fbpx

বুড়িগঙ্গার বুকে মহাকালের উত্তাল উচ্ছ্বাস

শহরের জীবন যেন থমকে গেছে। থেমে গেছে ঢাকা শহরে নিউক্লিয়াস। কোথায় সেই কর্ম ব্যস্ততা, কোথায় সেই যান্ত্রিক নগরী। এইটি কি আমার ঢাকা। হ্যালো ঢাকা শুনতে কি পাচ্ছো তুমি। ঢাকা মানুষেরা আজ গৃহবন্দি। জেগে উঠেছে ঢাকার প্রকৃতি। ফিরে এসেছে প্রকৃতির শিশুরা। হ্যাঁ মাদার নেচারের কাছে তো তার আদুরে প্রাণীগুলো শিশুই। সে যে ভয় পায় মানুষ নামক এক ভয়ংকর প্রাণীকে?

মেঘের সাথে নদীর মিতালী। ছবি: লেখক

ঢাকার আকাশ আজ মেঘলা নয়। আকাশে উড়ে বেড়ায় পাখি, শুনা যায় তার কুহুতান। আর যে নদীর বুকে বেড়ে উঠেছে এই শহর সেই নদী শোনায় আমাদের নতুন গদ্য। সেই গদ্যটি শোনার আমার সৌভাগ্য যে হয়েছিল। এই নদীর সাথেই তো আমার দু যুগের বাস। বুড়িগঙ্গাকে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য যে হয়েছিল। সেই ১৯৯৯ সালে আমাদের পাকাপাকি বসবাসের জন্য নদীর ধারে গড়ে তুলে আমাদের বাড়ি। আরসিন গেট নামক জায়গাটা তখনও তেমন বসতি গড়ে উঠেনি।

গোধূলি লগনে বুড়িগঙ্গা। ছবি: লেখক

এককালে বাংলার সুবেদার মুকারম খা নদীর পাড়ের অংশে আলোকসজ্জায় সজ্জিত করেছিলেন। নৌকার মাঝির রঙিন মানুষে মত জ্বালাতো ফানুস বাতি। এর রূপে মুগ্ধ হইয়ে দূর থেকে টেইলর সাহেব ঢাকাকে তুলনা করেছিল ভেনিস নগরীর সাথে। কালের বিবর্বতনের ইতিহাস যে বন্দী হয়ে গিয়েছিল সোনার খাঁচায়। আর সেই খাঁচাটি নিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সুবোধরা পালিয়ে বেড়িয়েছে বুড়িগঙ্গার ইতিহাসকে সাথে নিয়ে।

আকাশের নীল নদীর জলে হল বিলীন। ছবি: লেখক

বাবার মুখে শুনেছিলাম বুড়িগঙ্গার বুকে নাকি পাল তোলা নৌকা চলতো। আর পানি ছিল আকাশের মত নীল। কিন্তু আমি আর আমার পরের প্রজন্ম যে বুড়িগঙ্গা মিসমিসে কালো পানি ছাড়া কিছু দেখেনি। বর্ষা আসলে বুড়িগঙ্গা তার খোলস পালটিয়ে যৌবনা নারীর মত হাজির হত। আর বর্ষা শেষে নদী আবার শতবর্ষী বৃদ্ধার ঘা নিয়ে অপেক্ষায় থাকতো নতুন বর্ষার। কবে ফিরে পাবে নদী আবার সেই আগের রূপ।

কাকটি বসে ছিল তরঙ্গের তারে। ছবি: লেখক

কালে কালে ঢাকায় জনসংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে নদীর দূষণ। বুড়িগঙ্গা তো আশা ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু মাদার নেচারের যে অন্য খেয়াল ছিল। সে রচিত করলো মানুষকে গৃহবন্দী করার মহাকাব্য। পুরো বিশ্ব যখন করোনার কারণে স্থবির। কিছুটা পড়ে হলেও এই হাওয়ায় পাল তুলেছে আমার প্রিয় জন্মভূমি। মার্চের ২৫ তারিখের পর আস্তে আস্তে ঢাকার সাথে অন্যান্য জেলার সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ হল। বন্ধ হল কল কারখানা। সীমিত হল মানুষের চলাচল। যে নদীতে শুনা যেত লঞ্চের হুইসেল। সে নদী মহাকালের মহাস্তব্ধতা নিয়ে অপেক্ষা করছে আবার মানুষের স্পর্শের।

