fbpx

সাতক্ষীরা ডায়েরি: গ্রামের নাম প্রবাজপুর

শখিপুর মোড় থেকে কালীগঞ্জের বাসে উঠলাম। বেশ দ্রুত বেগেই চলছে বাস। পিছে কত পথ, কত মানুষ ছাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে পথিক অজানাকে জানার উদ্দেশ্যে। পথই তো দেয় পথের সন্ধান। পরিব্রাজক, যাযাবর এই পৃথিবীর বুকে এসেছিল বিধায় কিছু মানুষকে চোখ আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে যেতে পেরেছে দেখ পৃথিবী কত সুন্দর। যুগে যুগে এই পথে হেঁটে গেছে কত সুফি সাধক কত পীর আউলিয়া। দক্ষিণ বঙ্গ সত্যি এক জাদুর জনপথ।

দেখতে দেখতে চলে এলাম সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলায়। পথের ক্লান্তিতে হালকা আড়মোরা ভেঙ্গে প্রবাজপুর মসজিদের খোঁজে নেমে পড়লাম। স্থানীয় যে কজনকে জিজ্ঞেস করলাম কেউ উত্তর দিতে পারে না কোথায় এই মসজিদ। হতাশার বাতাসা খেতে খেতে হাল ছেড়ে দিব ভাবছিলাম। তখনই মনে পড়লো প্রযুক্তির যুগে বোকার মত জিজ্ঞেস করছি কেন, নেট থেকে ছবি দেখালেই তো হয়। যে ভাবা সেই কাজ। এবার প্রবাজপুর মসজিদের ছবি গুগলের সাহায্যে বের করে দেখলাম এক ভ্যানয়ালা মামাকে। তিনি দেখেই চিনে ফেললেন। এই মসজিদটি পড়েছে প্রবাজপুর গ্রামে। গ্রামের নাম চিনলেও মসজিদের নাম চিনলো না বড় অদ্ভূত ব্যাপার।  উঠে বসলাম আবার ত্রিচক্রযানে।

প্রবাজপুরের পথে। ছবি: লেখক

প্রবাজপুর শাহী জামে মসজিদ বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে অবস্থিত সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার একটি প্রাচীন মসজিদ। মসজিদটি ১১০৪ হিজরির ১৯ রমজান ইংরেজিতে ২৪মে ১৬৯৩ সালে নির্মিত হয়। তখন দিল্লির সালতানাতের আসনে জাকিয়া বসেছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেব। তারই সময় বাংলার এ অঞ্চলের ফৌজদার নবাব নুরুল্লাহ খাঁ মসজিদের জন্য প্রায় ৫০ বিঘা জমি দান করে। এই জমির উপরই নির্মাণ হয় প্রবাজপুর শাহী জামে মসজিদ। কিংবদন্তি বলে জ্বীনেরা এই মসজিদের আশেপাশে জঙ্গল কেটে পরিস্কার করে ধুম করে নির্মাণ করে ফেলে মসজিদ। তাই এই মসজিদে মানত করে কেউ বিফলে যায় না। তাই এই মসজিদটি স্থানীয়দের কাছে জ্বীনের মসজিদের নামেও পরিচিত।

প্রবাজপুর মসজিদ। ছবি: লেখক

দেখতে দেখতে আমাদের ভ্যান মহাসড়কে ছেড়ে বায়ে একটা গ্রামের রাস্তায় প্রবেশ করলো। আবার সেই ফাঁকে ফাঁকে নারিকেল, খেজুর গাছের উকিঝুকি। উপকূলের খুব কাছে থাকায় সাতক্ষীরায় অনেক বেশি নারিকেল গাছ দেখছি। একটু পড়ে গ্রামের পিচ ঢালা রাস্তা আরও সরু হয়ে গেল। এ কোন পথে এলাম আমি। বৃক্ষ সেনা নুয়ে পড়েছে বয়সের ভারে। কত শত বৎসরী বৃক্ষ রাস্তার দু ধারে। সূর্যের সাথে তারা যেন আজ বিদ্রোহ করেছে। দিনের আলো এখনও বাকি আছে তবে রাস্তা যেন অন্ধকারচ্ছন্ন হয়ে পড়লো। জ্বীনের মসজিদের যাবার পথ বুঝি এমনই হয়। মাঝে মাঝে ভুইফোড়ের মত হাজির হচ্ছে কোন আরোহী সাইকেল নিয়ে। করিমন করে ছুটে যাচ্ছে গায়ের বধু, সাথে তার সখীকুল বিদেশী দেখে খিল খিল করে হাসছে। আমরা তো এ অঞ্চলে বিদেশীই বটে। বেশভূষায় বড় শহরের গন্ধ। চারপাশের চোখ জুড়ানো দৃশ্য কড়া নারে প্রকৃতির সন্তানের হৃদয়ের গভীরে।

ফুলের নকশা। ছবি: লেখক

আমরা না হয় খানিকক্ষণের জন্য ডুব দেই মসজিদের ইতিহাসের গভীরে।  ২৪ মে ১৬৯৩ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেব কালীগঞ্জ অঞ্চলে তার রক্ষিত মুসলিম সৈন্যদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার জন্য একটি মসজিদ নির্মাণের ফরমান জারি করেন। তৎকালীন সুবেদার প্রবাজ খাঁকে তাঁর ফরমান অনুযায়ি এই এলাকায় একটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ নির্মাণ করেন। যে গ্রামে তার সৈন্যরা থাকতো সে গ্রামের নাম সুবেদার প্রবাজ খাঁর নামে অনুসারে করা হয়েছিল প্রবাজপুর। পরবর্তীতে মসজিদ নির্মাণের পর মসজিদের নামও হয়ে যায় প্রবাজপুর শাহী জামে মসজিদ।

