fbpx

জলাবন – রাতারগুলে

নিস্তব্ধ ঝকঝকে রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুর। শীতের তীব্রতা কমে গেছে অনেকখানি। বসন্তকাল সমাগত। এরকম এক বসন্তের উদাস দুপুরে পৌঁছে গিয়েছিলাম আমাদের দেশের একমাত্র জলাবন – রাতারগুলে। রাতারগুল মূলত হিজল ও কড়চ জাতীয় গাছের ঘন জলজ বন। সারা পৃথিবীতে ফ্রেশওয়াটার বা সাধুপানির জলাবন রয়েছে মাত্র ২২টি। ভারতীয় উপমহাদেশে রয়েছে এর দু টি জলাবন- একটি শ্রীলঙ্কায় আর আরেকটি সিলেটের গোয়াইনঘাটে।

বিশেষ জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ সংরক্ষিত স্থান – রাতারগুল

রাতাগাছের নামেই এ জলাবনের নামকরণ হয়েছে রাতারগুল। এ বনে প্রচুর মুর্তা বা পাটি তৈরির গাছ জন্মে। স্থানীয় ভাষায়, মুর্তা বা পাটি গাছকে রাতাগাছ নামেও ডাকা হয়। রাতারগুলের বেশ বড় একটা অংশে বন বিভাগ বাণিজ্যিকভাবে মুর্তা লাগিয়েছে । মুর্তা দিয়ে শীতলপাটি হয়।

রাতারগুলে র্মুতা বা স্থানীয় ভাষায় রাতাগাছ বা মুর্তা বনে লেখক

২০১৭ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব নির্বস্তক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত হয়েছে ‘শীতলপাটি’। বাংলাদেশের সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প ‘শীতলপাটি’কে নকশা পাটিও বলা হয়। বিভিন্ন রকমের নকশা রয়েছে শীতলপাটিতে। পাখি, ফুল-লতা-পাতা আঁকা থাকে। কখনও বা মসজিদ, চাঁদ-তারা, পৌরাণিক কাহিনীচিত্র, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার, শাপলা, পদ্ম ইত্যাদি জ্যামিতিক নকশা আঁকা থাকে।

সিলেট শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাতারগুল। গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের গুয়াইন নদীর দক্ষিণে রাতারগুলের অবস্থান। দক্ষিণ দিক থেকে চ্যাঙ্গের খাল, পূবদিক থেকে এসেছে কাফনা। চ্যাঙ্গের খাল ও কাফনা মিলে গোয়াইন নাম ধরে চলে গেছে উত্তরে গোয়াইনঘাটের দিকে। ভারতের মেঘালয়ের জলধারা গোয়াইন নদীতে এসে পড়ে, আর সেখানকার এক সরু শাখা চেঙ্গী খাল হয়ে পানিতে প্লাবিত করে রাতারগুলকে। আরেকপাশ দিয়ে থেকে বয়ে এসেছে পাহাড়ি খরস্রোতা সারি নদী। একটা সময়ে এই তিন নদীর পাড় ধরেই ছিল রাতারগুলের অস্তিত্ব।

বর্ষায় – জলাবন- রাতারগুলে – লেখক

বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের জাতীয় উদ্যান, বণ্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে যেতে হয়েছে কাজের সূত্রে বিভিন্ন সময়ে। ২০১৫ সালে রাতারগুলে গিয়েছি প্রথমবার রক্ষিত এলাকায় অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনায় সহ-ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে। সভা ছিল বন অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারকারীদের সঙ্গে। সে সময়টা ছিল বর্ষাকাল। পরবর্তীতে সুযোগ হয়েছে শুষ্ক মওসুমেও রাতারগুল পরিদর্শন করার। শীতকালে আর দশটা বনের মতোই, পাতা ঝরা শুষ্ক ডাঙ্গা। বর্ষাকালে এই নদীগুলোর পানি ঢুকে যায় বনের ভেতরে। গাছগুলো থাকে অর্ধেক পানির উপর, অর্ধেক পানির নিচে থাকে। বনের ভেতর এক শুন-শান নীরবতা । পানিতে ঘন জঙ্গলের ছায়া সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। শীতকালে পায়ে হেঁটে রাতারগুলে বেড়ানো যায়। দেখতে পাওয়া যায়, অতিথি পাখির আনাগোনা। তবে জলমগ্ন অবস্থায় এ বন ভ্রমণের উপযুক্ত সময় বর্ষাকাল। সাম্প্রতিক সময়ে রাতারগুল ভ্রমণ-স্থানটি পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে রাতারগুল জলাবন

