fbpx

দূর-দ্বীপবাসিনী: সন্দ্বীপ

আয়তনে ছোট হলেও পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ হিসেবে খ্যাত আমাদের এই বাংলাদেশ। ছোট্ট এই দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আছে ছোট বড় নানারকম দ্বীপের সমাহার। ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্যে দ্বীপগুলো শীতের সময় অন্যরকম আবেদন নিয়ে আসে। দ্বীপে ক্যাম্পিং করে থাকা, ক্যাম্পফায়ার, নিজেরা রান্না করে খাওয়া, এসব কিছুর আকর্ষণ এড়ানো দায়। আর দ্বীপের মানুষজন, তাদের জীবনাচরণ থেকেও অনেক কিছু শেখার থাকে। 

এরকমই কিছু দ্বীপ হচ্ছে আমাদের ভোলা জেলায় মনপুরা, চট্টগ্রাম জেলায় সন্দ্বীপ, নোয়াখালী জেলায় নিঝুমদ্বীপ, কক্সবাজার জেলায় দেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী। কক্সবাজারে আরো আছে প্রবাল দ্বীপ বা নারিকেল জিঞ্জিরা নামে ব্যাপক পরিচিত সেন্ট মার্টিন্‌স। এছাড়াও আছে শাহপরীর দ্বীপ, কুতুবদিয়া এবং সোনাদিয়া। প্রতি বছর শীতেই দ্বীপে ঘুরে বেড়ানোর প্ল্যান থাকে। প্রায় সবগুলো দ্বীপেই যাওয়া হয়েছে। খুব কাছে থেকে দেখা হয়েছে দ্বীপের জীবনযাত্রা। একেক দ্বীপের আবার একেক বৈশিষ্ট্য! এবারের আয়োজন এই দ্বীপগুলো নিয়েই।

গুপ্তছড়া ঘাটে। ছবি: লেখক

নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে প্ল্যান করা হলো। আমাদের গন্তব্য সন্দ্বীপ। সন্দ্বীপ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত একটি অত্যন্ত প্রাচীন দ্বীপ। ইতিহাস বলে, সন্দ্বীপে নাকি প্রায় তিন হাজার বছরের বেশি সময় ধরে লোকবসতি বিদ্যমান। সন্দ্বীপের নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন মতামত শোনা যায়। কারো মতে, বার আউলিয়ারা চট্টগ্রাম যাত্রার সময় এই দ্বীপটি জনমানুষহীন অবস্থায় আবিষ্কার করেন এবং নামকরণ করেন ‘শুণ্যদ্বীপ’, যা পরবর্তীতে ‘সন্দ্বীপে’ রূপ নেয়। দ্বীপের নামকরণের আরেকটি মত হচ্ছে, পাশ্চাত্য ইউরোপীয় জাতিগণ বাংলাদেশে আগমনের সময় দূর থেকে দেখে এই দ্বীপকে বালির স্তুপ বা তাদের ভাষায় ‘স্যান্ড-হিপ’ (Sand-Heap) নামে অভিহিত করেন এবং তা থেকে বর্তমান ‘সন্দ্বীপ’ নামের উৎপত্তি হয়। 

অনেকদিন পর এইবার সকালে রওনা হচ্ছি। চট্টগ্রামের বাসে উঠলাম। যদিও চট্টগ্রাম পর্যন্ত যেতে হলো না। সীতাকুণ্ডের বড় কুমিরায় নেমে গেলাম। তারপর অটো ঠিক করে চলে গেলাম কুমিরা ঘাটে। কুমিরা ব্রিজের ছবিটা প্রায়ই দেখতাম। কিছুক্ষণ ব্রিজে হাঁটাহাঁটি করে  মুশতাক চলে গেল স্পিডবোটের টিকেট করতে। হ্যাঁ, সন্দ্বীপে যাওয়ার জন্যে কুমিরা ঘাট থেকে স্পিডবোট বা ট্রলার আছে। স্পিডবোটে জনপ্রতি ভাড়া ২৫০ টাকা। নামতে হবে সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাটে। 

কুমিরা ব্রিজ। ছবি: লেখক
কুমিরা ঘাট থেকে স্পিডবোটে ওঠা। ছবি: লেখক

বোটের সেইরকম লম্বা লাইন। আমরা সিরিয়াল ঠিক রেখে লাইন ধরেই স্পিডবোটে উঠলাম। বোট চলা শুরু করলো। ভালোই লাগছিল। ঢেউয়ের সাথে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলো স্পিডবোট। তেহজীব পুরোটা সময় দাঁড়িয়ে ছিল। খুব মজা পেয়েছে। জীবনের প্রথম স্পিডবোট জার্নি। আমি ভেবেছিলাম ভয় পাবে। 

