fbpx

সাতক্ষীরা ডায়েরি: বনবিবির কাব্যকথা

গার্ডিয়ান স্পিরিট যেন মিশে ছিল বনের প্রতিটি ডালপালা থেকে লতাপাতায়। তখন সুন্দরবন অঞ্চলে বন বিবির সাথে পূজা হত দেবী মনসার। বন বিবি পরিণত হয়েছিল আরবান লিজেন্ডে। অরণ্যের দেবীর পূজায় একটু হলেও কি হিংসে হত দেবী মনসার। বনের মাতা কখনও আসতো বাঘের রূপ কখনও বা বন মোরগের রূপে। তিনি সুন্দরবনের জেলে, বাউয়ালি, কাঠুরে, মৌয়ালদের রক্ষাকত্রী। বাঘ, ভূত সব অপশক্তির উপর কর্তৃত্ব ছিল তার। তাই তো গভীর বনে কাঠ, গোলপাতা, মধু ও মোম সংগ্রহ বা মাছ ধরতে যাবার সময় বনজীবিরা অরণ্যের দেবীর উদ্দেশ্যে ক্ষীর, অন্ন ভেট দিত।

দাঁড়াও পথিক। ছবি: লেখক

ডুবে ছিলাম বন বিবির রাজ্যে। আবার না হয় একটু ঘুরি আসি বনবিবির জহুরনামা পুঁথির রাজ্যে। বনবিবির গল্পটি জহুরনামায় বিভিন্ন আঙ্গিকে এসেছে। অন্য একটি গল্পে বলা হয় ফুলবিবির অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে ঈব্রাহীম ও গুলানবিবি সুদূর মক্কা থেকে পারি দিয়ে আসেন বঙ্গদেশের সুন্দরবনে। আর সেখানেই জন্ম দেন তারা বনবিবি ও শাহাজঙ্গুলী দুই সন্তানের। এই দুই ভাই বোনের পদতলে এক সময় মুখরিত হয় সুন্দরবন।

শুনো বনবিবির কাব্য কথা। ছবি: লেখক

আবার কিংবদন্তি শোনা যায় মসজিদে খেলতে গিয়ে বনবিবি ও শাহাজঙ্গুলি সন্ধান পায় জাদুর টুপির। আর এই জাদুর টুপিতে চেপে তারা চলে আসে জল থই থই এই ভাটির দেশে। আবার অন্য একটি গল্পে শোনা যায় জিবরাঈল ফেরেশতা আঠারোটি দেশে ঘুরিয়ে এই সুন্দরবনে নিয়ে আসে। এখানে এসে আযান দেয় শাহাজঙ্গুলি। তখন সুন্দরবন অঞ্চলের রাজা ছিল দক্ষিণ রায়। সেই আযানের ধ্বনি পৌঁছে যায় তার কানে। কে আযান দিচ্ছে খোঁজ খবর জানতে তার বিশ্বস্ত বন্ধু সনাতন রায়কে পাঠান।

বাতাসে বনবিবি ফিসফাস। ছবি: লেখক

সনাতন এসে খবর জানায় দুই ভাই বোনের দক্ষিণ রায়ের কাছে। রাজ্য থেকে উৎখাত করতে নিজ হস্তে দ্বায়িত্ব তুলে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে যেতে চাইলেন তার মা নারায়ণী। তাকে রাজ্য সামলাতে বলে বনবিবিকে উৎখাত করতে নিজের সৈন্য সামন্ত নিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করে নারায়ণী। তবে তারা ভুলে গিয়েছিল অরণ্যের দেবীর অলৌকুক ক্ষমতার কথা। দীর্ঘ যুদ্ধের পর হার মানতে বাধ্য হল দক্ষিণ রায়ের মা।

বসিবেন কি ধ্যানে বনবিবি। ছবি: লেখক

তবে সাম্রাজ্যের প্রতি অরণ্যের দেবীর ছিল না লোভ লালসা। অর্ধেক সাম্রাজ্য দক্ষিণ রায় ও তার মাকে দান করেন বনবিবি। নারায়ণীর সাথে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে তার। দক্ষিন রায়কে জঙ্গলের গহীন কোণে রাজ্য শাসন ভার তুলে গার্ডিয়ান স্পিরিট পুরো সুন্দরবনের শাসন ভার তুলে নিলেন নিজের কাধে।

কাব্য পুঁথি ও গল্পে রাজা দক্ষিণ রায়ের সাথে বনবিবির যুদ্ধ এবং দুখের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রবাহবান গ্রাম বাংলার জনপ্রিয় একটি গল্প। সেই গল্পে অনুসারে, বাজিরহাটি গ্রামে সে সময় বাস করতো ধোনা ও মোনা নামক দুই ভাই। পেশায় ছিল তারা মৌয়াল। সুন্দরবনের গহীনে মধু সংগ্রহ করাই ছিল তাদের কাজ। ধোনা একবার পরিকল্পনা করে সাতটি নৌকা নিয়ে অরণ্যের গহীনে যাবে মধু সংগ্রহ করতে। তার ভাই মোনা এই প্রস্তাবে রাজি না হলে একাই যাবার মন স্থির করে ধোনা। তার সাথে সঙ্গী হয় গরীব রাখাল বালক দুখে।

