fbpx

রেলওয়ের শহর ঈশ্বরদীতে একদিন: হার্ডিঞ্জ ব্রিজ

লাল মসজিদ থেকে অটো ছুটে চলছে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পথে। আগের বার এ পথে এসে ফিরে যেতে হয়েছিল। ব্রিজের কাছে যাবার ভাগ্য হয়নি। এবারও কি হৃদয় ভাঙ্গা গান শুনতে যাচ্ছি হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ তার গল্পটি শত বছর ধরে শুনিয়ে আসছে মানুষের কাছে। প্রাচীন যুগের রূপকথার মত যেন তার লৌহ শরীরে কোন জাদুকর ম্যাজিক স্পেল দিয়ে জীবিত করে তুলেছে। সে এক লৌহ দানব, তার গল্পটি না হয় এই পথিকের পথেই শুনি।

পথিকে চোখে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। ছবি: লেখক

দানবের সাথে শতবর্ষী যাত্রা শুরু হয়েছিল সেই ১৯১৫ সালে। আধুনিক বাংলাদেশের রেলওয়ের শহর পাকশীতে এখনও বুক উঁচু করে যান্ত্রিক ঘর্ষণ সহ্য করে যাচ্ছে এই লৌহ দানব। ১৮৮৯ খ্রিস্টাবে তৎকালীন অবিভক্ত ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকার অসম, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ডের ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ দ্রুততর করার অভিপ্রায়ে পদ্মা নদীর বুক চীরে একটি ব্রিজ নির্মাণের প্রস্তাব উত্থাপিত করে। টানা কুড়ি বছর পর ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে সেতু নির্মাণের জন্য বিল পাসের পর বৃটিশ প্রকৌশলী স্যার রবার্ট গেইলস সেতুটি নির্মাণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

পদ্মার বুক চিড়ে এক লৌহ দানব। ছবি: লেখক

লৌহ দানব নির্মাণের জন্য ১৯০৯ সালে এই পদ্মার বুকে সমীক্ষা শুরু হয়। ১৯১১ সালের ভিতর পদ্মার দুপাড়ে সেতু রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয় স্যার রবার্ট গেইলসের তত্ত্বাবধায়নে। পাশাপাশি সেতুর গার্ডার নির্মাণের জন্য কূপ খনন করা হয়। ২৪ হাজার শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমে দীর্ঘ পাঁচ বছর পর সেতুটি আলোর মুখ দেখতে পায়। তৎকালীন আমলে অবিভক্ত ভারতের ভাইসরয় ছিলেন লর্ড হার্ডিঞ্জ। তার নামনুসারে ব্রিজটি নাম হয় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। সে সময় এই লৌহ দানবের নির্মাণে খরচ হয়েছিল ৩ কোটি ৫১ লক্ষ ৩২ হাজার ১ শত ৬৪ টাকা। ৫,৮০০ ফুট দৈর্ঘ্যের এই ব্রিজে স্পান ছিল ১৫টি।

স্বপ্ন পেল বাস্তবতার স্পর্শ। ছবি: লেখক

কেন সে লৌহ দানব। সে যে তার বুকে বয়ে বেড়াচ্ছে একাত্তরের ক্ষত। সারা দেশে তখন লাল সবুজের পতাকা উড়ছিল। বিজয়ের শেষ দারপ্রান্তে এসে ঈশ্বরদি সম্মুখিন হল এক প্রতিরোধ যুদ্ধের। ১৪ই ডিসেম্বর ঈশ্বরদি জুড়ে তখনো চলছিল যুদ্ধের প্রস্তুতি। এরই মধ্যে খবর আসে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালাতে শুরু করেছে পাক সেনারা, পালিয়ে পাকশি হার্ডিঞ্জ ব্রিজ হয়ে ইশ্বরদি দিকে আসছে। দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তুলে মিত্র বাহিনী। পাক সেনাদের আত্মসমর্পণের আহবান জানালে তারা সে কথায় কর্ণপাত না করে গুলি ছুড়তে লাগলো। পালটা আক্রমণের এক পর্যায়ে মিত্র বাহিনীর পাঁচটি বিমান থেকে চার/পাঁচটা বোমের আঘাতে উড়িয়ে দেয়া হয় হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ১২ নাম্বার স্পান। পাকিস্তানি সেনারা উপায় না দেখে পালিয়ে যেতে শুরু করে পাকশি থেকে।

