সময়, সকালে অফিসের মিটিংও আছে, কি বিপত্তি। বাধ্য হয়ে নামলাম পরের স্টপেজ শমসেরনগর স্টেশনে।

চন্দ্রাহত হিমাচল রিসোর্ট।

ছোট স্টেশন ওয়েটিং রুমটাও বন্ধ শীতে জবুথবু অবস্থা, কয়েকজনকে ডেকে রুমের তালা খোলা হলো কিন্তু চেয়ারে বসার পরে মনে হলো কোনো বরফ পিণ্ডের উপরে বসলাম, ঘণ্টাখানেক পরে চট্টগ্রামগামী লোকাল ট্রেন আসলো। ট্রেনে উঠে দেখি ভয়ানক অবস্থা। সব লাইট বন্ধ, সিটের উপরে নিচে শুয়ে, ঘুমিয়ে আছে অসংখ্য মানুষ। ভয়ার্তভাবে একজনকে ডেকে তুলে সিটে বসলাম তারপর সেই ট্রেনে করে শ্রীমঙ্গল আসলাম। এরপর থেকে পাশের যাত্রীকে বলে দেই ভাই শ্রীমঙ্গলে আসলে ডেকে দেওয়ার জন্য, আজকেও একি অবস্থা হয়েছিলো।

বাহারি ফুলে সাজানো হিমাচল রিসোর্ট।

এই শ্রীমঙ্গল জায়গাটা আমার অন্যতম পছন্দের, যতো যাই ততোই ভালো লাগে। এমনকি নিজের অজান্তেও চলে যাই এরকম একটা বিষয় জড়িত, যান্ত্রিক শহরে প্রতিদিনের নিত্য কাজের চাপে পিস্ট হতে হতে শীতের দিনেও গরমে হাসফাস অবস্থা, যাযাবর মনটা শীতের সকালে শিশিরকণার ছোয়া আর প্রাণভরে শীত উপভোগ করার তাগিদ অনুভব করছিলো। তাই হুট করেই উঠে পরলাম সিলেটগামী রাতের ট্রেনে। ট্রেনে বসেই কয়েকটা রিসোর্টে ফোন করলাম কিন্তু হুট করে রুম পাওয়াটা সম্ভব নয় তাই সবাই বিনীতভাবে দুঃখিত বলে। কয়েকদিন থেকেই পরিচিত মহলে সদ্য চালু হওয়া হিমাচল রিসোর্টের গুণগান শুনছিলাম। ফেসবুক থেকে নাম্বার নিয়ে অবশেষে হিমাচল রিসোর্টে ফোন দিতেই তারা জানিয়ে দিলো একটা রুম দেওয়া যাবে। তাই ট্রেন থেকে নেমে স্টেশনে বসে না থেকে একটা সিএনজি নিয়ে চলে গেলাম রাধানগরে অবস্থিত হিমাচল রিসোর্টে। এই রোডেই অনেকগুলো ইকো রিসোর্ট আছে, কয়েকটাতে থাকার অভিজ্ঞতা থাকলেও হিমাচলে প্রথমবার যাচ্ছি। তার উপর যাচ্ছি রাত ৩ টার পরে তাও আবার প্রচণ্ড শীতের রাতে। এরকম হাজারো এলোমেলো চিন্তা মাথায় উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিলো।

নান্দনিকতা আর সবুজের ছোয়ায় গড়া।

কিন্তু সিএনজি যখন রেললাইন ক্রস করে বারাউরা চা বাগানে প্রবেশ করলো তখনি যেনো মনে হলো কোন হীমবাহের মধ্যে প্রবেশ করলাম আমি, সমস্ত আবরণ যেনো ব্যার্থ আজ এই শীতের কাছে। দুইপাশ থেকে ছুটে আসছে তীব্র শীতের সৈনিকরা আক্রমণ করছে আমাকে তাদের রাজ্যে অনুপ্রবেশের দায়ে। সিএনজির দুইপাশের পর্দা আটকে দিয়েও কাজ হলোনা যদিও সিলেট অঞ্চলে সিএনজির পর্দা নিয়ে আমার অসন্তোষ আছে, এখানে একটা কাপড় ব্যবহার করা হয় বৃস্টিও আটকানো যায়না শীতও আটকায় না।

সকালে মিষ্টি রোদে এক কাপ চা।

১৫ মিনিটের মধ্যেই চলে আসলাম রিসোর্টে। ভোররাতেও উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলাম। সাথে সাথেই রুম বুঝিয়ে দেওয়া হলো। রুমে ঢুকেই নরম বিছানায় এলিয়ে দিলাম দেহ আর হারিয়ে গেলাম ঘুমের রাজ্যে। সকালে উঠে চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম বেশ সুন্দর প্রাকৃতিক জায়গায় রিসোর্ট টা অবস্থিত, সবচেয়ে ভালো লেগেছে ছাদে বসে রোদ পোহানোর সাথে সাথে সকালের নাস্তা সেড়ে নেওয়া আর গরম গরম চা। রিসোর্টটা ঘুরে ঘুরে দেখলাম, সবচেয়ে ভালো লাগলো নান্দনিকতা।