বন বিভাগের তথ্যমতে, এ জলজ বনের আয়তন ৩ হাজার ৩০৫ দশমিক ৬১ একর। ১৯৭৩ সালে বনের ৫০৪ একর বনভূমিকে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ৫০৪ একর জায়গায় মূল বন, বাকি জায়গা জলাশয় আর সামান্য কিছু উঁচু জায়গা। তবে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে পুরো এলাকাটিই জলে ডুবে থাকে। যদিও শীতকালে পানি শুকিয়ে বিপরীত দৃশ্যের অবতারণা হয়। বিশেষ জীববৈচিত্র্য ও অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ রাতারগুলকে বিশেষ জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ সংরক্ষিত স্থান ঘোষণা করে।

বর্ষায় জলমগ্ন পর্যবেক্ষণ টাওয়ার

প্রায় ৩০০ একরের বেশি জমির ভূমির ওপর জলের মধ্যে ভেসে থাকা সবুজ বৃক্ষ, মাঝ দিয়ে নৌকায় করে রাতারগুলে ঘুরে বেড়ানোর যাবে মাত্র এক থেকে দুই ঘণ্টায়। চাইলে আরও বেশি সময়ও কাটানো যায়। অদ্ভুত এই জলের রাজ্য। কোনো গাছের কোমর পর্যন্ত ডুবে থাকে পানিতে। একটু ছোট গাছ যেগুলোর প্রায় অর্ধেকটাই ডুবে আছে। ঘন হয়ে জন্মানো গাছপালার কারণে কেমন যেন আলো-আঁধারির এক রহস্যময় চারপাশ! বনের মাঝ দিয়ে চলতে গেলে ভ্রমণপিসাসুদের জড়িয়ে ধরবে নানা ধরনের গাছপালা। বৈশিষ্ট্যে এ বনের সঙ্গে মিল রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের আমাজনের। বনের ভেতরের দিকে ডালপালায় জড়িয়ে থাকা গাছের গভীরতা এতই বেশি যে, সূর্যের আলো কোথাও কোথাও জল ছুঁতে পারে না। ডিঙিতে চড়ে বনের ভেতর ঘুরতে ঘুরতে দেখা যাবে জল-জঙ্গল আর জীববৈচিত্র্য। জলমগ্ন বলে এই বনে কখনও কখনও সাপ চোখে পড়ে। একটি তথ্যে জানা যায়, এ বনে ৭৩ প্রজাতির উদ্ভিদ, ২৬ প্রজাতির স্তণ্যপায়ী প্রাণী, ২০ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৭৫ প্রজাতির পাখি ও ৯ প্রজাতির উভচর প্রাণী রয়েছে। সাদা বক, মাছরাঙা, টিয়া, বুলবুলি, পানকৌড়ি, ঘুঘু, চিলসহ ইত্যাদি নানা জাতের পাখির উড়ে চলা ভ্রমণের আনন্দকে বাড়িয়ে দেয় অনেকাংশে।

রাতারগুল জলাবনে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য

জোয়ার-ভাটার কারণে বনের গাছ পালা পানিতে প্লাবিত হয়ে জলমগ্ন থাকে কখনওবা পানি কম থাকে। বনের ভেতরের গাছগুলোর সেকারণে দুই রঙের। মাথার উপরে ছড়িয়ে থাকে বিভিন্ন আকৃতির ধূসর রঙের সরু শেকড়। ওপরের অংশ সবুজ আর নিচের অংশ কর্দমাক্ত। এ বনে গাছের মধ্যে করচ আর হিজলই বেশি। হিজল গাছে ফল ধরে থাকে ডাল-পালাকে আবৃত করে। মাঝেমধ্যে দু’একটা বটগাছও চোখে পড়ে।

