ভবঘুরে ভ্রমণ: তাঁবু হাতে পদ্মহেমে

শীতের আগমনী বার্তা শুরু হয়ে গেছে প্রকৃতিতে, কান পাতলেই শোনা যায় শীতের আগমনী শব্দ। গ্রাম এলাকায় এখনি কুয়াশাজড়ানো মায়াময় ভোরের দেখা মিলছে,   সন্ধ্যা রাত্তিরেই সবুজের আচ্ছাদনে শিশির জমা শুরু হয়ে গেছে। এরকম সংবাদ শুনে শুনে মনের মধ্যে তাঁবুবাসের তীব্র বাসনা জেগে উঠলো। বাসনা জেগে উঠলেই কি যাওয়া যায়?  সমাজ সংসার থেকে নয়তো ছুটি পাওয়া গেলো কিন্তু ভ্রমণসঙ্গী ? এইসব ক্ষেত্রে উপযুক্ত ভ্রমণসঙ্গী না হলে বিড়ম্বনার স্বীকার হতে হয়। তাই গতবছরের ক্যাম্পিং সঙ্গীদেরকে জানানোর পরে কেউই তেমন রাজী হলোনা।

আমাদের ক্যাম্প সাইট। ছবি: লেখক

আশিক ভাই এখন বিশাল সেলিব্রেটি, স্বঘোষিত কবি, সাহিত্যিক। কান পাতলেই অনেক অনেক ফ্যান ফলোয়ারের কথা শোনা যায়।  তাই যেখানে সেখানে যান না। খ্যাতির বিড়ম্বনা একটা সময় সবাইকেই পোহাতে হয়। এরপরও ওনাকে ইসমাইল ভাইয়ের দোকানে দেখা হওয়ার পরে জানালাম, অল্প অল্প রাজী হলেন। কিন্তু যাওয়ার দিন না করে দিলেন। তারপর জানালাম তাহান ভাইকে। উনি এই মুহূর্তে পরীক্ষা নিয়ে যন্ত্রণায় আছে তারপরও একমত না হয়ে দ্বিমত হলেন না। দুজনেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কোথায় যাবো সেটা ঠিক করতে খুব বেশি সময় লাগলো না।

মোল্লারহাটের খেয়াঘাট। ছবি: লেখক

ঢাকার খুব কাছেই আমাদের অতি প্রিয় একটা ক্যাম্প সাইট আছে। সেটা হলো সাঈজীর আশ্রম, পদ্মহেম ধাম। ইছামতী নদীর তীরে শান্ত স্নিগ্ধ, গাছগাছালি ঘেরা এই জায়গায় যতো যাই ততোই মন ভরে যায় । ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার ইছামতী নদীর তীরে এই আশ্রম। এখানে সাঈজী কখনো না আসলেও এসেছে তার দর্শন। মানব প্রেমের মায়ায় গড়ে উঠেছে লালন গীতি বিদ্যালয়সহ আরো স্থাপনা। বছরে একবার হয় সাধুসঙ্গ ও লালন সংগীত উৎসব। মিলনমেলা হয় বাউল সম্রাটদের। 

