সাতক্ষীরা ডায়েরি: রূপসী ম্যানগ্রোভ

ভ্যান চলছে আবার নতুন গন্তব্যে। এবারের গন্তব্য দেবহাটার উপজেলার নতুন আকর্ষণ রূপসী ম্যানগ্রোভ। বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলের পর্যটকদের জন্য বলতে হবে নতুন টুরিস্ট ডেস্টিনেশন। এই পিচ ঢালা পথ কে আমি ভালোবেসেছি। পথের মায়া ছড়িয়ে দু পাশে বৃক্ষ সেনা প্রহরির মত পথ দেখাচ্ছে। দেখতে দেখতে চলে এলাম রূপসী ম্যানগ্রোভ।

রূপসি ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রে ঢোকার পূর্বে একটি খাঁচা সদৃশ্য ঘর দেখলাম৷ উকি মেরে দেখতে পেলাম সেথায় ঘরে বেধেছে দুটি উট পাখি। নিজের শখে নিশ্চয়ই ঘরে বাঁধেনি৷ বিবেকহীন মানুষের কাজ৷ মানুষকে আনন্দ দিতে নিরীহ পশু পাখিকে বরণ করতে হয় বন্দী জীবন। আহারে মানুষ তোদের যদি এভাবে বন্দী রাখতে পারতাম তাহলে হয়তো এই অবলা প্রাণিদের কষ্ট বুঝতি। কে জানে এই বিশ্বের অন্য কোন গ্রহে বা সৌরজগতের বাহিরে হয়তো এমন কোন বিশ্ব আছে যেখানে মানুষ খাঁচায় বন্দী৷ টিকেট কেটে মানুষ দেখতে আসে সে গ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণি৷

সিংহ নেই এই বঙ্গে, এরপরও কুসঙ্গ দিতে সিংহ দুয়ার। ছবি: লেখক

টিকেট কেটে ঢুকেছি যেহেতু মেজাজ খিঁচড়ানোর অধিকার আলবাত আমার আছে৷ রূপসী ম্যানগ্রোভ প্রবেশের সিংহ দুয়ারের এক পাশে একটি সিংহ দেখা যাচ্ছে৷ সে দেখে মনে পড়ে গেল সাকিব খানের বিখ্যাত সেই বাণি সুন্দরবনে শুধু বাঘ নয়, সিংহ ও আছে৷ কনসেপ্টবিহীন পর্যটনের এক অদ্ভূত গণ্ডারের পিঠে চড়ে আগাচ্ছে আমাদের পর্যটন৷ এর শেষ কোথায়। পুরো বঙ্গদেশের কোথাও সিংহ কেন, সিংহের নানী ও নাই৷ কিন্তু আমাদের পর্যটনে বাঘ সিংহের এক সাথে জল খেতে হবে৷ ধিক পর্যটন, ধিক যার মাথার এ রকম বুদ্ধি এসেছে৷ যা হক বুদ্ধির ঢেকি মেপে আর লাভ কি। বরং রূপসী ম্যানগ্রোভের রূপ সুধা পান করতে দু কদম ভিতরে ফেলি৷

বনের মাঝে ভাল্লুক ওয়াফি। ছবি: লেখক

মেইন গেট থেকে ভিতরে পা ফেলে আমি যেন এক পসলা শান্তির আবেশ খুঁজে পেলাম। আহা কি সুন্দর। নেই কোন শব্দের দূষণ, পাখির কিচির মিচির ডাকে আনন্দময় ভুবন। বাঁশের ব্রিজ দিয়ে তৈরি বনের ট্রেইলে আমরা হাঁটছি৷ কে বলবে আমি কোন কৃত্রিম বনের ভিতরে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি৷ নাহ বন কখনও কৃত্রিম হতে পারে না। জেলা প্রশাসকের তত্ত্ববধায়নে ইতিমধ্যে দেবহাটার অন্যতম পর্যটক আকর্ষণে পরিণত হয়েছে রূপসী ম্যানগ্রোভ। সুন্দরবন থেকে আনা বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ এখানে রোপন করে গড়ে তোলা হয়েছে কৃত্রিম বন।

