fbpx

সাতক্ষীরা ডায়েরি: টাকীর ঘাট

রূপসী ম্যানগ্রোভ দর্শণ শেষে আবার পদ যুগলখানা ক্রিচক্রযানে উঠাইয়া বসলাম। চলছে আমাদের ভ্যান নতুন কোন গন্তব্যের উদ্দেশে। জেলা সাইটে দেবহাটার দর্শণীয় স্থানের মধ্যে দেবহাটা জমিদার বাড়ি, টাকীর ঘাটের সন্ধান পেয়েছিলাম।  ছুটেছে সেই গন্তব্যের উদ্দেশেই। দেবহাটা জমিদার বাড়ির অবস্থান লোকজনকে জিজ্ঞেস করে বের করতে হল। আমাদের ভ্যানয়ালা মামার এ জমিদার বাড়ির ব্যাপারে কিছুই জানেন না।

দেবহাটা জমিদার বাড়ি। ছবি: লেখক

তবে এইটাও সত্য জেলা পরিষদ বা ইন্টারনেটে বিশ্ব সার্চ করেও এই জমিদার বাড়ির কোন ইতিহাস বা তথ্য পেলাম না। এর ইতিহাস কি হারিয়ে গেল ইতিহাসের পাতা থেকে। যাই হক অনেক কাঠ কয়লা পুড়িয়ে তার সন্ধান পেলাম দেবহাটা জমিদার বাড়ির। এক ঝলক না দেখে গেলে কি হয়। জমিদার বাড়ির সিংহ দুয়ারে ঢুকতে পাশে দেখতে পেলাম দুইটি সাইকেল আর বরাবর দূর্গা দেবীর প্রতিমা। ঢুকে বামে ঘুরতে দেখতে পেলাম জমিদার বাড়ির অবশিষ্ট ধ্বংসাবশেষ।

জমিদার বাড়ির গেটের সামনে ওয়াফি আহমেদ। ছবি: লেখক

নতুনের মাঝে এক চিলতে পুরানের বাস, শেষ হয়ে যাব কোন এক সময় ইতিহাস। সেইটাই হয়ে আসছে। জমিদার বাড়ির কোন বংশধরকে সামনে পেলাম এর ইতিহাস জিজ্ঞেস করার জন্য। সামনে দেখা যাচ্ছে ধ্বংস হয়ে যাওয়া জমিদার বাড়ির তিনটি দুয়ার। সামনের ডিজাইন দেখে বলা যায় এর নির্মাণ শৈলিতে রেনেসাঁ যুগের ছাপ প্রকট ভাবে ফুটে উঠেছে। সেই ধ্বংসাবশেষের ভিতরে ঢুকে দেখতে পেলাম এই অংশে হাস মুরগীর খোয়াড় করা হয়েছে। বিশ্রী একটা গন্ধ নাকে জাকিয়ে বসলো। কিছুটা হতাশ হয়ে বের হলাম জমিদার বাড়ি থেকে।

নান্দনিকতা। ছবি: লেখক

সবুজের মাঝে নতুন করে পথের হল চলা শুরু। ভ্যান চলছে দেবহাটার পথে ঘাটে। সামনে এক সাইকেলে দুই বন্ধুকে দেখতে পেলা। স্কুল ছুটি হবার পর এভাবেই হয়তো পথের খুনসুটিতে মেতে প্রতিদিন তাদের বাড়ি যাওয়া হয়। খানিকটা দূর যাবার পর দেখতে পেলাম ইটের ভাটা। ইটের ভাটা যেন বিষণ্ন আকাশে মেঘের ধোয়া ছাড়ছে। শুদ্ধের মাঝেই বিশুদ্ধের জন্ম। এভাবেই তো ধরণি চলছে জন্ম থেকে জন্মাতর।

খুলে দাও দুয়ার। ছবি: লেখক

সামনে ইটের সোলিং করা আধা পাকা রাস্তা দেখতে পেলাম। ভ্যানয়ালা মামা বললেন এসে পড়েছি টাকীরঘাট। টাকীর ঘাটে টাকি মাছ পাওয়া যায় কি না তা জানি না। তবে আশেপাশের অনেক মাছের ঘের দেখতে পেলাম। দূর দিগন্ত পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে মাছের ঘের। রাস্তার এক পাশে মাছের ঘের আর অন্য পাশে ডুবো পানিতে বুনেছে কৃষক সোনালী স্বপ্নের ধান। সে পানিতে হয় আবার মাছের চাষ। কৃষি প্রধান দেশ ধান এক সোনালী বিপ্লব। ধান অর্থনীতির মধ্যমনি।

ধান ক্ষেতের মাঝে ছইঘর। ছবি: লেখক

টাকীর ঘাটের রাস্তার দু পাশে নারিকেল আর খেজুর গাছ দেখা যাচ্ছে একটু পর পর। আকাশটা বিষণ্ন, রোদ নেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। তারই মাঝে ছোট একটা নালা পার করতে গিয়ে ধপাস করে পড়লো ওয়াফি আহমেদ। উঠে দাড়ালো সে। সামনে দেখতে পেলাম হাস্যজ্জ্বল এক কৃষক ভাইকে। আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলো, ‘ভাই কি সাম্বাদিক?’ বরাবরই এ ব্যাপারে আমার রহস্যময় এক হাসি থাকে। যতই বলি বাপু আমি সাংবাদিক নই ততই অবিশ্বাস করে। কৃষক ভাই সুন্দর করে হেসে বললেন, ‘ভাইডি আমার একটা ছবি তুলে দেন।’ অনুরোধের ঢেকি তো গিলতেই হয়। সারা বাংলাদেশ ব্যাপী এই ঢেকি গিলে এসেছি।

