fbpx

রেলওয়ের শহর ঈশ্বরদীতে একদিন: পাকশী রেল স্টেশন

আমরা আছি রেলের শহরে। রেল ও ট্রেনের এক আশ্চর্য ভুবনে পরিভ্রমণ না করলে কি হবে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পাশেই তো পাকশী রেল স্টেশন। এবং পাকশী রেল স্টেশন অদ্ভূত স্টেশনও বটে। কারণ এইটি বাংলাদেশের একমাত্র রেল স্টেশন যা সমতল থেকে উচুতে অবস্থিত। অনেকটা পাহাড়ি স্টেশনের স্পর্শ দিয়ে যাবে এই স্টেশন। তবে ইন্ডিয়ান রেলওয়েতে যারা ভ্রমণ করেছে তাদের কাছে এইটা গরীবের পাহাড়ি স্টেশন মনে হলে পাপ হবে না। তবে দুধের স্বাদ তো ঘোলেও মিটে। সেইটা মিটাতে ক্ষতি। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ থেকে হেঁটে চলে এলাম অন্য এক ভুবনে।

উপর থেকে নিচে। ছবি: লেখক

এই ভুবন ভাল লাগার ভুবন, এই ভুবন হারিয়ে যাবার ভুবন। প্রকৃতির সাথে খানিকটা খুনসুটিতে মেতে কিছু সময়ের জন্য এখানে হারিয়ে যেতে নেই মানা। ওয়াফি মনে শিশু ভর করছে, আর এই রোগটা সংক্রমন। আমরাও শিশুপানায় ডুবে গেলাম। স্টেশনের ছায়ানিবিড় পরিবেশে দেখা যাচ্ছে অনেক কপোত-কপোতির দল। কংক্রিটের বেঞ্চগুলো বেওয়ারিশ পড়ে নেই। আমরা একেবারে শেষ মাথায় গিয়ে একটি খালি বেঞ্চের সন্ধ্যান পেলাম। সেখানে বসে দেখতে লাগলাম দূরের সেই হার্ডিঞ্জ ব্রিজ।

সুরঞ্জনারা এভাবেই যুবকের সাথে কথা বলে। ছবি: লেখক

আন্তঃনগর কোন একটা ট্রেন থেমেছে পাকশী রেল স্টেশনে। খানিকটা বিরতি নিয়েই ছেড়ে দিবে। তবে এখানে নেই অন্য স্টেশনের মত কোলাহল। সব যেন কেমন নির্জন। এই স্টেশন নির্জনতার গল্প শোনায়। সেই নির্জনতা ভাষা ভেদ করতে যেন ট্রেন হুইসেল দিয়ে ছেড়ে গেল প্ল্যাটফর্ম থেকে। শত বছরের গল্পগুলো নিজের সাথে নিয়ে যেন ট্রেন ছুটে চলছে। চোখের সামনেই হার্ডিঞ্জ ব্রিজের সেই লোহার সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে হারিয়ে গেল ট্রেনটি। পাকশী রেল স্টেশনে বসে দেখছি দৃশ্যগুলো। হঠাৎ ঝিকঝিক শব্দে হয়তো ছুটে যাবে যেন কোন ট্রেন। লাল টেস্ট টিউবের ভিতর সময়ের পরিভ্রমণে হারিয়ে যাবে সে ট্রেনের যাত্রীরা।

ওয়াফি যখন অর্ধ নগ্ন। ছবি: লেখক

সময়ের পরিভ্রমণ বললে খুব একটা ভুল তো হবে না। এই স্টেশনের বয়স যে একশ বছর পেরিয়ে। চারপাশের সবুজ বৃক্ষরাজির মাঝে চোখে বাজে ব্রিটিশ আমলের সেই ইট সুরকির লাল দালান। স্টেশনটি যে পাকশী রেলওয়ে স্টেশন। অন্য দশটা স্টেশনের মত কেন হবে।

স্টেশনে থেমেছে ট্রেন। ছবি: লেখক

টিকেট কাউন্টার, ওয়েটিং রুমসহ অন্যান্য কক্ষ সমতলে। আর স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম সমতল থেকে ৩০ ফুট উপরে। আঁকাবাঁকা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে পথিকের নজর কাড়বে দুপাশে উঁচু উঁচু গাছ। কংক্রিটের বেঞ্চ যেন বট গাছে নিবিড় ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে। এখানে বসেই কি রাত জাগা প্রহরে দেখা হয় অনন্ত নক্ষত্রবিথী। কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়ার লালিমায় এক গুচ্ছ সবুজের হীম শীতল আহ্বান নিয়ে যেন বসে আছে আজকের প্রহর।

