fbpx

রেলওয়ের শহর ঈশ্বরদীতে একদিন: লাল মসজিদ

প্রধান সড়কে আসার পর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ যাবার উদ্দেশে অটো ঠিক করলাম। অটো চলছে মৃদু মন্দ হাওয়ায় হারিয়ে যাই দূরের অজানা গন্তব্যে। বাংলার মাঠ-ঘাট প্রকৃতি জলে হারাইয়া তাহার মাঝে খুঁজি তল। তবে সে তল খুঁজতে গিয়ে এই রকম ভুইফোড়ের মত সবুজের মাঝে লাল মসজিদের বিশাল সুউচ্চ গম্বুজটি দেখে ফেলবো কে জানতো। আধুনিক মসজিদে এ রকম মোগল স্থাপত্য রীতি অনুসারে ঢাউস সাইজের গম্বুজ শেষ কবে দেখেছি মনে নেই। যেন দূর থেকে লাল তাজ আমাদের চুম্বকের মত আর্কষণ করছে। সেই আর্কষণে মোহিত হতে অটো তার পথ ঘুরে চলে গেল মসজিদের সিংহদুয়ারে। মসজিদের গেটের সামনে অটো থামার পর আমরা নেমে পড়লাম।

মসজিদের ঢোকার পূর্বেই দেয়ালে ফুরফুরা শরীফ জামে মসজিদ লেখাটি চোখে পড়লো। দুকদম পা ফেলে সামনেই দেখতে পেলাম সেই বিশাল আকৃতির সুউচ্চ গম্বুজওয়ালা মসজিদটি। এত অপূর্ব এর নির্মাণশৈলী বার বার তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়। চোখ যেন সরছে না। মসজিদটি মোগল আমলে নির্মিত না হলেও এর স্থাপত্য শৈলীতে মোগল রীতির ছাপ রয়ে গেছে। আমাদের কায়েস ভাই নামাজি মানুষ। কোন সুন্দর মসজিদ দেখলে তার দু রাকাত নফল নামাজ আদায় না করলে আত্মার শান্তি পায় না। যথারীতি সে ওজু করে মসজিদে প্রবেশ করলো আর আমরা বাহিরে আশেপাশে ঘুরে দেখছি।

আকাশের মাঝে বাঁধিছে আল্লাহ’র ঘর। ছবি: লেখক

মসজিদের চারপাশে চারটি মিনার ও মাঝখানে বিশাল গম্বুজ। তিন তলাবিশিষ্ট এই মসজিদের গায়ে ফ্যাকশে যাওয়া লাল রঙ। মিনারগুলো আকাশী স্পর্শে সাদা গম্বুজের সাথে মিলে মিশে যেন এক সাথে আকাশ দেখতে চায়। দূর থেকে মসজিদটি দেখলে পথিকের বিভ্রম হওয়াটা স্বাভাবিক। এর বিশালতা যেন আকাশ ছুই ছুই হয়ে শোনায় আধুনিকায়নের স্থাপত্য গল্প। এ রকম সুন্দর স্থাপত্য ইট পাথরের শহরে আজকাল বিরল হয়ে গেছে।

মসজিদের ঠিক সামনের একটি বাস ভবন দেখতে পেলাম। সাইনবোর্ড লেখা হজরত মাওলানা আবু নসর মোহাম্মদ সওবান সিদ্দিকী বাসভবন। পরিলক্ষিত করলাম এটি মাদ্রাসা কাম লিল্লাহ বোর্ডিং। একজন ছাত্রের সাথে কথা বলে ধারনা পেলাম এই মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে দাওরা হাদিস পর্যন্ত পড়ানো হয়। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসে শুধু আশিকের হৃদয়ে আগুন লাগে না এখানেও ফাল্গুন মাসের প্রথম বুধবার মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে আয়োজিত হয় ‘ইসালে সওয়াব’ অনুষ্ঠান। পাশ্ববর্তী জেলাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের জমায়েত হয় এখানে। ভারত থেকেও আসে অনেক আল্লাহর বান্দা। এছাড়া এখানে বছরে দুই বার ওয়াজ মাহফিল হয় বটে।

