fbpx

সেদিন মায়ুং কপালে আমার কপাল!

‘মায়ুং কপাল’ খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার পেরাছড়া ইউনিয়নের একটি পাহাড়ে লোহার তৈরি সিঁড়ি পথের নাম। 

স্থানীয়দের কাছে হাতিমাথা খ্যাত এই স্থানের চাকমা নাম ‘এদো সিরে মোন’। আবার অনেকের কাছে এটি স্বর্গের সিঁড়ি হিসেবেও পরিচিত। অনেকগুলো গ্রামের মানুষের চলাচলকে সুবিধাজনক করতে হাতিমাথা পাহাড়ের এক চুড়া থেকে আরেক চুড়ায় যেতে প্রায় ৩০৮ ফুট লম্বা এই লোহার সিঁড়ি তৈরি করা হয়।

স্বর্গের সিঁড়ির চূড়া থেকে দূরের খাগড়াছড়ি শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। তাছাড়া সবুজে ঘেরা পাহাড়ি প্রকৃতি, মেঘের লুকোচুরি খেলা এবং আদিবাসী জীবনধারার বৈচিত্রময় অভিজ্ঞতা লাভ করা যায়।

জীবনে মায়ুং কপালের আগে ট্রেকিংয়ের উদ্দেশ্যে কখনো ট্রেকিং করা হয়ে উঠেনি। তাই ট্রেকিং নিয়ে কৌতূহল ও ভয় দুটো নিয়েই আমি, বন্ধু স্নিগ্ধ, আমাদের হোস্ট বাবু ভাই এবং ট্রেকিংয়ে অভিজ্ঞ জ্যোতি এই চারজন ইন্টারনেটে বিভিন্ন ট্রাভেল গ্রুপের সহযোগিতা নিয়ে খাগড়াছড়ি থেকে স্বর্গের সিঁড়ির উদ্দেশ্যে সকাল সকাল বের হই। 

অটো রিক্সা দিয়ে পানছড়ি যাওয়ার পথে জামতলীস্থ যাত্রী ছাউনির সামনে বামদিকের রাস্তা ধরে সোজা যেয়ে চেঙ্গী নদী পার হই। আমাদের সাথে এক আর্মি অফিসার ও তাঁর স্ত্রীও নদী পার হয়। কিন্তু তখনও জানতাম না, তারাও স্বর্গের সিঁড়ির সৌন্দর্য উপভোগে যাচ্ছে।

নদী পার হয়েই শুরু হলো হাঁটা। একটি স্কুলের সামনে দিয়ে যেয়ে একটু এগুলেই একটি দোকান। সেখান থেকে পানি নিয়ে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করে সামনের দিকে মেঠো পথ দিয়ে হাঁটছি। দুটি বাঁশের সাঁকো পার হয়ে একটি  ছড়ার পাশ দিয়ে ছোট্ট রাস্তা, সেটি দিয়ে আরেকটি বাঁশের সাঁকো পার হয়ে এবার সোজা মূল মেঠো পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছি। 

সামনে কিছু দূর যেয়েই আবার আরেকটু বিস্তৃত ছড়া। মনের মধ্যে ভয় অথচ বন্ধুদের বুঝতে না দিয়ে ছড়া পার হয়েছি কষ্ট করে। হাঁটু পানি পার হয়ে ভেজা কেটস্ নিয়ে আবার হাঁটছি। এবার শুরু হলো ছোট বড় আঁকাবাঁকা পথ। ততক্ষণে আমি ক্লান্ত। পানি যা ছিলো শেষ! জ্যোতি আর বাবু ভাই অনেকটা সামনে চলে গেছে, স্নিগ্ধও ততক্ষণে টায়ার্ড কিন্তু জ্যোতিকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছে।

আমি ভয় (নির্জন পাহাড়ে আদিবাসীদের ভয় পাচ্ছিলাম। বের হওয়ার আগের দিনেও খাগড়াছড়িতে বাঙ্গালীদের সাথে আদিবাসীদের মারামারি হয়েছিলো বলে।)  এবং ক্লান্ত শরীরে তাদের অনেকটা পেছনে হাঁটছি। 

