fbpx

রেলওয়ের শহর ঈশ্বরদীতে একদিন: বিষণ্ন জংশন

ভ্রমণ পিপাসু মনটা যেন অদ্ভূত এক নয়টা-পাঁচটা জীবনের বৃত্তের খাচায় বন্দি। সময় পেলেই যেন ছুটে চলে যেতে চায়। কুরবানি ঈদের বন্ধে সেই বের হইছে দীর্ঘ দুই সপ্তাহের বিরতিতে মনটা যেন হাসফাস করছে। আমার অস্থিরতার টনিক হয়েই যেন আসলো ওয়াফি। সদা অস্থির ওয়াফি ভাল্লুক মানব থেকে হ্যান্ডসাম মানবে পরিণত হয়েছে। তবে অস্থিরতা এক বিন্দুও কমেনি। সে অস্থিরতার ছিটেফোঁটা স্পর্শ দিতেই যেন বার বার চলে আসে।

সপ্তাহের মাঝে হঠাৎ ওয়াফির ফোন দেখে পুলকিত হলাম। ফোন ধরার পর ওয়াফি কুশল বিনিময়ের পর তার আসল কথা ফিরে এল। আশিক ভাই এই শুক্রবার তো বন্ধ। চলেন বন্ধে কোথাও যাই। প্ল্যান ছিল শেরপুর-জামালপুর যাব সেই প্ল্যান প্লেন হয়ে উড়ে গেলেও, ব্যাক আপ প্ল্যান হিসাবে ঈশ্বরদী-পাবনা প্ল্যানটা ভণ্ডুল হল না। যে কথা সে কাজ। ৫ সেপ্টেম্বর রাতে শুরু হল আমাদের ঈশ্বরদীর যাত্রার। শেষ মুহূর্তে কায়েস ভাইয়ের সংযোজন ট্যুরে দিয়েছিল ভিন্ন মাত্রার আনন্দ। তা না হয় সামনের জন্য জমিয়ে রাখলাম।

স্বাগতম ঈশ্বরদী জংশন। ছবি: লেখক

শাহজাদপুর এক্সপ্রেস ছিল আমাদের বাস। সেই পুরান আমলে হিনো মডেল। যেন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে খেলা দেখানোর জন্য বসে ছিল। তবে জ্যাম আর আধুনিক দানবের দাপটে সর্বশক্তি দিয়েও কুলাতে পারলো না। বারটা বাজে রওনা দিয়েছিলাম ঢাকা থেকে। আমাদের ঈশ্বরদী নামিয়ে দিল ঠিক সকাল আটটা বাজে।

ভোর হয়ে বহু আগে দোকানের দ্বার সব খুলে গেছে। সকালের নাস্তা সেরে নিলাম বাস স্ট্যান্ডের পাসের হোটেল থেকে। এবার শুধু ছুটে চলা। প্রথম গন্তব্য ঈশ্বরদী জংশন। শত বৎসরি রেলওয়ে স্টেশন ইশ্বরদী জংশন। রেলের সাথে সংযুক্ত আছে ইয়ার্ড। প্রাচীন এই রেল স্টেশনে ধুকে ধুকে হয়তো আমাদের ইতিহাসের কাব্য শুনাতেই বসে ছিলেন।

পাখির চোখে ঈশ্বরদী জংশন। ছবি: লেখক

১৮৬২ সালে ব্রিটিশরাজের সময় বঙ্গের এই প্রান্তের সাথে ওপ্রান্ত থেকে সারা ভারতের ট্রেন চলাচল শুরু হয়। সে সময় পাকশীর পাশে পদ্মা নদীর সাঁড়া ঘাটে ছিল রেল স্টেশন। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নির্মাণ শুরু হবার পর এ অঞ্চলে নতুন রেলওয়ে স্টেশনের প্রয়োজনীয়তা নতুন ভাবে অনুভব হয়। ১৯১৫ সালে নির্মাণ শেষ হল এক লৌহ দানবের।

যার বুকে একাত্তরের পাক হানাদার বাহিনীর আঘাত বয়ে নিয়ে যাচ্ছে তবুও এক বিন্দু তার জায়গা থেকে টলেনি লৌহ দানব। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নির্মাণ কাজ শেষ হবার পর দেশের উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য নির্মিত হয় ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন। ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই জংশনের বুক দিয়ে চলে গেছে ১৭টি রেল লাইন। এরপর পারি দিয়ে ফেললো ১০০টি বছর। তবুও ঈশ্বরদী জংশন রয়ে গেছে আদি ও অকৃত্রিম। বাংলাদেশ রেলওয়ের এক অমূল্য সম্পদ ঈশ্বরদী জংশন।

