নারিকেল জিঞ্জিরায় জ্যোৎস্না রাত্রি -দ্বিতীয় পর্ব

রাতের খাবার শেষ হতেই দেখলাম জোয়ারের পানি আস্তে আস্তে নেমে যাচ্ছে আর পূর্নিমার আলোয় দৃশ্যমান হচ্ছে বালুকাবেলা, সেখানে কোথাও কোথাও চিকচিক করছে প্রবাল। চাঁদ মামা প্রকাণ্ড একটা আকার নিয়ে চলে এসেছে ঠিক মাথার উপরে, চাঁদের আলোয় ঝলসে যাচ্ছে চারপাশ। ঠিক এরকম রাতে রিসোর্টে বসে থেকে কে সময় অপচয় করতে চায়?

ড্রিম নাইট রিরিসোর্ট, যেখানে সমুদ্র এসে গড়াগড়ি খায়। ছবি: লেখক

বিচে নেমে আসলাম আমরা কয়েকজন, আজকের রাত চাঁদ মামার সাথে বন্ধুত্বের আর সমুদ্রের উদাসী হাওয়ায় ভেসে যাওয়ার।বিচ ধরে হেঁটে এগিয়ে গেলাম অনেকটা, এর মাঝে গায়ে শিহরণ জাগাচ্ছে বসন্তের মৃদুমন্দ হাওয়া।

সেইন্ট মার্টিনের নিরিবিলি সৈকত। ছবি: লেখক

মনে ভেসে উঠে তখন চাঁদ নিয়ে গাথা পংক্তিমালা…

চাঁদিনি রাতে কোদালে মেঘের মউজ উঠেছে গগনের নীল গাঙে, হাবুডুবু খায় তারা-বুদ্‌বুদ, জোছনা সোনায় রাঙে।

তৃতীয়া চাঁদের ‘সাম্পানে’ চড়ি চলিছে আকাশ-প্রিয়া, আকাশ-দরিয়া উতলা হল গো পুতলায় বুকে নিয়া। নীলিম-প্রিয়ার নীলা গুল-রুখ নাজুক নেকাবে ঢাকা দেখা যায় ওই নতুন চাঁদের কালোতে আবছা।

-কাজী নজরুল ইসলাম

কেউবা গলা ছেড়ে গেয়ে উঠছে প্রিয় গান, সাথে বাকীদের হা হা হি হি অথবা বেসুরো গলায় সুর মেলানো এভাবেই কেটে গেলো অনেক সময়।

জোয়ারের উপচে পড়ছে জল। ছবি: লেখক

কটা বাজে? এই প্রশ্ন জাগতেই মনে পড়লো আমরা কেউ মুঠোফোন সাথে নিয়ে আসিনি, আজকের এই রাতটি অন্তত ছুটি নিচ্ছি যান্ত্রিক সবকিছু থেকে। ভার্চুয়াল দুনিয়ার বাইরে সত্যিকার উপভোগ্য একরাত পার করছি।

সবাই গোল হয়ে বসে পরলাম সমুদ্রতটেই, শুরু হলো গল্পকথা। ছোটবেলার স্কুলের দেয়াল পেড়িয়ে খেলতে  যাওয়া অথবা বিকেলের ঘুম ফাঁকি দিয়ে ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে দৌড়ানো একে একে উঠে আসলো সব গল্পই।গল্প চলতেই থাকলো এরমধ্যে কেউ কেউ শুয়ে পরেছে সমুদ্রতটকে প্রতিদিনের প্রিয় বিছানা মনে করেই। চারপাশে আমাদের সঙ্গ দিচ্ছে এমনকি আমাদের গল্পের মাঝে ফোরন কেটে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে কুকুর সম্প্রদায়ের কয়েকজন সদস্য এরাও হয়তো আজকে রূপালী চাঁদের সাথে আড্ডায় মেতেছে।

নির্জনে দুজনে বালুচরে। ছবি: লেখক

রাতের তখন শেষ প্রায় এদিকে ঘুমের গাড়ি যেনো আর পারছেনা চোখ দুটিকে সচল রাখতে এবার একটু ঘুম চাই।তাই বাধ্য হয়ে রিসোর্টে ফিরে গিয়ে এলিয়ে পরলাম বিছানায় সাথে সাথেই হারিয়ে গেলাম ঘুমের রাজ্যে।

সকালে উঠেই দেখলাম রিসোর্টের সিড়িতে ঢেউয়ের আছরে পরার দৃশ্য, এই দৃশ্য দেখার জন্য হলেও আপনাকে একবার সেইন্ট মার্টিন আসতে হবে। নিজেকে আর মানিয়ে রাখতে পারলাম না বসে পড়লাম পা ডুবিয়ে, ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে ক্ষণিকে ক্ষণিকে।যেনো সেইসাথে ধুয়ে মুছে নিয়ে যাচ্ছে শরীরের সমস্ত ক্লান্তি, বিষণ্নতা আর মনের কুটিলতা।