অবুঝের মত সবুজ। ছবি: লেখক

হেঁটে যাচ্ছি সবুজের মাঝে। ঢোকার মুখে একটি খালের মত দেখেছিলাম। কাঁচা সোনা রোদ আজ সবুজ ভেদ করে আমার পদযুগল স্পর্শ করে যেতে তার যেন আজ বড্ড অনীহা। এক মুঠো বিশুদ্ধ অক্সিজেন মুহূর্তের জন্য নাগরিক যন্ত্রনা ভুলিয়ে দেবার জন্য হয়তো যথেষ্ট। বনের ট্রেইলে হাটতে গিয়ে কখনও যদি বাদরের সাথে দেখা হয়ে যায় খুব একটা অবাক হব না। সুন্দরবনের আদলে তৈরি করতে সুন্দরবন থেকে বিভিন্ন জাতের ফলজ, বনজ ও ওষুধী গাছ এখানে এনে রোপন করা হয়েছে।

প্রাকৃতিক ফ্রেমে আমি। ছবি: ওয়াফি আহমেদ

আর এই কৃত্রিম ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট গড়ে উঠেছে ইছামতি নদীর পাড়ে। ঐ তো সামনে দেখা যাচ্ছে নদী। ভারত বাংলাদেশকে বিভাজনকারী ইছামতি নদীর কুল ঘেষে শিবনগর গ্রামে গড়ে উঠেছে এই এক মিনি সুন্দরবন। এই পর্যটন কেন্দ্রকে আকর্ষণীয় করতে বনের ট্রেইল, দীঘিতে প্যাডেল বোর্ড, পাকা বেঞ্চ, রেস্ট হাউজ, নদীর পাড়ে ছনের ছাউনি ঘরসহ কৃত্রিম পশু পাখির মূর্তি ও স্থাপন করা হয়েছে। তবে মূর্তিগুলো দেখলে মৃণাল হকের কথা মনে পড়ে যায়। রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে দেখলে মনে হবে ডোরাকাটা খেক শিয়াল। এই সব হাস্যকর কৃত্রিমতা না আনলে এই পর্যটন স্পটটি হয়তো আরও নান্দনিক ও নয়নাভিরাম হত।

ইছামতি পাড়ে হেঁটে আসে পথিক। ছবি: লেখক

হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত আমি ক্লান্ত ওয়াফি আহমেদ। নদীর ধারে বাশের কারুকার্যে গড়ে তোলা পাকা বেঞ্চে দুদণ্ড শান্তিতে বসলাম। ইছামতি নদী সে তো আমার রাঙামালিয়ার গ্রামের পাশ দিয়েও বয়ে যায়। দাদীর হাত ধরে কত যেতাম আষাঢ় শ্রাবন মাসে। আর কত বছর পর বসে আছি ইছামতির তীরে। প্রার্থক্য এখন আর দাদী বেঁচে নেই আর আমার রাঙামালিয়ার গায়ের ইছামতিও শুকিয়ে গেছে। তবে ইছামতি দেবহাটায় যেন যৌবনবতি এক নদী।

ওপারে বাংলা, এ পারে কেউ নেই। ছবি: লেখক

পিছে কেওড়া গাছ দেখতে পেলাম। আর সেই কেওড়া বনে শোনা যায় ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ। যেন আবহমান গ্রাম বাংলার কোন পরিবেশে ফিরে গেছি। ছবি পর্ব শেষ হলেও এই শান্তির জায়গা ছেড়ে যেতে নাহি চায় মন। হঠাৎ কোন হলুদিয়া পাখিকে দেখলাম কোন গাছের ডালে বসতে। ক্ষণে ক্ষণে করুণ সুরে ডাকছে সে। একটু পর আর একটা পাখি হাজির। আহা এভাবেই বুঝি প্রণয় নৃত্য হয় বনে জঙ্গলে। পাশে ভাল্লুক ওয়াফিকে দেখে দুঃখ হল। এই বনে এসেও বড় একা সাথে আমি নিজেও একা। একাকি মানুষের আসলে কোন ঘর নাই। সে দুঃখের কথা আর কি বলিবো।

সাদার ভিতর হারিয়ে যাই। ছবি: লেখক

ঘড়ির টিকটক শব্দে জানান দিচ্ছে বিদায় ঘণ্টা। আমাদের যেতে হবে দেবহাটার আর কয়েকটি স্থানে। ইছামতির তীর থেকে ওপার বাংলাটা আর একটু ভাল মত দেখে নিলাম। যেন আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে। কিন্তু উপায় কি আছে যাবার। কোথায় যেন এই নদীর মাঝেও এক অদৃশ্য কাটাতার ঢেউয়ের মত বয়ে যাচ্ছে। দেশভাগ আর বাঙালির বুকে কাটাতার এই নিয়েও তো ৭১ বছর কি ভাবে কেটে গেল। সামনেও হয়তো দিলগুলো কেটে যাবে তবুও এ ক্ষত ভরাট হবে না।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্পগুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top