পাবনার জোড় বাংলা মন্দির: শুনি ইতিহাসের ফিসফাস

ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির আহবান জানাচ্ছে প্রকৃতি। মানসিক হাসপাতাল থেকে আমরা রাঘবপুরের অটো ঠিক করলাম। এবার আমাদের গন্তব্য দেশের একমাত্র জোড় বাংলো মন্দির দর্শন। যথারীতি অটো আমাদের রাঘবপুর মোড়ে নামিয়ে দিলে এখান থেকে সামন্য হেঁটে গেলেই জোড় বাংলা মন্দির। বাংলার মুসা আমান আমাদের ওয়াফি অটো থেকে নেমেই চিমসে মুখে মালাই চা খুঁজতে লাগলো। বিধিবাম এখানে কড়া লিকারের চা ছাড়া কিছু নেই। 

বিষণ্ণ ওয়াফি হেঁটে চলছে রাঘবপুরের পথে। হঠাৎ তার চোখ মুখে উজ্জ্বল আভা ছড়িয়ে পড়লো। আশেপাশে তো খাবারের দোকান দেখছি না। তবু কেন তার চোখ চিক চিক করছে। খাদ্য সন্ধানি চোখ কি ভুল বলে? তা তো নয়। সামনে দেখতে পেলাম এক গোয়াল সাইকেলে করে দুধ বিক্রি করছে। ওয়াফি বলে উঠলো ‘আশিক ভাই দুধ খামু, টাকা ধার দেন কিছু।’

জোড় বাংলা মন্দির। ছবি: কায়েস আহমেদ

আমি জিজ্ঞেস করলাম ‘চিনি ছাড়া কাঁচা দুধ কি ভাবে খাবে।’ সে বললো, ‘ব্যাপার না আমি খাইতে পারুম।’ আমি অবাক নেত্রে তাকিয়ে দেখলাম ওয়াফি এক লিটার দুধ বোতলে নিয়ে নিল। হাঁটছে আর খাচ্ছে। যাক আপাতত তার খাদ্যের সমাধান পাওয়া গেল। আমার এই ছোট ভাইটা সফরে এসে এমন সব উদ্ভট কাণ্ড করে বিধায় প্রতিটা সফরেই রঙ্গিন কিছু স্মৃতি নিয়ে আসতে পারি।

সামনে একটু এগিয়ে এক চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম জোড় বাংলো মন্দিরটি কোথায়। তিনি বললেন বেশি দূরে নয়। ২ মিনিট হাঁটলেই পেয়ে যাবে। হাটতে হাটতে কল্পনায় চলে গেলাম কোন গ্রামীন পথে। আমার কল্পনায় ধরা দেয় মাটি গোলপাতার তৈরি দোচালা ঘর। জোড় বাংলা স্থাপত্যরীতি কি স্থাপ্তত্য শিল্পীর হাতে সেই দোচালা ঘরের কথাই বলে।

অন্য এংগেলে জোড় বাংলা মন্দির। ছবি: কায়েস আহমেদ

সপ্তদশ শতকের শুরুর দিকে এই অখণ্ড বাংলায় জোড় বাংলা নামক এই স্থাপত্যরীতি মন্দিরের নকশা কিংবদন্তির সুর তুলে। জোড় বাংলা রীতি অনুযায়ি পুরো মন্দিরের নকশায় থাকবে দুটো অংশ। মন্দিরের স্থায়িত্বের কথা ভেবে দুটি চালা পাশাপাশি জোড়া দিয়ে তৈরি হয় অদ্ভুত এক স্থাপত্যরীতি। এর এক অংশ ব্যবহৃত হয় বারান্দা হিসেবে, অপর অংশ ব্যবহৃত হয় মন্দির হিসেবে।

এমন স্থাপত্যশৈলীর নির্দশন দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন  অংশে। কিন্তু আমাদের দেশে বিশেষভাবে এই মন্দিরের নাম উঠে আসে কেন। কারন পাবনা শহরের এই জোড় বাংলা মন্দির বাংলাদেশের একমাত্র জোড় বাংলা মন্দিরও বটে। একমাত্র বলার কারণ আগে এ দেশে দশটির মত ছিল এই স্থাপনা। কালের বির্বতনে টিকে আছে পাবনার গোপীনাথের এই জোড় বাংলা মন্দির।