একটি টিলা পার হয়ে মেঠো পথ ধরে এগিযে যেতে যেতে সামনে লোকালয় পেলাম। সেখানে এক আদিবাসী ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম,  আর কত দুর? সে বললো আরো ১ ঘণ্টা লাগবে। এবার আমি হাল ছেড়ে দিলাম। জ্যোতিকে উচ্চ স্বরে আওয়াজ দিয়ে ডেকে বললাম, তোমরা যাও, আমি আর পারবো না!

তাদের রিকুয়েস্টের পরেও আমি রাজি না হয়ে পেছনে ফিরতে শুরু করি। 

ঠিক তখনই সেই আর্মি অফিসার ও তাঁর স্ত্রী আমার সামনে! বললো, নামছেন কেন? চলুন আমরাও যাচ্ছি। ভাবলাম, একজন মেয়ে হয়ে পাহাড় টপকাবে আর আমি পারবো না! সুন্দরী ভাবীর কথায় উৎসাহ পেয়ে আবার উপরের দিকে হাটা শুরু করলাম! বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে আমি, আর্মি দম্পতী ও এক পাহাড়ি বয়স্ক আদিবাসী দাদু হাঁটছি।

তৃষ্ণায় গলা ফেটে যাচ্ছিলো। কোথাও পানি নেই। অবশেষে আদিবাসী দাদু সন্ধান দেয় পাহাড়ি ঝিড়ি বেয়ে আসা অপরিস্কার পানির। তৃষ্ণায় সেই পানিই পান করে বোতল ভরে  আবার হাঁটা শুরু করি, সামনে পাই একটি মাঠ,  মাঠটি সোজা পার হয়ে নিচুপথ ধরে এগিয়ে যাই। যেতে যেতে কিছুক্ষণ পর পেয়ে যাই অসাধারণ হাতিমুড়া বা স্বর্গের সিঁড়ি!

আনুমানিক ১১০- ১২০ ডিগ্রি এঙ্গেলের খাড়া প্রায় ৩০০ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলাম। হিমশীতল এই সিঁড়ি বেয়ে যখন পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে থাকলাম তখন নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। বনের মাঝে এঁকেবেঁকে যাওয়া এই সিঁড়িটি দেখতে ভয়ংকর লাগলেও তেমনটা নয়। একটু সাবধানতা বজায় রেখে উঠলেই হয়।

উপরে উঠে আমরা যে যার মতো ছবি তুলছি, আনন্দ করছি। এমন সময় হঠাৎ আর্মি অফিসার বলে উঠলেন, কারো হাইট ফোবিয়া নেই তো! হাইট ফোবিয়া থাকলে এ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠা যতটা সহজ তার থেকে নিচে নামা ততটাই কঠিন। 

আমার হাইট ফোবিয়া নেই, কিন্তু এ কথা শোনার পর নিচে নামা নিয়ে টেনশনে পরে গেলাম! অপেক্ষা না করে এবার নামতে শুরু করলাম। এত খাড়া সিঁড়ি নামছি আর ভয়ে শরীর কাঁপছে! নিচে তাকাতে পারছিলাম না। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কখনো বসে বসে, কখনো রেলিং ধরে হেঁটে অবশেষে নিচে নেমে আসি। অথচ আদিবাসী ৮/১০ বছর বয়সি শিশুরা প্রতিদিন এ সিঁড়ি আর পাহাড় টপকিয়ে স্কুলে যায়!

সেদিন আমার চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছিলো না। নিজেকে নিজেই চিনতে কষ্ট হচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো ওজন একদিনে ৫/৭ কেজি কমে গিয়েছিলো!

কি ভয়ংকর অভিজ্ঞতা!

লেখক: ওয়াহিদুল মোমেন হিল্লোল।

Back to top