fbpx

শতবর্ষের সাক্ষী বোস কেবিনে একদিন

ভ্রমণের সাথে সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত৷ কোন অঞ্চলে গিয়ে সেই অঞ্চলের ইতিহাসের সাথে মিশে গিয়ে মানুষের গল্প শোনার মাঝেই তো ভ্রমণের সার্থকতা৷ ভ্রমণ অনেক ধরনের হয়৷ এর সংজ্ঞা ও অসীম। সেই ব্যাখ্যায় যাব না৷ ভ্রমণের সাথে স্থানীয় খাবার এক ভিন্ন আমেজ তৈরি করে৷ সেই ভিন্ন আমেজের গল্প নিয়েই আজ হাজির হলাম৷ গল্প বলবো বোস কেবিনের৷ বোস কেবিনের খাদ্যের স্বাদ নিতে চলে গিয়েছিলাম প্রাচ্যের ডান্ডির শহর নারায়নগঞ্জে৷

বোস কেবিন আর আমি। ছবি: নাজিম রাব্বি

প্রাচ্যের ড্যান্ডির শহরে তখন গুম গুজব বেশ চলে৷ নারায়নগঞ্জ গেলেই নাকি মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে৷ এর মাঝে অফিসিয়াল কিছু কাজের কারণে যেতে হবে নারায়নগঞ্জ৷ বাসা আমার পোস্তাগোলার খুব কাছাকাছি৷ তাই পোস্তগোলা থেকে পাগলা, পঞ্চবটি, চাষাড়া হয়ে যেতে হবে নারায়নগঞ্জ। তাই আনন্দ বাসের নিরানন্দ যাত্রার জন্য তৈরি হলাম৷ ঝাকি খেতে খেতে পথের ধুলো আমায় স্বাগতম জানানোর জন্যই বসে ছিল৷ এই রাস্তা প্রতি বছর মায়াবতীর কোমল স্পর্শে ঠিক করলেও বর্ষার আগেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে পড়ে৷ কপাল যখন নন্দ গোপাল তখন ভাগ্যের লিখন খণ্ডাই কেমনে৷ পঞ্চবটি আসতে আমার পশ্চাৎদেশের হাড় আর রানের হাড় সমান হয়ে ত্রাহি ত্রাহি করে চিৎকার করছে যেন৷ পাঞ্জেরি নারায়নগঞ্জ আর কতদূর৷

সবাই আড্ডায় ব্যস্ত। ছবি: নাজিম রাব্বি

নারায়নগঞ্জ শহরে যখন প্রবেশ করলাম আমি আর আমার মাঝে নাই। শরীরের চিপায় চাপায়, গিড়ায় গিড়ায় ব্যথা। দুইটা সুখটান দেবার খায়েসে টংয়ের দোকানে একটু জিরিয়ে নিলাম৷ প্রতিজ্ঞা করলাম এ পথে আর নয় পাঞ্জেরি। টংয়ের দোকানে বসে স্মরণে এলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু। এখান থেকে নারায়নগ্ঞ্জ বন্দর, স্টিমার ঘাট খুব কাছেই। আজ থেকে শত বছর আগে এই স্টিমার ঘাটেই ছিল ভুলু বাবুর চায়ের দোকান।

প্রথম জীবনে দারোগার চাকুরি পেলেও তা করেননি ভুলু বাবু। তার মাথায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পোকা নেতাজির কল্যানে ততদিনে ঢুকে গেছে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর বাঙালিদের মধ্যে সশস্ত্র আন্দোলনের ঝোক তৈরি করে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু। এই আন্দোলনে যুক্ত হন ভুলু বাবু। কলকাতা থেকে সিদ্ধান্ত হয় ব্রিটিশ বিরোধি আন্দোলনের চিঠি আদান প্রদানের বাহক হিসাবে ভুলু বাবু নারায়গঞ্জ শহরে কাজ করে যাবেন। কিন্তু সেই চিঠি সঠিক সময়ে, সঠিক ঠিকানায় কি ভাবে পৌঁছাবে এ নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান ভুলু বাবু। কিভাবে এর সমাধান করা যায়?

বোস কেবিনের বিখ্যাত কাটলেট। ছবি: লেখক

যে ভাবা সেই কাজ। নারায়ণগঞ্জ ১ ও ২ নম্বর রেল গেটের মাঝামাঝি, ফলপট্টির কাছাকাছি রেললাইনের পাশেই ১৯২১ সালে একটি টং ঘর নিয়ে চা নাস্তার দোকানের মাধ্যমে শুরু হয়। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর নামেই রেখে দেন তার রেস্তোরাঁর নাম। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর নামেই রেখে দেন তার রেস্তোরাঁর নাম। সেই বোস কেবিনের প্রতিষ্টাতা নৃপেন চন্দ্র বসু ওরফে ভুলুবাবু ছিলেন আমার দেশের লোক। এখানেও বিক্রমপুর এসে মিশে একাকার। ভুলু বাবুর আদি বাড়ি ছিল বিক্রমপুরের ষোলঘর গ্রাম। জীবিকার সন্ধানে ২০ বছর বয়সে এই প্রাচ্যের ড্যান্ডির শহরে ছুটে আসা। ছোট্ট টংঘর দিয়ে যাত্রা শুরু করে আজ নারায়নগঞ্জ শহরের স্বনামধন্য রেস্তোরা।