একটু ভিন্ন আঙ্গিকে। ছবি: কায়েস আহমেদ

দেখতে দেখতে চলে এলাম মন্দিরের গেটে। ছবির সেই মন্দির এখন কত কাছে। মন্দির প্রাঙ্গনে কিছু দুষ্টু ছেলের দল ক্রিকেট খেলছে। মন্দিরের চারপাশে একটা রাউন্ড দিয়ে এ মন্দিরের ইতিহাসের কোন সাইনবোর্ড পেলাম না। নেই কোন তথ্য প্রতিষ্টাকাল ও নির্মাণের ব্যাপারে। শুধু সংরক্ষিত পুরাকীর্তি একটি ঝং ধরা নীল সাইনবোর্ড দেখা যাচ্ছে। পাবনা জেলার এই মন্দির নিয়ে মানুষের প্রবল আগ্রহ থাকা শর্তেও তথ্যের অপ্রতুলতা আমায় হতাশ করলো।

তাই ঘুরে আসি বইয়ের পাতা থেকে। দেখা যাক কোন ইতিহাস যদি বের হয়ে আসে। ‘পাবনা জেলার ইতিহাস’ গ্রন্থের লেখক রাধারমণ সাহার দেয়ার তথ্য অনুযায়ী এককালের এখানে নিয়মিত পূজা-অর্চনা হত। মন্দিরে বাস ছিল গোপীনাথ দেবতার। গোপীনাথ দেবতা  হলেন হিন্দু দেবতা কৃষ্ণের একটি রূপ। কৃষ্ণ ছোটবেলা থেকে গোপীদের মাঝে বড় হয়েছিলেন বিধায় তাকে ভালোবেসে ভক্তরা গোপীদের দেবতাও বলতো। এই মন্দিরে কৃষ্ণর পত্মী রাধার মূর্তিও ছিল। ১৯১০ সালে স্থানীয় কালী মন্দিরে সরিয়ে ফেলা হয় গোপীনাথের মূর্তিটি। তখন থেকে সেখানেই তার অবস্থান। অপর এক সূত্র থেকে জানা যায়, এই জোড় বাংলা মন্দির কাজ অসম্পূর্ণ ছিল বিধায় এখানে কখনও পূজা অর্চনা হয়নি। ভূতুড়ে মন্দির হিসাবে পড়ে ছিল অজীবন।

ছবি তুলতে ব্যস্ত ওয়াফি। ছবি: লেখক

সময়ের পরিভ্রমণের বিভ্রম থেকে ফিরে এলাম বাস্তবে। এই তো সামনের বাংলাদেশের একমাত্র জোড় বাংলা মন্দির যেন ইতিহাসের পাতা ফুড়ে উঠে এসেছে বাংলার জমিনে। মন্দিরের সামনের দিকে এসে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার খিলানযুক্ত প্রবেশপথ যেন আহবান জানাচ্ছে তার ইতিহাসে ডুবে যেতে। মন্দিরের দুয়ারে ও বাইরে দৃষ্টিনন্দন নকশা করা ইটের কারুকার্য নেত্র মেলে দেখছি। আর ভাবছি জোড় বাংলা তোমার কি নেই আর ইতিহাস। 

বৃক্ষের ছায়ায় নিচ্ছে বিশ্রাম। ছবি: লেখক

অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে মুর্শিদাবাদের নবাবের তহসিলদার ব্রজমোহন ক্রোড়ীর নাম এই মন্দিরটি নির্মাণের ব্যাপারে গুঞ্জিত হয়। তবে এ ব্যাপারে কোন শিলালিপি পাওয়া যায়নি বলে তা ধারনার মধ্যেই থেকে যায়। ব্রিটিশ রাজদের সময় থেকেই এই মন্দির প্রত্মতত্ত্ব অধিদপ্তর কতৃক সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষনা করা হয়। ষোড়শ শতাব্দির শুরুর দিক থেকে এই বঙ্গ অঞ্চলে নির্মিত হয় একের পর এক মন্দির। সে সময় মোগল সম্রাটরা ভিন্ন ধর্মের কথায় মাথায় রেখে বেশি করে মন্দির নির্মাণে হুলিয়া জারি করে।  মন্দিরে নির্মাণে তখনকার নকশাকারিদের মধ্যে চলতো নানা রকমের জল্পনা কল্পনা। তারই রূপরেখা স্বরূপ নাগারা, চালা, রত্ম, রেখা, জোড় বাংলা স্থাপত্যশৈলীর মত সৃষ্টিশীল ও নান্দনিকতায় মোড়ানো স্থাপত্যের দেখা মিলতো পুরো ভারতবর্ষে।