মোল্লারহাটে বিক্রি হচ্ছে দেশী মাছ। ছবি: লেখক

এরকম একটি জায়গায় অনেকবার গিয়েও মন ভরেনা, তাই সুযোগ পেলেই চলে যাই। ঠিক করলাম দুপুরের খাবারের পরেই পোস্তগোলা থেকে যাত্রা শুরু করবো আমরা। সেই মোতাবেক চলে আসলান তাঁবুবাসের সরঞ্জাম নিয়ে দুজনেই। পোস্তগোলা ব্রিজ থেকে লোকাল সিএনজি পাওয়া যায় মোল্লারহাট বাজারের, ভাড়া জনপ্রতি ৪০ টাকা। কদমতলী থেকেও মোল্লারহাট বাজারের লোকাল সিএনজি পাওয়া যায়। উঠে পড়লাম সিএনজিতে। মোল্লারহাট এসে দেখলাম হাটবার। বাজারে ঘুরলাম কিছুক্ষণ, হাট উপলক্ষ্যে নানান মানুষের আনাগোনা বাজারে। অনেকেই কৃষক নিজেদের জমিতে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য, শাক সবজি বিক্রি করছে। অনেক জেলে মাছ ধরে নিয়ে এসেছে বিক্রির জন্য। ঢাকার এতো কাছে এরকম গ্রাম্য বাজার দেখবো ভাবতে পারিনি। এরকম বাজার ছোটবেলা থেকে আমাদের গ্রামে দেখেছি। এখনো সপ্তাহে দুইদিন হাট বসে। আমরা রাতের জন্য কিছু খাবার কিনলাম। কাপ নুডলস,  কফি মিক্স আর তাহান ভাইয়ের পছন্দের সান চিপস।

সাঈজীর মায়ায় আশ্রয় নেওয়া ভাসমান সংসার। ছবি: তাহান ভাই

এখানে ছোট্ট একটা খেয়া পাড় হতে হয় খালের উপর দিয়ে। লাইন ধরে নৌকায় উঠতে হয়। মানুষ, সাইকেল, মোটরসাইকেল সবই পাড় হচ্ছে খেয়া নৌকায়। একপাশে ঢাকার কেরানীগঞ্জ অপরপাশে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান। মাঝখানে সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছে বহমান জলধারা। 

বিকেলের সোনা রোদে নৌকায় উঠলাম ঢাকা থেকে নামলাম মুন্সীগঞ্জে। কাগজে কলমে ভৌগোলিক সীমানায় পার্থক্য থাকলেও এখানের স্থানীয় লোকজনকে দেখে কারো মধ্যেই পার্থক্য দেখা গেলোনা। ওপারে যেরকম এপারেও সেরকম। দুইপারেই তাদের নিত্য আসা-যাওয়া। আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ অনেকেই।  নৌকা থেকে নেমে অটোরিকশায় চড়ে বালুচর বাজার হয়ে ভাষানচর ব্রিজে গিয়ে নামলাম। তারপর নদীর তীর ঘেষে ইট বিছানো রাস্তা ধরে পশ্চিমের আকাশে অস্ত যাওয়া সূর্যের সাথে পাল্লা দিয়ে হেঁটে হেঁটে সূর্য ডুব দেওয়ার আগেই গিয়ে উপস্থিত হলাম সাঈজীর বারামখানায়। 

বেলা শেষে বাড়ি ফেরা। ছবি: তাহান ভাই

পদ্মহেম ধামে আসার পথেই দেখা হয়ে গেলো জালাল ভাইয়ের সাথে। উনি আশ্রমের একনিষ্ঠ সেবক। কোনো অতিথি গেলে তাদের দেখাশোনা, তাদের সাথে সঙ্গ দেওয়াতে জালাল ভাইয়ের কোনো ক্লান্তি নেই। প্রথমবার যখন আসলাম এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি জনিত কারণে উত্তেজনা বিরাজ করছিলো, রাতে বাজারে গিয়ে খাবার আনলেন আমাদের জন্য তারপর সারারাত বসে সঙ্গ দিলেন আমাদের। এবারো দেখা হওয়ার সাথে সাথেই জড়িয়ে ধরলেন। জালাল ভাই বাজারে যাচ্ছেন ওনাকে বিদায় দিয়ে আশ্রমের পথে হাঁটতে লাগলাম। অল্প সময় পরেই পৌঁছে গেলাম চির পরিচিত বারামখানায়। তখনো সূর্য অস্ত যায়নি তবে লালচে-সোনালি বর্ণ ধারণ করেছে। পদ্মহেমে বসে এই সূর্যাস্ত দেখার জন্যই বারবার ছুটে আসি। প্রাণভরে উপভোগ করলাম সূর্যাস্ত।