সাপুড়ে সবুজ। ছবি: লেখক

অরণ্যের দুর্গম ও বিপদসংকুল পথে পা বাড়ানোর আগে দুখের মা তাকে বলে, ‘বনে আমার মতো তোর আরেক মায়ের সন্ধান পাবি, বিপদ পড়লে তাকে স্মরণ করবি।’ যাত্রা শুরু করে নৌকা বহর এক সময় কেন্দোখালি চরে ভিড়ায়। আর সে সময় ঐ অঞ্চলের রাজা ছিল দক্ষিণ রায়। মনের ভুলে দক্ষিণ রায়কে ভেট দিতে ভুলে যায় ধোনা। রাজ্যের নিয়ম আনুসারে পরবর্তী তিনদিন মধু ও মোম সংগ্রহ থেকে বিরত রাখা তাদের। তৃতীয় দিন রাতে ধোনার স্বপ্নে স্বয়ং উপস্থিত হলেন দক্ষিণ রায়। এবার ভুলের মাসুল হিসাবে নরবলি আদেশ আসে।

বেশ তর্ক বিতর্কের পর শেষ পর্যায়ে দুখের প্রাণের উৎসর্গে দক্ষিণ রায়ের কাছ থেকে মধু ও মোম নেবার অনুমতি আদায় করে নেয়। পরের দিন মধু ও মোম সংগ্রহ করে দুখেকে এই গহীন অরণ্যে একা ফেলে নিজ গ্রামের পথের দিকে নৌকা বহর নিয়ে রওনা দেয় লোভী ধোনা। রাজা দক্ষিণ রায় বাঘ রূপে আসে নিজের শিকারের খোঁজে। যখন দক্ষিণ রায় দুখেকে মেরে ফেলতে থাবা বাড়িয়ে দেয়, তখনই দুখের মনে পড়ে যায় তার মায়ের কথা। মনে মনে সে অরণ্যের দেবী বনবিবির কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে।

যেন ভক্তের অপেক্ষা বসে ছিল বনবিবি। ছবি: লেখক

ভক্তের ডাক শুনে কোন অরণ্যের দেবী কি বসে থাকতে পারে। ভাই শাহাজঙ্গুলি কে ছুটে আসে বনবিবি। সম্মুখ যুদ্ধে বাঘের রূপে থাকা দক্ষিণ রায়কে পরাজিত করে শাহাজঙ্গুলি। হেরে গিয়ে বড় খান গাজীর কাছে অশ্রয় নেয় দক্ষিণ রায়। গাজী কালু চম্পাবতীর মিথ সে তো সবার কাছে সমাদৃত। সেই গাজী পীর বনবিবির কাছ প্রতিশ্রুতি আদায় করে তারা দক্ষিণ রায়ের কিছু করবে না। বিনিময়ে গাজী দুখেকে সাত নৌকা ভর্তি মূল্যবাদ ধন রত্ম উপহার দিবে।

বনবিবির পোষা কুমির সেকোর পিঠে চড়ে দুখে ফিরে তার গ্রামে। গ্রামে এসে শুনায় অরণ্যের মায়ের গল্প। তার গল্পে অভিভূত হয়ে সে গ্রাম থেকে শুরু করে আশেপাশের গ্রামগুলোতেও শুরু হয় বনবিবির উপাসনা। লোভী মৌয়াল ধোনা তার ভুল বুঝতে পারে। তার মেয়ে চম্পার সাথে দুখের বিয়ে দেন। এরপর দুখে গ্রামের প্রধান হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অতঃপর তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকে। সেই থেকে আজ অদ্যাবধি অরণ্যের দেবীর পূজা সুন্দরবনের মানুষের জীবনের একটি অংশ হয়ে যায়।

বিদায় বনবিবি। ছবি: লেখক

বনবিবির জগৎতে এতটা ডুবে ছিলাম সময়ের স্রোতের খেয়াল ছিল না। সময়ের স্রোতে বর্তমানে বনবিবির বটতলার মালিকানা পেয়েছে হাজারী তপন কুমার দে নামক এক ব্যক্তি। বাংলাদেশ ভারত যৌথ পরিচালনায় নির্মিত চলচ্চিত্র শঙ্খচিলের শ্যুটিংয়ের কিছু অংশ হয় বনবিবির বটগাছতলায়। এই বট গাছের সৌন্দর্য্যে মনমুগ্ধ দর্শনার্থি লিখে রেখে গেছে কোন স্মৃতিচিহ্ন নাম। গাছের গায়ে দাগ কেটে কেটে নাম লিখা বড় কুৎসিত ট্রেন্ড। প্রতিবছর জানুয়ারি মাসে পশুর নদীর পশ্চিম পাড়েই কেবল তিন শতাধিক স্থানে বনবিবির পূজা হয়। পুরা সুন্দরবন অঞ্চলে স্থায়ী অস্থায়ী মিলিয়ে বনবিবির মোট মন্দিরের সংখ্যা প্রায় দুই হাজারের কাছাকাছি। এসব মন্দিরে বন বিবির সাথে শাহ জাঙ্গুলী, গাজী আউলিয়া, শিশু দুখে, তার দুই চাচা ধনে ও মনে, বাঘ রূপী দক্ষিণ রায়, কালু, ভাঙ্গড় ও মানিক পীর প্রমুখের প্রতিমাও পূজিত হয়।

দেখতে দেখতে সময় হয়ে এল নতুন গন্তব্যের দিকে পা বাড়ানোর। বনবিবির দরবারে শুধু যে তারই একচ্ছত্র আধিপত্য। বনবিবির বটতলা কে বিদায় দেবার সময় হয়ে গেল। বিদায় অরণ্যের দেবী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top