চল হারিয়ে যাই। ছবি: লেখক

স্বাধীনতা পরে মেরামত করা হয় ১২ নাম্বার স্পানটি। এক গৌরবময় ইতিহাসের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। আর যাচ্ছি আমরা সেই হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পথেই। দেখতে দেখতে চলে এলাম হার্ডিঞ্জ ব্রিজের সামনে। আগের বার দূর থেকে দেখেই চোখকে শান্ত করতে হয়েছিল। এবার কি কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হবে। আমাদের অটো নামিয়ে দিল একেবারে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে। সামনে দেখা যাচ্ছে চর আর পদ্মা নদী। আমরা ব্রিজে উঠার সিড়ির কাছে বেড়ার মত দেখলাম। আশেপাশে কোন মানুষজন নেই। সাতপাঁচ না ভেবে উঠে পড়লাম ব্রিজের সিড়ি ধরে একেবারে উপরে।

চল আর একবার হারাই। ছবি: কায়েস আহমেদ

সূর্যটা ঠিক মাথার উপর। শরতের আকাশে আজ মেঘের ভেলা। মৃদু রোদের উমে দূরে দেখা যাচ্ছে সেই হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। কিন্তু সেখানে যেতে হলে তো পারি দিতে হবে সিকিউরিটি। সিকিউরিটি রুমে বসে আছে আনসারের এক তরুণ সদস্য। তার কাছে গিয়ে বললাম আমরা ঢাকা থেকে এসেছি যদি সামনের দিকে যাবার অনুমতি পাওয়া যায় ধন্য হতাম। আনসার সদস্য অনেক গাইগুই করা শুরু করলো। তবে পৃথিবীতে ভালোবাসার অত্যাচার থেকে বড় অত্যাচার হতে পারে না। সে অত্যাচারে সেই তরুণের পাথর মনও গলে গেল। মামা বলে উঠলো, ‘ঠিক আছে যান। ঘড়ি দেখে ঠিক দশ মিনিট থাকতে পারবেন। আমি বাশি বাজানো শুরু করলে চলে আসবেন।’

হারিয়ে যায় লেন, অপেক্ষা করেনি বনলতা সেন। ছবি: লেখক

স্বপ্ন যে আজ সত্যি হতে যাচ্ছে। দূরের সেই হার্ডিঞ্জ এখন কত কাছে। এই লৌহ দানব যে বিশ্ব সিভিল ইঞ্জনিয়ারিং জগতের সপ্ত আশ্চর্য। ফাউন্ডেশনের গভীরতার দিক থেকে এই ব্রিজটি এক বিশ্বের বিষ্ময় বটে। এই ব্রিজের ফাউন্ডেশনের গভীরতা ১৬০ ফিট। এত বেশি ফাউন্ডেশন দিয়ে পৃথিবীর আর কোন ব্রিজ বানানোর নজির নাই। আর এ ব্রিজ বাংলাদেশের ডাবল লাইনের একমাত্র সেতুও বটে।

স্বপ্ন হল সত্যি। ছবি: কায়েস আহমেদ

ফুরফুরে হাওয়ায় আজ লোহার গন্ধ। মরীচিকা পড়া সেই গন্ধ যেন ইতিহাসের সুবাস নিয়ে এসেছে পরিব্রাজকের পথে। ওয়াফি, কায়েস ভাই ছবি তুলতে ব্যস্ত আর আমি হার্ডিঞ্জ ব্রিজে সৌন্দর্য্যে ডুবে যেতে ব্যস্ত। এই লৌহ দানব কে যতবার দেখি ততবারই মন ভরে যায়। ব্রিটিশ সরকার দাম্ভিকতার সাথে বলেছিল ১০০ বছরেও এই সেতুর কিছু হবে না। সে হিসাবে ১৯১২ সালে নির্মিত এই সেতুর ওয়ারেন্টি গ্যারান্টি অনেক আগেই শেষ। এরপরও চলে যাচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেলওয়ে সেতু। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পাশেই আধুনিক লালন শাহ সেতু। আর দুই সেতুর মাঝ দিয়ে বয়ে প্রমত্তা পদ্মা। যদিও চর পড়ে ছোট হয়ে গেছে নদী তবুও দু’পাড়ের সবুজ ঘেরা মনোরম পরিবেশে একটি ক্লান্ত বিকাল খুব একটা খারাপ কাটবে না। এপারে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ওপারে পাবনার ঈশ্বরদী। একটু পরে বাশির শব্দ কানে গেল। সময় যেন দেখতে দেখতে ফুরিয়ে গেল। তবে ফুরিয়ে যায়নি সফরের গল্প।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top