অন্য রকম। ছবি: লেখক

কল্পনা-জল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এলাম ওয়াফির হাকে। তার দুধের বোতল প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। মানুষ কাঁচা দুধ এত কিভাবে খায় তা ওয়াফিকে না দেখলে জানতে পারতাম না। তবে এই দুধেও খাদকের ক্ষুধা মিটে না। মন্দিরে বাহিরে কুলফি মালাইয়ের ফেরিয়ালাকে দেখে হাক দিল ওয়াফি। দিনে ৩০০০-৩৫০০ ক্যালরি কনসিউম করার পরও পেটানো দেহ। খাবার সব ম্যাসলে চলে যায়। মালাইয়ের রসে ডুবে গেল ওয়াফি। আমি না হয় মন্দিরের নির্মাণশৈলীর দিকে একটু নজর দেই।

এই জোড় বাংলা মন্দিরের দুটি চালা একত্রে ইংরেজি এম অক্ষরের আকৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এতক্ষণ পড় খেয়াল হল। পূর্বের চালা কে বলা হয় মান্দাপা আর পশ্চিমের চালা কে গর্ব গৃহ বা বাংলা ভল্ট নামেও বেশি পরিচিত। ইটের তৈরি একটি বেদীর উপর পুরা স্থাপনাটি দাঁড়িয়ে আছে। দোচালা ঘরের দুই প্রান্ত নিচু, মাঝখানে শিরদাড়ার মতো করে উঁচু কাঠামো এই মন্দিরটিকে দিয়েছে এক অন্য রকম সৃষ্টিশীলতা। তাই তো এই মন্দির অন্য মন্দির থেকে একটু ভিন্ন।

সামনে থেকে পিছন। ছবি: লেখক

মন্দিরের উপরের পাকা ছাদের দিকে তাকালে ফিরে যেতে হয় যেন বাংলার কোন গ্রামীন পথে। কোন এক যুগে দোচালা ঘরের প্রচলন ছিল। আধুনিকতার ছোয়ায় সেই দোচালা ঘরগুলো আজ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এই মন্দিরের প্রবেশ পথ, স্তম্ভ ও দেয়ালের নির্মাণশৈলীর সাথে কান্তজিউ মন্দিরের বেশ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এই মন্দিরের দেয়াল ও স্তম্ভে কোন এক সময় দেখা যেত পোড়ামাটির অলংকৃত চিত্র ফলক। কালের কড়াল গ্রাসে তা আজ হারিয়ে গেছে কোন স্রোতে। বৃষ্টি ও অদ্রতার কারণে পোড়ামাটির ফলক ক্ষয়ে গেছে অনেক আগে। মাটির লবাণাক্তা কেড়ে নিয়েছে নকশার অস্তিত্ব। তবু কিছু ছিটেফোঁটা নকশার কাজ এখনও রয়ে গেছে। আকারে ছোট হলেও পোড়া ইটের কারুকার্যগুলো বেশি দৃষ্টি নন্দন।

পাবনা শহরের গল্প প্রায় ফুড়িয়ে এল, বৃষ্টিটাও নেমে এল প্রকৃতির বুকে। মালাই কুলফির ফেরিয়ালা বৃষ্টির ছটায় ধর্ম ভুলে আশ্রয় নিল মন্দিরে। সাথে সঙ্গ দিল ক্রিকেট খেলতে থাকা দুষ্টু ছেলের দল। আমরাও বাদ যাব কেন। পেটে ছুচো দৌড়াচ্ছে। তবুও এখন তাড়া নেই। বৃষ্টি থামলে প্রথমের পেটে পূজা এরপর সৌন্দর্য্যের পূজা হবে না হয়। পাবনা শহরের শেষ গন্তব্য যে মহা নায়িকা সূচিত্রা সেনের বাড়ি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top