একসময় শেষ হলো পানিপথ। মোটামুটি আধা ঘণ্টা সময় লাগে গুপ্তছড়া ঘাটে পৌঁছাতে। বোট থেকে নেমে একটা রিকশা নিয়ে সিএনজি স্ট্যান্ডে গেলাম। যারা ক্যাম্পিং করতে চান, সিএনজি নিয়ে চলে যাবেন রহমতপুর, সন্দ্বীপের পশ্চিম পাড়ে। আমরা যেহেতু তিনজন ছিলাম, ক্যাম্পিংয়ের প্রশ্ন আসে না। আমরা চলে গেলাম টাউন কমপ্লেক্সে। সেখানে কয়েকটা ভালো মানের হোটেল আছে। আমরা উঠলাম হোটেল রয়েলে। আমার ধারণা ছিল, সন্দ্বীপে খুব একটা ভালো কিছু পাওয়া যাবে না। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়েছে রয়েল হোটেলের রুম এবং সার্ভিস। সত্যিই ভালো ছিল। হোটেলের মোটামুটি সার্বিক দায়িত্বে থাকা রবি ভাই আমাদের অনেক পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। কোথায় ঘুরতে যাবো, কিভাবে যাবো, কি খাবো, এরকম অনেক কিছু। 

রয়েল হোটেলের ছাদে। ছবি: লেখক

দুপুরে উঠেছিলাম হোটেলে। ফ্রেশ হয়ে তাই খাওয়ার পালা। টাউন কমপ্লেক্সের ‘ভাই ভাই হোটেল’ ভালো, বলেছিলেন রবি ভাই। সেখানেই গেলাম খেতে। মেন্যুতে আজব সব খাবারের দেখা পেলাম। মুশতাক খেলো ভেড়ার মাংস আর আমি খেলাম রিকশা মাছ। মাছের নাম শুনে তেহজীব আমাকে বলে, ‘মা, মাছটা কি রিকশা চালাতো?’ খাবারের স্বাদ ভালো। কোথাও ঘুরতে গেলে খাবার ভালো না হলে সমস্যাই বটে। সন্দ্বীপ এদিক থেকে সুবিধাজনক। 

বিকেলের দিকে আমরা বের হলাম। এখানে বলে রাখি, সন্দ্বীপে কোথাও যেতে-আসতে যাতায়াত ভাড়া অনেক বেশি। ভালোমতো দরদাম করে নিতে হবে। আমরা দ্বীপের পশ্চিম পাড়ে গেলাম। বিকালের মিষ্টি রোদটা বেশ লাগছিল! প্রচুর নারকেল আর তাল গাছ এখানে সেখানে। বাচ্চারা খেলছে, সাইকেল চালাচ্ছে। তেহজীব এক ছেলেকে দেখে অবাক! সে দুই হাত ছেড়ে সাইকেল চালাচ্ছে। শহরের ইটকাঠের শৃঙ্খলে  বড় হওয়া মেয়ে। খোলা জায়গা পেলে পাগল হয়ে যায়। ছুটে বেড়াচ্ছিল সে। আর আমি দেখছিলাম কুসুমিত সূর্যটা কেমন করে মেঘের আড়ালে ডুবে যাচ্ছে। তার ছড়িয়ে দেয়া সোনা আলোয় বাড়িঘরগুলো আলোকিত হয়ে গিয়েছে। খুব ইচ্ছা করছিল, কোন একটা বাড়িতে যেয়ে বলি, আমাকে একটু এখানে থাকতে দিবেন? 

দ্বীপের পশ্চিম পাড়ে এমনই দৃশ্য চোখে পড়বে। ছবি: লেখক
দ্বীপে সাইক্লিং করে বাচ্চারা। ছবি: লেখক

সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় ফিরতে হবে হোটেলে। তেহজীব আমার হাত ধরে বললো, ‘মা, ওদের কতো মজা। আমাদের কোন মজা নাই!’ নরম বিছানায় ঘুমিয়ে বড় হওয়া বাচ্চাটাও বুঝে গেল মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়ার আনন্দ। আসলে প্রকৃতির কাছাকাছি গেলেই কেবল এই বোধ আসা সম্ভব। 