লাল, হলুদের মাঝে সবুজ। ছবি: লেখক

আমাদের অটো ঈশ্বরদী জংশনের সামনে নামিয়ে দিল৷ জংশন ঢোকার গেট দিয়ে ঢুকে একটা ওভার ব্রিজ দেখতে পেলাম। জীবন যেখানে যেভাবে নিয়ে যায় আমরাও জনস্রোতের সাথে সেভাবেই ওভারব্রিজের উপর উঠে গেলাম৷ রেলস্টেশনগুলো যেন একটা প্রবাহমানের জীবনের গল্প বয়ে বেড়ায়৷ সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে রেলওয়ে জংশন তো গল্পের ডিপো৷ গল্প গুলো ধরতে পাখির চোখ থাকতে হবে। কানের সামনে ফিসফিসিয়ে কে জানি শুনিয়ে যায় গল্প৷ সেই গল্পের ঝুলি অল্পতে যে কমা দাড়ি টানতে চায় না৷

প্ল্যাটফর্ম নাম্বার ৩। ছবি: লেখক

ওভার ব্রিজের উপর থেকে অবলোকন করছি ঈশ্বরদি জংশন। একপাশে সবুজের গান গায় বৃক্ষরাজি আর এক পাশে রেল মাস্টারের সেই পুরানো লাল বিল্ডিং। এর মাঝেই তার গল্প শুনিয়ে যায় ঈশ্বরদি জংশন৷ খুব অবাক লাগে না একটি জংশন গল্প শোনায় কিভাবে৷ জংশনের প্রতিটি প্ল্যাটফর্মে যে লুকিয়ে আছে মানুষেত গল্প। সে না হয় নিচে নামলেই শুনবো৷ যত দূর চোখে যায় শুধু রেল লাইন। পাশাপাশি ছয়টি রেল লাইনের মধ্যে প্ল্যাটরফর্মের সাথে লাগায়ো লাইনে আন্তঃনগর ট্রেনের সেই সবুজ বগির লাইন দেখতে পেলাম৷ হয়তো যাত্রীর অপেক্ষা বসে আছে ট্রেন৷ আর এক লাইনে লাল বগি। মালবাহি কোন ট্রেনের বগি হয়তো এখন নির্জিব হয়ে পড়ে আছে৷

কর্ম ব্যস্ত জংশন। ছবি: লেখক

দূর থেকে কুউ-উ-উ ঝিক ঝিক শব্দ শোনা যায় যেন৷ ওই তো দূরে যেন এক চিলতে ট্রেনের ঝলক দেখতে পেলাম। লেখকের কল্পনা যেন ব্রিটিশরাজের সময়ের পরিভ্রমণে ব্যস্ত৷ সেই ধোঁয়া উঠা ইঞ্জিন, তার শিস, লাল কাপড় ওড়াচ্ছে ইঞ্জিন মাস্টার৷ কিন্তু সেই অপু দূর্গার রেল দেখার যুগ যে আজ আর নেই৷ তাই কুউ-উ-উ ঝিক ঝিক শুধু রূপক৷ তবুও প্ল্যাটফর্মে আসে ট্রেন, রেখে জীবনের সব লেনদেন৷ তবুও কবিতার মতো ট্রেনের হুইসেল ধোঁয়ার কুন্ডলি পাকিয়ে নিয়ে যায় সেই কয়লার ইঞ্জিনের সময়৷ ট্রেন যেন আধুনিক সভ্যতার সাথে শিল্প হয়ে মিশে গেছে৷

বিচ্ছিন্ন বগি। ছবি: লেখক

রেলের আধুনিকায়ন সভ্যতার কথা কয়, তবে এত আধুনিকায়নের পরও নতুন রেল লাইন গড়ে না উঠায় কবি নিরব রয়৷ হ্যাঁ আর একটা আন্তঃনগর ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ভিড়লো৷ এবার না হয় ওভার ব্রিজ থেকে নিচে নেমে ঈশ্বরদি জংশনের গল্প শুনি, শোনাই পাঠকদের এক বিষণ্ন জংশনের গল্প৷ সিড়ি দিয়ে নামছি দেখতে পেলাম একটি নীল সাইনবোর্ড৷ স্বাগতম ঈশ্বরদী জংশন। ডানে প্ল্যাটফর্ম নাম্বার তিন বামে চার নাম্বার প্ল্যাটফর্ম। নেমে আমরা ডান দিকে গেলাম৷

হলুদ মেশিন। ছবি: লেখক

প্ল্যাটফর্ম তিনে দাঁড়িয়ে আছে ইন্টার সিটি ট্রেন৷ কায়েস ভাই ডিএসএলআর হাতে হালকা মুডে আছে৷ ঠুসঠাস করে তুলছেন ছবির কাব্য, পিছে ওয়াফি হারিয়ে গেছে খাদ্যের গদ্যে৷ ভাল্লুক মানব থেকে পেটাদেহের মানবে পরিণত হলেও তার পাপী পেটে দানা না পড়লে বিদ্রোহ করে বসে৷ উপরে টিনের ছাদ, ছাদ থেকে শূণ্যে ঝুলে আছে ডিজিটাল সাইনবোর্ড। Platform 3 লাল বর্ণে জ্বলজ্বল করছে, সাইনবোর্ডের সাথে লাগোয়া ইট সিমেন্টের তৈরি রাউন্ড বেঞ্চে বসার ব্যবস্থা আছে। সেই বেঞ্চে বসে ছিল রেলওয়ের কর্মচারিবৃন্দ।