আলুর চপ। ছবি: লেখক

সাল ১৯৩৭। নেতাজি নারায়নগঞ্জ গোপনে আসছেন পুলিশের কাছে খবর চলে যায়। প্রস্তুত ছিল পুরো পুলিশ বাহিনী নেতাজিকে আটক করতে। নারায়নগঞ্জ স্টিমার ঘাট এসে নামার সাথেই সাথে গ্রেফতার হন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু। তবুও ন ডড়াই। নির্ভীক, দাম্ভিক সুভাষ হেঁটে যায় থানার পথে পুলিশের সাথে। নেতাজির ভক্ত ভুলু বাবু খবার পাবার মাত্রই তার চায়ের কেটলি নিয়ে ছুটে যান। কড়া ও হালকা লিকারের দুই কেটলি চা বানিয়ে হাজির হন থানায়। ভুলু বাবু জানতেন সুভাষ চন্দ্র বসু কতটা চা ভালোবাসে।

হয়ে যাক চা। ছবি: লেখক

নেতাজি চা পান করে প্রশংসা করলেন, তার আশীর্বাদের হাত বাড়িয়ে দিলেন ভুলু বাবুর মাথায়। সে আশীর্বাদ বিফলে যায়নি। ভুলু বাবুর সেই ছোট্ট চায়ের দোকান সময়ের বিবর্তনে আজও নিউ বোস কেবিন নামে লোকমুখে পরিচিত। দিন দিন খ্যাতি পেতে পেয়ে আজ ভোজনরশিক ও ইতিহাসপ্রেমীদের আড্ডার জায়গা পরিণত হয়েছে নিউ বোস কেবিন।

ইতিহাসের জগৎ থেকে ফিরলাম বাস্তবে। শহর কাজ সারতে সারতে প্রায় বিকাল হয়ে গেল। এ শহরে ট্যুরমেট নাজিম রাব্বির অফিস। তাকে ফোন দিলাম। সে আসার পর দুই ভাই মিলে রওনা হলাম বোস কেবিনের উদ্দেশে। স্টিমার ঘাটের সেই বিখ্যাত বোস কেবিনের সামনে এসে ফুটফাট কিছু ছবি তুলে নিলাম। এবার ভিতরে প্রবেশ করলাম। এক রাশ ইতিহাস যেন আমায় জড়িয়ে ধরলো। এই কেবিনে পদধুলি পড়েছে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মতো নেতার। সৈয়দ শামসুল হকের মত সাহিত্যিকও এসেছেন এ রেস্তোরাঁয়। এখানে আড্ডা আর খাওয়া দুটোই চলে সমান তালে।

বোস কেবিনের পুরানো কর্মচারির সাথে রাব্বি ভাই

তবে আগের শ্রী যেন কিছুটা হারিয়েছে বোস কেবিন। কেমন বিষণ্ণ মনমরা পরিবেশ। ভিতরে বসে এক নজর দেখে নিলাম এর আদিমতা। চেয়ার টেবিল গুলো যেন সেই আগের ধাচেই আছে শুধু মানুষ গুলো বদলে গেছে। চেয়ার দখল করেছে নতুন প্রজন্ম। তবু থেমে যায়নি বোস কেবিনের আড্ডা। ওয়েটার অর্ডার নিতে আসলো। সে ও বড় প্রাচীন। ৪০ বছর যে হয়ে গেল তার চাকুরির বয়স। ডিম চপ, কাটলেট এর অর্ডার দিলাম। এত ভিড়ের মাঝে হুড়মুড়িয়ে এসে পড়লো। বাহ তোফা স্বাদ। সন্ধ্যাকালীন নাস্তা আর আড্ডা দুটোই চলছে আর সাথে চলছে কড়া লিকারের চা। লিকার চা এর স্বাদ নেবার পর দুধ চা খেয়ে গুলি করার খায়েশ জাগলো। কত গল্প কত রহস্য না লুকিয়ে আছে এই কেবিন কে ঘিরে। সে রহস্য না হয় আর একদিন অন্বেষণ করা যাবে। ধুয়া উঠা চায়ের সাথে আজকের গল্প এখানেই শেষ হল। তবে যাবার আগে দিয়ে যাই না হয় বোস কেবিনের মেন্যুর লিস্ট।

মেন্যু:

সকালের নাস্তা
পরোটা – ৫ টাকা
ডাল ও হালুয়া – ৮ টাকা।
ডিমের ৬ রকমের পদ।
খাসি ও মুরগির মাংস।

দুপুর ১২টা থেকে পাওয়া যায়
আলুর চপ – ১৫ টাকা।
পোলাও – ৪০ টাকা।
মোরগ পোলাও – ৮০ টাকা।
কারি – ৮০ টাকা।
চিকেন কাটলেট – ৭০ টাকা।

বন্দরের এত কাছে এসে ঘাট না দেখে যাই কি ভাবে। ছবি: লেখক

আর আলাদা করে বলতে কি হবে বোস কেবিনের কড়া লিকারের চায়ের কথা। এখানে সকাল বিকাল রাত সারা দিনই চা পাওয়া যায়। বড় বড় কাপে পরিবেশন করা হয় সেই চা। সাথে দুধ চা তো আছেই। প্রতি কাপ চা ১২টাকা।

খোলার সময়: ৭টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top