হিমাচল রিসোর্টের হাঁসের মাংস ভুনা।

সাধ্যের মধ্যে সবটুকু সুখ বলতে যা বুঝি তার সবটাই আছে এখানে। লতানো বিভিন্ন  গাছপালা, বাহারি ফুল আর বিভিন্ন পেইন্টিং সব মিলিয়ে চমৎকার একটা গুছানো পরিবেশ। খুব আপন মনে হলো, একদম নিজের ঘরের মতো। আর তাদের আন্তরিকতা অতুলনীয়। প্রথমবার গিয়েছি অথচ মনে হলো কতো আপন, কতোদিনের চেনা আত্মীয়। 

শ্রীমঙ্গলের চা বাগান। ছবি: লেখক
চা বাগানের বাঁকে বাঁকে বুনো ফুল। ছবি: লেখক

আমি খুবই সৌভাগ্যবান শ্রীমঙ্গলে আমার বেশ কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী আছে, যার মধ্যে লিমন ভাই অন্যতম। লিমন ভাইকে ফোন করতেই অবাক হয়ে গেলো শ্রীমঙ্গল আসছি শুনে কিছুক্ষণ পরেই চলে আসলো, মোটরসাইকেলে করে বেড়িয়ে পরলাম পরিচিত পথ ধরে, আমার পছন্দের রাস্তা লাউয়াছড়া থেকে নুরজাহান চা বাগান হয়ে মাধবপুর লেক তারপর শেষ সীমান্ত ধলই চা বাগানে বীরশ্রেষ্ঠ হামীদুর রহমানের সমাধীস্থল। ফেরারপথে হীড বাংলাদেশ লেক ও শমসেনগর চা বাগানের বিসলা লেক ঘুরে মুন্সীবাজার হয়ে মিরতিংগা চা বাগানের মধ্য দিয়ে এলোমেলো টিলা পথের সর্পিল চা বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে চলে আসলাম মাঝদিহি চা বাগানে।

লাউয়্যাছড়া উদ্যানের বর্ধিত বনায়ন। ছবি: লেখক

এই রাস্তাটা আমার খুব পছন্দের এর অন্যতম কারন খুব নিরিবিলি থাকে এবং বেশ কিছু টিলা আছে এই পথে। শীতের দিন খুব তারাতারি ফুরিয়ে যায় বাইক্কা বিল যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও আর যাওয়া হলোনা সময় স্বল্পতার জন্য। এদিকে হিমাচল রিসোর্ট থেকে বারবার ফোন দিচ্ছে হাঁসের মাংস নাকি ঠাণ্ডা হয়ে জমে যাচ্ছে আবার ফিরতি ট্রেনের সময় হয়ে এলো বলে। রিসোর্টে ফিরে হাঁসের মাংস ভুনা আর গরম ভাত দিয়ে শেষ বিকেলে দুপুরের খাবার খেলাম। শুধুমাত্র হাঁসের মাংস ভুনা খাওয়ার জন্য হলেও হিমাচল রিসোর্টে বারবার আসবো।

হীড বাংলাদেশ লেক। ছবি: লেখক

সূর্যাস্তের সাথে পাল্লা দিয়ে শ্রীমঙ্গলে চলে আসলো সিলেট রুটের সবচেয়ে ভালো ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস। ভাগ্যিস সকালে চা পান করতে করতে অনলাইনে টিকেট কিনে নিয়েছিলাম।স্টেশন থেকে পছন্দের জলডোবা আনারস আর নাগা মরিচ কিনে চেপে বসলাম ব্যস্ত নগরীর পানে আর কথা দিয়ে আসলাম শ্রীমঙ্গলকে আবারো আসবো তোমার সাথে মিতালি করতে। 

বিসলা লেক। ছবি: লেখক

ভ্রমণকালীন সময়ে পায়ের ছাপ ব্যাতিত অন্যকোনো ছাপ না ফেলে আসাটাই উত্তম, প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর এমন কোনো দ্রব্য না ফেলে আসা দায়িত্বশীল ভ্রমণের ছাপ। 

ঠিকানা: হিমাচল রিসোর্ট, রাধানগর, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার। ফোনঃ ০১৮৩৫-১১৫৫৩৩

ফেসবুক পেজ:
https://www.facebook.com/Himacholresorts/

গুগল ম্যাপ লোকেশন:
Himachol Resort,Sreemangal01835-115533https://maps.app.goo.gl/6frFAfDX2dgj6GhT7

ফিচার ছবি ও রিসোর্টের ছবিগুলো হিমাচল রিসোর্টের ফেসবুক পেজ থেকে নেয়া

2 thoughts on “শীতের রাতে শ্রীমঙ্গলে: হিমাচল রিসোর্টের আতিথেয়তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top