তাদের সাদা ইউনিফর্ম দেখলেই বুঝা যায় তার বেশ মুডে আছে৷ পাশে কোন বিষণ্ন মানব সিগারেটে কষে টান দিচ্ছিলো, তারই মাঝে পর্দা ফুড়ে হাজির হল যেন নীল ব্লেজার পড়া এক লোক৷ গোল বেঞ্চের সাথে একটা ফেস্টুন দেখতে পেলাম। ১৫ আগস্টের শোক পালন করেও ফেস্টুন সরানো হয়নি। সাইনবোর্ডের লালের সাথে এক প্রবাদ পুরুষের রক্ত লাল মিশে গেছে৷ কি অপূর্ব জীবনের রং। লাল, নীল, সাদার মাঝেও বিষণ্নতার স্পর্শ। প্রিয় বঙ্গবন্ধু এভাবেই এখন আপনি পণ্যে রূপান্তর হয়েছেন। যে যার ইচ্ছা মত আপনাক্র ব্যবহার করে৷

ট্রেন লাইন ধরে হেটে যায় পথিক। ছবি: কায়েস আহমেদ

জংশনের ক্যান্টিন ক্রস করার সময় ভিতরে চেয়ে দেখলাম। কোন পরিবর্তন যেন নেই, নাকি সে পরিবর্তিত হতে চায় না। সেই ৮০ দশকে পড়ে আছে তার বয়স। জায়গায় জায়গায় রং চল্টা উঠে গিয়েছে, পানের পিক দাগ আপনাকে নস্টালজিক করতে পারে যদি জন্ম ৮০ দশকের শুরুতে হয়৷ আর কিছুটা দূরে এগিয়ে ট্রেনের ভাড়া কোন সময় কোন ট্রেন ছেড়ে যাব তার একটা চার্ট দেখতে পেলাম। জংশনে বসেছে হরেক ধরণের ফেরিওয়ালা তাঁদের স্বপ্ন লেনাদেনার ব্রাত্য নিয়ে৷ স্বপ্ন তো তখনই বাড়ি যাবে যখন পণ্যের পসরা পথিকের হাতে উঠবে, পকেট থেকে টাকা খসবে যাত্রীর৷ রুটি, কলা থেকে শুরু করে চা সিগারেট এমন কিছু বাদ নেই যা পাওয়া যাবে না জংশনে৷ ইন্টার সিটি ট্রেন থেমেছে স্বপ্নের ফেরিওয়ালারাও তাঁদের স্বপ্ন বিক্রির আশায় ট্রেনের জানলার ধারে পণ্যের পসরা নিয়ে ছুটে যাচ্ছে৷ কেউ ভিতরে কেউ বাহিরে৷ এভাবেই তো অপূর্ব জীবনবোধের গল্প তৈরি হয়৷

সাপের মত আঁকাবাঁকা লাইন। ছবি: লেখক

প্ল্যাটফর্ম তিন থেকে হেঁটে শেষ মাথায় এসে ঈশ্বরদী জংশনের বিরাট বড় ফলক দেখতে পেলাম৷ সাদার মধ্যে বড় বড় কালো অক্ষরে লেখা ঈশ্বরদী জংশন। নিচে ছোট করে লেখা আমনুরা ও সিরাজগঞ্জ বাজার যাইতে গাড়ি বদল করুন। এখানে এসেই থেমে গেল ছবিয়াল কবির পথ৷ না ছবি তুললে তো পাপ হবে৷ আর সেই পাপে পাপী হতে চায় না ওয়াফি আহমেদ৷ না ছন্দে দুলে আনন্দে ছবি তুলছে সে৷ আর আমি দেখতে পারছি এই লাইন ধরে পথের শেষ হয়েছে একেবারে প্রধান সড়কে গিয়ে৷

ছবি তোলার পর্ব শেষে রেল লাইন ধরে হাঁটা শুরু করলাম। একেবেকে চলে গেছে রেল লাইন, সামনে দেখা যাচ্ছে কৃষ্ণচূড়া গাছ৷ লাল ফুল ফুটেছে গোটা কয়েক৷ সবুজের মাঝে লাল থোকা যেন রক্তাক্ত ইতিহাসের কথা কয়৷ ঈশ্বরদী মুক্তিযুদ্ধের সময় বেশ গুরত্বপূর্ণ জায়গা ছিল৷ হেঁটে যাচ্ছি আমরা সামনে পিছনে ফেলে ঈশ্বরদী জংশন৷ তবে এই হেঁটে যাওয়া তো শেষ নয়। নতুন গন্তব্যের শুরুও বলা যায়৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top