বর্ষায় – রাতারগুলে বিভিন্ন পর্যটকদের বিভিন্ন রঙ-বেরঙের নৌকা

ঘন হয়ে জন্মানো গাছপালার কারণে রোমাঞ্চকর রহস্যময় আলোছায়া রাজ্য। মাঝেমধ্যেই গাছের ডালপালায় আটকে যায় চলার পথ। হাত দিয়ে সরিয়ে পথ চলতে হয় খুব সাবধানে। পর্যবেক্ষণ টাওয়ার খেকে ফেরার পথে আকাশে সূর্যের কিরণ ছড়িয়ে পড়ে আকাশজুড়ে। রঙ ছড়িয়ে থাকা আকাশজুড়ে পাখির নীড়ে ফেরার দৃশ্য। জ্যামিত্যিক বিভিন্ন নকশায় আকাশজুড়ে উড়ে চলা পাখির চিকির মিচির শব্দ বনের নিরবতাকে শব্দময় করে তোলে। গোধূলির স্বপ্নিল আবহে আচ্ছন্ন বিকেল পেরিয়ে তখন সন্ধ্যার আঁধারে ছেয়ে গেছে চারপাশ। রোমাঞ্চকর রহস্যময় আলোছায়ার মায়া কাটিয়ে জলামগ্ন বন থেকে ফিরে এলাম ডাঙায়।

রাতারগুলে – লেখক, শুষ্ক মওসুমে

রাতারগুল যাওয়ার পথ
১. সিলেটের বন্দরবাজার পয়েন্ট থেকে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে মটরঘাট (সাহেব বাজার হয়ে) পৌঁছাতে হবে, ভাড়া ৩০০-৪০০ টাকা । সময় প্রয়োজন হবে ঘণ্টাখানেক। এরপর মটরঘাট থেকে সরাসরি ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে বনে চলে যাওয়া যায়, ঘণ্টাপ্রতি ৪০০-৫০০ টাকা লাগবে নৌকায়। এই পথটিতেই সময় ও খরচ সবচেয়ে কম।

২. সিলেটের আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে গোয়াইনঘাট পৌঁছানো, ভাড়া পড়বে ৭০০ টাকা। একইভাবে গোয়াইনঘাট থেকে রাতারগুল বিট অফিসে আসবার জন্য ট্রলার ভাড়া করতে হবে, ভাড়া ১ হাজার থেকে ১৫শ এর মধ্যে (আসা যাওয়া) আর সময় লাগে ২ ঘণ্টা। বিট অফিসে নেমে ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে বনে প্রবেশ করতে হয়। ঘণ্টাপ্রতি ৩০০-৪০০ টাকা প্রয়োজন হবে

সিলেট থেকে জাফলং তামাবিল রোডে সারীঘাট হয়ে সরাসরি গোয়াইনঘাট পৌঁছানো। বনে বা তার আশপাশে খাবার বা থাকার কোন ভাল ব্যবস্থা নেই। তাই খাবার গোয়াইনঘাট বা সিলেট থেকে নিয়ে আসা যায়।

সতর্কতা:
নৌকায় নিরাপত্তার জন্য ভ্রমণের সময় লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করা বাঞ্চনীয়। প্রকৃতি পর্যটনে যত্নশীল হওয়া বাঞ্চনীয়। পলিথিন ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। ময়লা-আবর্জনা নির্ধারিত স্থানে ফেলে পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখুন। ছবির মত এ দেশটি সবার প্রচেষ্টায় আরো শ্যামল – সবুজ হবে।

(আলোকচিত্র: এম.কামাল, উৎপল দত্ত এবং লেখক)

ভ্রমণগুরুতে প্রকাশিত আমার অন্যান্য ঘ্রমণকাহিনী পড়তে ক্লিক করুন এই লিংকে:
https://www.vromonguru.com/author/lipi/

লেখক পরিচিতি:
লেখক, প্রাবন্ধিক ও পরিবেশবিদ। প্রকাশিত বই ‘আমার মেয়েঃ আত্মজার সাথে কথপোকথন, একাত্তর মুক্তিযোদ্ধার মা, বাংলাদেশের উপকূল: পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য, জীবনীগ্রন্থ সরদার ফজলুল করিম, সম্পাদনা: সরদার ফজলুল করিম দিনলিপি, মাঃ দুইবাংলার সাহিত্য সংকলন, শিশু বিশ্বকোষ ইত্যাদি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top