মসজিদের দুয়ার। ছবি: লেখক

তবে ইতিহাসের গতিপথ কি ভাবে উলটে যায়, কত মত বিমতের সৃষ্টি হয় সে তো আমাদের অজানা নয়। ইতিহাস হচ্ছে স্রোতস্বিনী নদীর মত, তার চলার পথে সৃষ্টি করে নতুন ইতিহাস। আর একটি মত অনুযায়ি জানা যায় যে, দিল্লী সুলতানদের স্বর্ণালি যুগের শুরু থেকেই সাতক্ষীরায় পদধুলি পড়েছে অনেক সুফি দরবেশ, পীর ওলি আল্লাহর। সাতক্ষীরায় মুসলিমদের আগমনে ইসলামের প্রচার ও প্রসার বেশ দ্রুত হয়। তারা এ অঞ্চলে নবদিক্ষীত মুসলিমদের জন্য মসজিদ নির্মাণের তাগিদ অনুভব করেন।

নান্দনিক নকশা। ছবি: লেখক

এরপর কত ঘাটের জল খেয়ে দিল্লি সালতানাত মোঘলদের দখলে গেল। আর এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয় মোঘল আমলে। প্রবাজ খাঁ ছিলেন সম্রাট আকবরের সেনাপতি। তিনি দক্ষিণ বাংলায় বার ভূইয়াদের দমনের জন্য আসেন এবং এখানে সেনানিবাস গড়ে তোলেন। তিনি ছিলেন একাধারে তুখোড় সেনাপতি এবং ধর্মপ্রাণ মুসলিম। সৈন্যদের দ্বীনি কাজ ও নামাজ পড়ার জন্য এই কালীগঞ্জ অঞ্চলে গড়ে তোলেন এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ। তাঁর নাম অনুসারে মসজিদের নাম হয় প্রবাজপুর শাহী জামে মসজিদ, আর গ্রামের নাম রাখা হয় প্রবাজপুর।

মসজিদের সাথে লেখক

ইতিহাসের খেরোখাতা তো ফুরানোর নয় তবে আমাদের পথ যে ফুরিয়ে গেছে। এসে পড়লাম প্রবাজপুর মসজিদের সামনে। মসজিদের সামনের ব্যালকনি বা মেঝে টাইলস করা। টাইলসে জমেছে বৃষ্টির পানি। প্রকৃতির এই দিনে প্রবাজপুর শাহী জামে মসজিদ যেন অন্য রূপে আমাদের সামনে ধরা দিল। এক গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটির সামনে আরও তিনটি ছোট ছোট গম্বুজ। স্থাপত্য রীতি সেই সুলতানি আমলের নির্দশনের সাথে হুবহু মিলে যায়। অথচ নির্মাণ হয়েছে মোঘল আমলে তাই এরা নির্মাণ ইতিহাস নিয়ে কিঞ্চিত সন্দেহ হলেও ইতিহাস যাচাই করার সোর্স আমাদের কাছে নেই।

দিন শেষে চল ফিরে আসি নিরে। ছবি: লেখক

প্রবাজপুর মসজিদটির সাথে টাঙ্গাইলের আতিয়া মসজিদর এক জায়গায় সামান্য মিল আছে সেইটি হল এক গম্বুজের সাথে সামনে তিনটি ছোট ছোট গম্বুজ। তবে গম্বুজের স্থাপত্যরীতি মোঘলদের স্থাপত্যের সাথে মিলে না। দৃষ্টিনন্দন এ মসজিদের বাহিরের দৈর্ঘ্য ৫২ ফুট ৫ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ৩৯ ফুট ৮ ইঞ্চি। অভ্যন্তরে ২১ ফুট ৬ ইঞ্চি বর্গাকৃতির একটি নামাজের জায়গা রয়েছে। মসজিদটিতে গুণে গুণে ১০টি দরজার অস্তিত্ব পেলেও বর্তমানে দরজার নিচের অংশে নতুন ইটের প্রাচীর দিয়ে খিলান করে ফেলা হয়েছে। সামনের দুয়ারই তাই প্রধান দরজা। এছাড়াও তিনটি আলংকৃত মিহরাব দেখা যাচ্ছে মসজিদটিতে।

দেখতে দেখতে ধরণির বুকে শেষ আলোটুকু শেষ হবার পথে। দক্ষিণের সেই যাত্রাটি শুরু হয়েছিল লালদিয়া বনের সেই সবুজের স্বর্গ দ্বারা আর শেষ হল মসজিদের পবিত্রতার সিগ্ধতায়। সাতক্ষীরার ডায়েরির পাতা কি সহজে পূর্ণ হবার মত। রেখে দিলাম না হয় কিছু গল্প ভবিষৎতের জন্য। এবার তিন দিনের সফর শেষে ঘরে ফেরার আহবান নিয়ে যেন আসলো বিষণ্ন এই সন্ধ্যা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top