আমরা বাজারে যেয়ে ডাব খেলাম। সন্দ্বীপেও দেখলাম ডাবের দাম বেশি৷ মুশতাক এরপর ওর ব্যাংকের সন্দ্বীপ ব্রাঞ্চে নিয়ে গেল আমাদের। সেখানে সবার সাথে দেখা সাক্ষাৎ করে, সন্দ্বীপের গরম গরম রসগোল্লা খেয়ে হোটেলে ফিরলাম৷ তারপর কিছুক্ষণ বুড়ির সাথে খুনসুটি করে, বিশ্রাম নিয়ে কেটে গেল। এদিকে রাতের খাবারের সময় হয়ে গিয়েছে। আবারও সেই ভাই ভাই হোটেলে। গ্লাস ভরা দই আর বাটি ভরা পায়েস দিয়ে খাওয়া শেষ করলাম। ঢাকার বাইরে গেলে আমরা খুব খাই। এতো মজার সবকিছু! মুখে লেগে থাকে।

বাইরে বের হতেই দেখি, এক বুড়ো ভদ্রলোক ছোট-বড় আকৃতির দইয়ের হাঁড়ি নিয়ে বসে আছেন। কলাপাতা দিয়ে হাঁড়িগুলোর মুখ বেঁধে রাখা। জিজ্ঞেস করে জানা গেল, এগুলো মহিষের দই। আমরা ছোট এক হাঁড়ি কিনে রুমে ফিরলাম। রবি ভাই বললেন, এই দই চিনি আর লবণ মিশিয়ে খেতে হয়। অনেক টক। তারপর উনি নিজেই গ্লাসে দই ঢেলে, চিনি মিশিয়ে, লবণ ছিটিয়ে, চামচ দিয়ে ঘুটে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, খেয়ে দেখেন কেমন! সত্যি বলতে জিনিসটা খেতে ভালো হয়েছিল। তবে পরদিন সকালে চিনি-লবণ ছাড়া এমনিই খেয়েছিলাম। সেটা আরো বেশি ভালো লেগেছিল। এতো টক না কিন্তু! 

মহিষের দুধের দই। ছবি: মুশতাক হোসেন

সকালে আমরা আবার বের হলাম। টাউন কমপ্লেক্সের আশেপাশে একটু ঘুরে দেখলাম। উপজেলা পরিষদ অফিসের ভেতর বেশ সুন্দর একটা মসজিদ আছে। এখানেই দ্বীপের আদালত ভবনেরও অবস্থান। মুশতাক গেল রিকশা নিতে। আজকে আমরা যাবো দ্বীপের দক্ষিণে। জায়গার নাম শিবেরহাট। বিনয় সাহার বিখ্যাত মিষ্টি খেতে। রিকশায় যাবো কারণ, তেহজীবের পছন্দ এই ছড়ানো অটো রিকশাগুলো। জায়গাটা বেশ দূরেই আছে। গ্রামের মেঠো পথ, বাঁশঝাড়, উঁচুনিচু রাস্তা পেরিয়ে রিকশা আমাদের জায়গামতো পৌঁছে দিল। ছোট দোকানটার পাশেই বড় পরিসরে হোটেলের কাজ চলছে। আমরা দোকানেই বসলাম। গরম গরম সিরায় ডোবানো মিষ্টি চলে আসলো। আসলেই ভালো মিষ্টিটা। পাঁচশো টাকা ভাড়া দিয়ে দেড়শো টাকার মিষ্টি খেয়ে এলাম। But it was worth it! 

টাউন কমপ্লেক্স জামে মসজিদ। ছবি: লেখক
বিনয় সাহার মিষ্টি। ছবি: লেখক

আমাদের ফেরার পালা। এই বেলা স্পিডবোটের লাইনে দাঁড়াতে হলো না। টিকেট করেই উঠে বসলাম। সাগর আজকে কিছুটা উত্তাল। ঢেউয়ের নাচন বুকে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল! তবে শেষ পর্যন্ত ভালোভাবেই কুমিরা ঘাটে পৌঁছে গেলাম। বুড়ি বারবার বলছিল, আমি আরো কয়েকদিন এখানে থাকবো। আর আমি ভাবছিলাম, শেষ বয়সে আমি এখানেই থাকবো! 

সন্দ্বীপ ট্যুরের ইউটিউব লিংক:
https://youtu.be/aWyOiLQK2hw

আমার অন্যান্য ভ্রমণকাহিনী পড়তে ক্লিক করতে পারেন এই লিংকে: https://www.vromonguru.com/author/azmi/

বিঃদ্রঃ নিজের দেশ পরিচ্ছন্ন রাখুন। ময়লা যথাস্থানে ফেলুন।

ফিচার ছবি: লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top