বুড়িগঙ্গার সেই অপেক্ষাটা আমি পাড়ে বসেই দেখেছি। আমার যে তার বুক ঘেষেই বাড়ি। আস্তে আস্তে দিন ফুরালো, দিন থেকে সপ্তাহ, এরপর মাস। বুড়িগঙ্গা এখন কেমন আছে জানতে কি ইচ্ছে করে প্রিয় শহরবাসি? মানুষের চলাচল বন্ধ হবার সাথে সাথে সে প্রতিদিন বেড়ে উঠছে এক চঞ্চলা কিশোরীর মত। সে তার বুকে উথাল পাথাল ঢেউ তুলে আবার আকাশকে আহ্বান জানিয়েছে তার বুকে। আকাশের নীল বুড়িগঙ্গার সচ্ছ জলের সাথে মিলেমিশে আবার একাকাল। কোথায় থেকে ভুবন চিলগুলোও ফিরে এসেছে নতুন বার্তা নিয়ে।

নীলের ভিতর সোনালী আভা, আহা জীবন। ছবি: লেখক

জানো ঢাকাবাসি আমি এখন বারান্দা দিয়ে নতুন নতুন পাখিদের আগমণ দেখি। তোমাদের পদচরনা কমে গেলেও প্রকৃতির শিশুরা যে বের হয়ে পড়েছে। ওরা যে বড় চঞ্চল, বড় নিষ্পাপ। কবে আমি শেষ দেখেছি মুনিয়া পাখি। ঝুইটা শালিক চড়ুই পাখিকে গল্প শোনায়। জাতীয় পাখি দোয়েলও এসেছে প্রকৃতি মায়ের ডাকে। কারও বাসার খাঁচা ভেঙ্গে কি বের হয়ে এসেছে সবুজ টিয়া। বুড়িগঙ্গা ও তো সুবোধের খাঁচা ভেঙ্গে সহস্র বছরের বেদনা নিয়ে আবার কুলকুল করে স্রোতের ঢেউ তুলেছে।

আজ ২ মাস হল প্রায় বুড়িগঙ্গা এখন কিশোরী থেকে অষ্টাদশী নারী হবার পথে। তার বুকে আবার যখন যৌবন ফিরে আসবে তখন তো তোমরাও ফিরে আসবে। আবার দূষিত হবে বুড়িগঙ্গা। আগে শুনতাম বাবা বলতেন শীতে গিয়ে গরমের গীত গাইলে হুজুর খ্যাতা পাবে না। আর এখন বুড়িগঙ্গা বর্ষার আগেই যৌবনের গান শুনাচ্ছে। একি তোমার লীলা প্রিয় নদী? তুমি এখন নীল, আকাশের মেঘ তোমার মাঝে হয় বিলীন।

পাখির চোখে বুড়িগঙ্গা। ছবি: লেখক

তোমার এই ফিরে আসা তো আমাদের আগ্রতার কথাই বলে। কতটা নির্মম ভাবেই না তোমার বার বার হত্যা করেছি বিগত বছরগুলোতে। করোনা কি তোমার জন্য আশীর্বাদ হয়ে এল প্রিয় নদী। তোমার পার এখন নীরব। নেই মানুষের পদধূলি, তুমি কি এমন পারই চেয়েছিল। তোমরা জলপুত্ররা ফিরে না এলে যে তুমি পূর্ণতা পাবে না। তুমি যে মমতাময়ি নারীর মত নিজে নির্বাসনে গিয়ে আবার তোমার বুক সরব করবে। আবার তোমার বুক দাপাবে মনু জাতি। আবার দূষিত হবে তোমার দুপার। তবুও যে তুমি মমতাময়ি নারীর মতই বেধে রাখবে ওদের।

ছাদে ক্যাম্পিং বিলাস। ছবি: লেখক

তুমি যে ঢাকার জননী। তোমার এই নিরবতা বড্ড আমায় কাঁদায়, বড্ড আমায় কাঁদায়। সুবোধ তোমার পাড়েই বসে আছে। আবার যখন সরব হবে তোমার পাড়। আবার খাঁচাটা খুলে দিবে সে। তুমি বন্দী হয়ে সুখের অশ্রুপাত করবে। সে জলে কি পবিত্র হবে মানব সমাজ। নাকি অপেক্ষা করবে আরেক মহাকালের ধংসবলীলার। বেঁচে থাকো প্রিয় নদী আমার হৃদয়ের গহীন কোণে।

Back to top