ওয়াফির যখন অনেক ভাব। ছবি: লেখক

এই প্রহরে অর্ধনগ্ন হয়ে সূর্য স্নান করছে তিনটি অদ্ভূত যুবক। ঝিরি ঝিরি হাওয়ায় শোনা যায় শরতের গান। শার্ট খুলে লোমশ বুকে হাওয়া লাগানোর বুদ্ধি অবশ্য ওয়াফি আহমেদের মস্তিক থেকেই বের হয়েছে। পাশের আপুটি ডেট করতে এসে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে গেছে। সারা বাংলাদেশ ডেটিং স্পট বানিয়ে ফেলা আপুরা কবে বুঝবে প্রেমহীন যুবকদের কষ্ট। সে কষ্ট না হয় উহ্য থাকে, বিব্রত বিব্রত কাটাকাটি হয়ে গেছে। এ যেন এক মধুর প্রতিশোধ।

এই তো রেলওয়ে মাস্টারের লাল ভবন। ছবি: কায়েস আহমেদ

পাকশীর বুকে যেন আজ নীল আকাশ নেমে এসেছে। ইচ্ছা করলেই যেন ছুতে পারি বেপরোয়া রৌদ্দুর। মেঘের ভেলায় ভেসে ভেসে দূরে কোথায় যেন চলে যায় মন পবনের ঘুড়ি। যেন আমার আঙ্গিনায় নামতে আজ তাদের নেই মানা। আকাশের সাথে মেঘের মিতালিতে এখনই যেন ঝুপ করে নেমে আসবে বৃষ্টির আহবান। চারদিকে সবুজের মিতালি, পাখিদের কলতান। নিচের দিকে দৃষ্টি যত যায় মনে হয় মখমলের কোন সবুজের চাঁদর বিছিয়ে দিয়েছে প্রকৃতি।

রেলওয়ে ভবন। ছবি: লেখক

নিচের দিকে যত দূর চোখে যায় সবুজ বৃক্ষের সারি, বাতাসের উপর বাতাস, মৃত্তিকার কোলে ঘাস, আর ঘাসের পাশেই ধানক্ষেত। যেন প্রকৃতি শুনাতে চায় কোন অরণ্যের গল্প। তবে এই আধুনিকায়নের যুগে ছিটেফোঁটা অরণ্য পিচ ঢালার রাস্তার সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়।

ভাবে আছি। ছবি: কায়েস আহমেদ

দূরের  প্রমত্তা পদ্মা নদী থেকে আসা ঝিরিঝিরি হাওয়া শীতল পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে। বট গাছের ছায়ায় বসে প্রেমিক যুগল কি তাই বেধেছে বাসা এই স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। পদ্মা পাড়ের সুখ দুঃখের গল্পের ছবির কিছুটা যেন নিজ বুকে বেঁধে রেখেছে পাকশী রেল স্টেশন। দূরের ঐ হার্ডিঞ্জ ব্রিজে আবার দেখা যাচ্ছে ট্রেনের আনাগোনা। লাল রঙা বুক চিরে ছুটে আসছে সবুজ ট্রেন। যেন আমার বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।

আনন্দে আছে লেখক। ছবি: কায়েস আহমেদ

কতটা সময় পাকশী রেল স্টেশনে বসে আছি সে হিসাব আর রাখা হয়নি। প্রকৃতির এই মন মাতানো দিনে মনে পড়ে যায় এক পদ্মা পাড়ের কন্যার কথা। সে কন্যার বাড়িও পাবনা। তার চুলের ভাজেই কি পদ্মার স্রোতের মত ঢেউ খেলা করে। অবচেতন মনে কতটা আমার হৃদয় দখল করেছে সেই কন্যা। সে কি ছোট্ট পরী, সে কি কোন দিন বড় হবে না। তার বয়স কি আঠারোতেই থেমে গেছে। এই সব কাব্যিক ভাবালুতার মাঝে বেরশিক ওয়াফি আহমেদের হেড়ে গলায় ধ্যান ভাঙ্গলো। খানিকটা বিরক্ত হলে ধ্যান ভাঙ্গা জরুরি ছিল। যাযাবরের জীবনই তো পথের সন্ধানে। যাযাবর পথেই নিজের ভুবন গড়ে। জীবনানন্দ দাশ লিখেছিল নাটোরের বনলতা সেনকে নিয়ে। আমি তাকে কোথায় পাব। আমার হৃদ মাঝারে ঘাস, সেখানে পাবনার সাইয়েদা হোসেনের বাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top