ঠিক সন্ধ্যে নামার মুখে। ছবি: তাহান ভাই

শীতের শুরু হয়ে গিয়েছে, সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই টের পাওয়া গেলো। তাঁবু সেট করা শেষ করেছি ঠিক এই সময় ৮-৯ বছরের এক ছেলে আসলো। তাঁবু দেখতে উৎসুক অনেকেই আসে কিছুক্ষণ থেকে চলে যায়, তবে এই ছেলেকে তাদের দলের মনে হলোনা। নীরব চাহনী, শান্ত স্বভাব এবং সবার থেকে দূরে দূরে থাকছে। ডেকে নাম জিজ্ঞেস করলাম, একটু কাছে এসে নাম বলেই প্রশ্ন করলো, ‘আপনারা গান গাইতে আসছেন?’ তাহলে আমি রাতে গান শুনতে আসবো। জিজ্ঞেস করলাম তোমার ঘর কোনটা ? বললো আমাদের ঘর নেই, নৌকায় থাকি এটাই আমাদের ঘর, আমাদের সংসার, আমাদের সব।  মনটা বিষণ্ন হয়ে গেলো এই বয়সের একটা ছেলে যার কোনো অক্ষর জ্ঞান নেই। জলে ভেসে চলে সংসার। আজ এ ঘাটে তো কাল আরেক ঘাটে, ভাসমান তরীতেই কেটে যাচ্ছে জীবন। অধরাই থাকছে বাহিরের জগৎ। 

কফি কাপে চুমুক দেওয়ার পালা। ছবি: লেখক

রাত হতেই চারপাশ নীরব হয়ে গেলো, খোলামাঠে আমি আর তাহান ভাই কফি কাপে চুমুক দিতে দিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাজারো তারার সরব উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করলাম। চেষ্টা করলাম তারা চেনার কিন্তু এই বিষয়ে দুজনের জ্ঞানই সীমিত তাই খুব বেশি তারার সাথে পরিচিত হতে পারলাম না। রাতের খাবারের জন্য ভরসা লালচান, এখানে যে চায়ের দোকান আছে সেটা চালায় লালচান । ওর দোকান বন্ধ করে আমাদেরকে ডিম সিদ্ধ ও  গরম পানি করে দিবে সেটাতে আমরা নুডলস তৈরি করবো। লালচান ঠিক দোকান বন্ধ করেই ডাক দিলো। ওর সাথে বেশ ভাব হয়ে গিয়েছে আমার, আমাদের তাঁবুবাস, যখন তখন চলে আসা পাগলামি মনে হয় ওর কাছে।

স্বল্পাহারে ডিনার। ছবি: লেখক

রাতের খাবার শেষে আবারো অনেক গল্প হলো খোলা আকাশের নিচে শুয়ে শুয়ে। তারপর এক সময় তাঁবুতে প্রবেশ করলাম। এই জায়গায় সারারাত লোকজনের আনাগোনা থাকে। নদীতে অনেকেই মাছ ধরে। তাই তাদের চলাচল, হঠাৎ করে জলের মধ্যে মাছ ধরার শব্দ কিংবা ছলাৎ ছলাৎ বৈঠার শব্দ কানে আসে সারারাত। সকাল হতেই কুয়াশাজড়ানো এক স্বপ্নময় অনুভূতি প্রকৃতি আবিষ্কার করলাম। মায়াময় এই ভোরেই নদীর ঘাটে জমে উঠেছে মাছের আড়ৎ। নিলামে বিক্রি হচ্ছে বোয়াল, আইড়, টেংরা, পুটি, পাবদা। তাড়িয়ে তাড়িয়ে সকাল উপভোগ করে রোদ বাড়তেই তাবু গুটিয়ে ফেললাম। বাড়ির ভিতরে এসে হ্যামক ঝুলিয়ে সাঈজীর গানে মজে গেলাম অনেক সময় পর্যন্ত তারপর বাড়ি ফেরা। 

কুয়াশাজড়ানো মায়াময় ভোর। ছবি: তাহান ভাই

ভ্রমণগুরু সাইটে প্রকাশিত আমার সব পোস্ট দেখুন এই লিঙ্কে: https://www.vromonguru.com/author/jewel/ 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top