ছেরা দ্বীপে নীল জলের পাশে। ছবি: আসিফ ভাই

বসে থাকতে পারলাম না বেশিক্ষণ, বাকীদের ছেড়া দ্বীপ যাওয়ার প্রস্তুতির জন্য। নাস্তা করে রওনা দিলাম ছেড়া দ্বীপ যাওয়ার জন্য, সবাই ছেড়া দ্বীপ গেলোনা, ফ্যামিলির দুই গ্রুপ রয়ে গেলো রিসোর্টে এবং তারা আজকেই কক্সবাজার চলে যেতে চায়। আমরা ৮ জন গেলাম ছেড়া দ্বীপে, জাহাজ ঘাট থেকে ইঞ্জিন চালিত লাইফ বোটে করে গিয়ে পৌঁছলাম ছেড়া দ্বীপে কিন্তু হাজারো প্রবালে গড়া দেশের সর্ব দক্ষিণের ভূমির একি দশা? 

আমাদের পরিচ্ছন্নতা অভিযান। ছবি: ফরহাদ

হাজারো পর্যটকের তৃষ্ণা ও ক্ষুধা মিটানো পানির বোতল, বিস্কুট, চানাচুর, চিপসের প্যাকেটে সয়লাব অনিন্দ্য সুন্দর ছেড়া দ্বীপটি। তবে কি আমাদের ন্যুনতম সাধারণ বোধটুকু নেই? কি করিবে জাতি এমন পর্যটক লইয়া?

যারা এই ক্ষুদ্র ভূমিটুকুকে বানিয়ে ফেলেছেন প্রকাণ্ড এক ডাস্টবিন।

কোরাল ভর্তি ছেরা দ্বীপ। ছবি: লেখক

আগে থেকেই কিছু ছবি দেখে এরকম ভেবেছিলাম তাই আমরা সাথে করে ময়লা পরিষ্কার করার কিছু উপকরণ নিয়ে এসেছিলাম। তারপর লেগে গেলাম ময়লা পরিষ্কারের কাজে। নিজেদের সাধ্যমতো চেষ্টা করলাম, ৩০ মিনিটের মধ্যেই আমাদের সাথে থাকা দুইটি ব্যাগ পূর্ণ হয়ে গেলো আরো অন্তত কয়েকশত ব্যাগ ময়লা অবশিষ্ট রয়ে গেলো আমাদের বিবেক বিবর্জিত পর্যটকদের কার্যকলাপের স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে। যার অনেকটা গত বছরে ট্র্যাভেলার্স অফ বাংলাদেশ গ্রুপ থেকে পরিষ্কার করা হয়েছে।

দেশের সর্ব দক্ষিণের বিন্দু। ছবি: আসিফ ভাই

ফিরে আসলাম রিসোর্টে এবার সঙ্গীদের বিদায় দেয়ার পালা, রয়ে যাচ্ছি আমরা ৪ জন বাকী সবাই কক্সবাজার চলে যাচ্ছে, জাহাজে উঠিয়ে দিয়ে আসলাম। জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার পর মনে হলো সেন্টমার্টিনটাই ফাঁকা হয়ে গেলো আমাদের রিসোর্টেও অনেক হ্যামক দখলের নীরব প্রতিযোগিতায় আজকে প্রতিযোগির সংখ্যা কম।

বিদায় সেইন্ট মার্টিন। ছবি: আসিফ ভাই

এই দিনটি আমাদের অসাধারণ কেটেছিলো সব জায়গায় কম মানুষ থাকাতে, আবারো নেমে গেলাম আমাদের বানানো পার্সোনাল পুলে সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্তে উঠে আসলাম, তীরে বসে সূর্যাস্ত দেখবো বলে। প্রত্যক্ষ করলাম সারাদিন আলো ছড়ানো সূর্য টা হঠাৎ করে ডুব দিলো দূর সমুদ্রের জলে।

আরো একটি জ্যোৎস্নারাত আরো একটি নির্ঘুম সমুদ্রতট আর চার যুবকের অগোছালো গল্পকথা। এভাবেই ফুরিয়ে গেলো এবারের নারিকেল জিঞ্জিরা।

নাফ নদীতে সূর্যাস্ত। ছবি: লেখক

অপচনশীল দ্রব্য যেখানে সেখানে ফেললে সেটা প্রকৃতির উপর বিরুপ প্রভাব ফেলে, এই বিষয়ে আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হওয়া উচিৎ এবং বিষয়গুলো অবশ্যই মান্য করা উচিৎ। কারণ আমরা কেউ এতো দূরদেশে গিয়ে ময়লার স্তুপ দেখতে চাইনা।

প্রথম পর্ব পড়ুন এই লিঙ্ক থেকে:
https://www.vromonguru.com/all-divisions/chattagram-division/saintmartin-1st/

ড্রিম নাইট রিসোর্টে যোগাযোগ:
01874-550500

ফেসবুক পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/DreamNightResorts/

ফিচার ছবি: সাজু রহমান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top