সবুজের মাঝে বাধিলাম আমার ঘর। ছবি: লেখক

কৃষক কাম মাছ চাষীর নাম সোলেমান ভাই। সোলেমান ভাই তার কাজ নিয়ে মহাখুশি। সারাদিন এখানেই পড়ে থাকেন। বিকাল হলে বাড়ি ফিরেন। হয়তো কামান না কাড়ি কাড়ি টাকা। তবে কিছু কিছু কাজ সমাজে এমন ছাপ রেখে যায় সেই কাজের উচ্চতা টাকা দিয়ে মাপা যায় না। কৃষি তো তেমনই কাজ। কত অল্প আয় অথচ সোলেমান ভাইয়ের কি ভুবন ভুলানো হাসি। তিনি আমাদের ফসলের ক্ষেতে আইলের মাঝে মাঝে ছনের ঘরগুলো দেখালেন। এখানেই বাস কিছু স্বপ্নবিলাসি মানুষের। রাতে এসে পাহারা দেয়া থেকে শুরু করে রোদে পুড়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে এখানেই তারা বিশ্রামে আসেন। আহা কি সুখের জীবন।

ভুড়ি ভাসিয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের সোলেমান ভাই। ছবি: লেখক।

আজ টাকীর ঘাট যেন আমাদের সাথে গল্প করতে বসেছে। বিষণ্ন আকাশে মেঘের অনেক রং। সবুজ অমৃত স্পর্শ ছোয়ায় পথিক হারিয়ে যায়। সবুজ ধান ক্ষেত, সবুজ দূরের ওই না চেনা গ্রাম। প্রকৃতি সেজেছে আজ বৃষ্টিতে ভিজে সবুজের সাজে। ওয়াফি আর আমি হেঁটে যাই এ পথের মায়ায়। টাকীর ঘাট তুমি গ্রাম বাংলার লুকানো সৌন্দর্য্য। ওই তো সামনে আবার দেখা যাচ্ছে ইছামতি নদী।

আহারে টাকীর ঘাট। ছবি: লেখক

ওপারে ভারত আর এপারে বাংলাদেশ। মাঝখানে ইছামতি। নদীর পার এসে মনটা যেন জুড়িয়ে গেল। মেঘাচ্ছন দিনে একটু পর পর ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির হানা খুব একটা মন্দ লাগছে না। সকাল থেকেই বেশ কয়েকবার ঝিরিঝিরি ছন্দে আকাশ বার বার শুনিয়েছে বৃষ্টির গান। বৃষ্টি আলাদ সুরতাল আছে তা ধরতে তান সেন হওয়া লাগে না। শুধু ডুবে যেতে হয় সেই বৃষ্টির গানে। আমি তো ডুবে ছিলাম সেই বৃষ্টির গানে। ইছামতির পারে বসে ওপার বাংলা দেখতে দেখতে মনে বিষাদ ছেয়ে গেল।

নদীর নাম ইছামতি, ওপারে ভারত এপারে বাংলাদেশ। ছবি: লেখক

সেই বিষাদের ছিটেফোটা ওয়াফির মধ্যেও ট্র্যান্সফার হল। সেও পাশে বসলো। আকাশে হাল্কা লালচে ছোয়া তারই মাঝে পেজা তুলার মত ভেসে যায় মেঘ। আকাশ বৃষ্টি মেঘের কবিতা শুনতে পুরো দিন পার করা যাবে। তবে চলে যাবার তাড়া অনুভব করলাম। ঘড়িতে প্রায় সাড়ে তিনটা বাজে। পেটে ইঁদুর সেনা দৌড়াচ্ছে। দুপুরের খাবার বিকালে খেতে হবে। তবুও এই পথের চলাতে গ্লানি নেই। ফিরে এলাম ভ্যান গাড়িতে আবার।

ফিরে যাই নীরে। ছবি: লেখক

আবার ভ্যান ছুটে চলছে শখিপুরের পথে। পিছে দেবহাটার মায়াকে পিছে ফেলে সামনের অজানা পথে চলছে ক্রিচক্রযান। আবার কি হবে দেখা দেবহাটা তোমার সাথে। সাতক্ষীরার ডায়েরির পাতায় পাতায় তো তোমার গল্পে ভরা। শখিপুর নেমে ভ্যান ছেড়ে দিলাম। এবার খাবার পর্ব সেরে আমুদি আরামে চোখটা মাত্র বুজেছি তখনই ঘড়ি জানান দিচ্ছে ৪:৩০ বেজে গেছে। এখনও সময় বাকি সন্ধ্যা হতে। দেবহাটা থেকে খুব কাছেই সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলা। আর সেই কালিগঞ্জ উপজেলায় আছে প্রতাপশালী এক সুবেদারের শেষ নির্দশণ। প্রবাজপুর মসজিদ আমরা আসছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top