কাবার মত উঁচু মঞ্চ। ছবি: লেখক

মসজিদের পাশে কাবা শরীফের আদলে একটা বড় স্টেজ। এখানেই প্রতি বছর অনুষ্ঠানের মঞ্চ তৈরি করা হয় জানতে পারলাম সেই ছাত্রের কাছ থেকে। স্টেজের পাশেই আছে একটি গম্বুজওয়ালা লাইব্রেরি যাকে এখানকার ছেলেরা কুতুবখানা বলে।একটু ঘুরে একটা বড় হাউজের সামনে এসে পড়লাম। চারপাশে বসার স্থান ইঙ্গিত দেয় ওযুখানা। ওযুখানার পাশেই একটা কুয়া রয়েছে। সেখান থেকে পানি তুলে গোসল করছে মাদ্রাসার ছাত্ররা।

লাইব্রেরির সামনে গিয়ে একটি ব্যানার দেখতে পেলাম। সেখানে লেখা ফুরফুরা দরবারে লিখিত সকল কেতাব পাওয়া যায়। সকল মানুষের জন্য লাইব্রেরিটি উন্মুক্ত। ইচ্ছা করলে আপনি সেখানে পড়তে পারবেন আবার বই কিনে নিয়ে আসতে পারবেন। এভাবেই তো জ্ঞানের চর্চা ছড়িয়ে পড়ছে ধর্ম প্রাণ মুসল্লিদের ভিতর। ইসলামি জ্ঞান তো সর্বশ্রেষ্ট জ্ঞান। জ্ঞান অর্জনের জন্য সকল বাঁধা পেড়িয়ে যেতে হবে।

লাইব্রেরি ঘর। ছবি: লেখক

লাইব্রেরির সামনের দিকে দুইটি সুউচ্চ মাদ্রাসা ভবন। এই মাদ্রাসা ভবনের সাথে লাগোয়া মূল ফটকে আমরা অটো রেখে এসেছিলাম। একটা সুন্দর স্পিরিচুয়াল পরিভ্রমণ শেষে মনটা আবার চনমনে হয়ে গেল। ঈশ্বরদির বুকে যে এমন স্থাপত্য থাকতে পারে কে ভাবতে পারে।

তাই তো পথিকের পথেই রোমাঞ্চ। ফটকেরর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন দুজন মাদ্রাসার শিক্ষক। আমাদের দেখে কুশল বিনিময় করলো এবং মসজিদের ইতিহাস নিয়ে আরও কিছু বললো। এই মসজিদ নির্মাণে ফুরফুরা শরীফের এক হুজুরের অবদানের কথাও বললো। বর্তমানে এই মসজিদ ও মাদ্রাসা ফুরফুরা শরীফ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ফুর ফুরা শরীফ পশ্চিম বঙ্গের হুগলি জেলায় অবস্থিত একটি মাজারের নাম।

পথিকের চোখে মসজিদ। ছবি: লেখক

এটি মূলত হযরত মওলানা শাহ্ সূফী আবু বকর সিদ্দিকী রহমাতুল্লাহি আলাইহির মাজার। এই পীর উপমহাদেশে বেশ পরিচিত এক নাম। বাপ দাদার মুখে শুনেনি এই পীরের নাম খুব কম লোকই হয়তো পাওয়া যাবে। সেই পীরের মুরিদগণ দ্বারাই এখন পরিচালিত হয় ফুরফুরা দরবার শরীফ। আর উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটয়ে আছে ফুরফুরা শরীফ নিয়ন্ত্রিত মসজিদ মাদ্রাসা।

এই সেই ভুইফোড় গম্বুজ। ছবি: লেখক

আমরা আছি এখন পাকশি ইউনিয়নে। রেলের শহর ঈশ্বরদি। আর এই ঈশ্বরদি বুকে পদ্মার রূপসী কন্যা আমাদের পাকশী। এই পাকশীতে আছে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ আর পাশে লালন শাহ সেতু ও পাকশী রেল স্টেশনের কথাও বাদ যাবে কেন।

পাকশী হতে পারতো পর্যটনের জন্য এক আধুনিক শহর। এখানে কি নেই। এর রূপবৈচিত্র্য, এর বৃক্ষরাজি সবই এক সমৃদ্ধ পর্যটনের সুবাস দেয়। তবে শরতের বাতাসে ছাতিম ফুলের সুবাসে পাকশী আমাদের আমন্ত্রন জানাচ্ছে তাকে নতুন করে আবিষ্কার করতে। এখানে অরণ্য নেই কিন্তু আছে বৃক্ষরাজি, নেই কোন হিংস প্রাণী তব আছে পাখিদের কলতান, পাহাড়ি পথ নেই কিন্তু আছে উঁচু টিলার উপর অবস্থিত পাকশী রেল স্টেশন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top