fbpx

বন্য সুন্দরী হাম হামের পথে: পথের হল শেষ

এতক্ষণ যত প্যাচাল পাড়লাম ইহা ছিল ফিল্মের ট্রেইলার। আসল ফিল্ম তো মাত্র শুরু হল। ঝর্ণার যৌবন হচ্ছে বর্ষাকাল। বর্ষাকালে ঝর্ণাগুলো যেমন পূর্ণযৌবন পায়৷ সেই সাথে ট্রেইলগুলো হয়ে যায় জোকের ঘরবাড়ি। হাম হাম ঝর্ণা দেখতে এসে জোকের কামড় না খাওয়া অনেকটা স্বপ্ন বিলাশের মত। পুরা রাস্তায় জোকের কামড় খেতে খেতে সম্মানিত পর্যটকগণ ভারতনাট্যম শুরু করে দিল। তাদের সাথে আনা বিরিয়ানির প্যাকেটগুলোও নাচের তালে তালে কাব্যিক ছন্দে এপাশ ওপাশ করছে৷

আগের রাতে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে পুরো ট্রেইলে দই সেমাইয়ের মত থকথকে কাদা দিয়ে ভরে গেছে। ভয়াবহ অবস্থা। কোন অবস্থায় নিজেকে ব্যালেন্স করতে পারছি না। ভাল গ্রিপের স্যান্ডেলে পড়ে এসেও গ্রিপ ধরছে না। আছারের পর আছার খেতে লাগলাম। পরপর তিন বার আছার খাওয়ার পর ভাবতে লাগলাম এই ৯২ কেজির নধরকান্তি দেহ নিয়ে আমার হাম হাম আসার আগে ৯২ বার চিন্তা করা উচিত ছিল।

যাত্রার হল শুরু। ছবি: ঈসমাইল ভাই

আমাদের সাথে দুজন আমেরিকান দম্পতি গাইডসহ এসেছিল৷ গাইডের কি বলিহারি। এই দূর্গম বন্ধুর পথেও সে প্রফেশনালিজম ধরে রেখেছে। ধবে ধবে সাদা শার্টে কাদা যেন চাদের কলংক সাথে কালা প্যান্টালুনের সাথে কালো পাম্প সু। উনি ব্রিফিং দিচ্ছেন আর আছাড় খাচ্ছেন, আছাড় খাচ্ছেন আর ব্রিফিং দিচ্ছেন। সব চেয়ে অবাক করা বিষয় এত অত্যাধুনিক ট্রেকিং বুট থাকার পরও বিদেশীনি বার বার আছার খাচ্ছে আমি কি ছাই৷

পুরা ট্রেইলে কমবেশি সবাইকে জোকে ধরেছে আমাকে ধরলো সাতটা। লাকি সেভেন খারাপ না। আমাদের সাথে একটা এলিয়েন গিয়েছিল। ঈসমাইল ভাইয়ের কর্মচারী প্রতিবার আমাদের জোক ধরে লবন দেওয়া তো দুরের কথা হাত দিয়ে টেনে জোক ফেলে দিচ্ছে। সত্যি বলতে এত অ্যাডভেঞ্চারস, এক্সসাইটিং আর এনজয়েবল ট্যুর হবে কল্পনা করতে পারিনি।

এই সেই খাঁড়া মোকাম টিলা। ছবি: লেখক

দুপাশে সবুজ পাহাড় আর ঘন জংগলের মাঝে আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু পথ ধরে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এর মধ্যে বিরক্তির সৃষ্টি করলো ভয়াবহ বন্য মাছি। কানের কাছে রাগীনি সুর বাজাচ্ছে, সেই তালেই হেঁটে যাচ্ছি অদ্ভূত এই মায়া ভরা পথে। চারিপাশে নাম না জানা গাছাগাছালি, বাশ বনের ফাঁকে ফাঁকে রঙিন ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে প্রজাপতি৷ এর মধ্যে কলা আর ডুমুর গাছ চিনতে পারলাম। কলা গাছের ফাক দিয়ে চশমাপড়া হনুমান আমাদের দিকে দাত কেলিয়ে তাকিয়ে আছে।

তবে পিছে তাকিয়ে একটু অবাক হয়ে গেলাম। আমাদের সাথে দুজোড়া কুকুর হেঁটে হেঁটে আসছে। এরা আমাদের পিছু নিয়েছিল সেই কলাবন পাড়া থেকে। এবং তাদের এই মহাযাত্রার শেষ হয় ঝর্ণার কাছে গিয়ে। প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম এমনেতেই কৌতুহল বশত হয়তো আমাদের সাথে হাঁটছে। তাড়ানোর পরও যায় না। ঝর্ণার টান মনে হয় পৃথিবীর সব প্রাণীকেই আকৃষ্ট করে। কুকুরগুলা বাদ যাবে কেন।

চল ঝিরিতে ভিজাই পশ্চাপদ। ছবি: ঈসমাইল ভাই

অন্য সব পর্যটকের কাছে দাবড়ানী খেয়ে বেচারারা আমাদের টিমের সাথে হাঁটতে থাকলো।পর্যটকপ্রেমী কুকুরও বটে। বড়টা আবার মানুষ ভয় পায় কম। একটু আদর করলেই গলে যায়। ছোটটা ভীতু বেশি। বুনো জংগলে, পাথুরে আর কদর্মাক্ত দেড় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে এক সময় এসে পড়লাম সিতাপ পাহাড়ের শীর্ষে।

এবার এখান থেকে নামার পালা। এটিই ছিল সবচেয়ে বেশি অ্যাডভেঞ্চার আর ভয়ংকর পথ। একেবারে খাড়া নিচের দিকে প্রায় ৭০০ ফুট নিচে নামতে হবে তাও আবার এমন পিচ্ছিল পথ দিয়ে। এ পথ দিয়ে নামতে হবে ভেবেই গায়ে কম্প জ্বর দিয়ে উঠলো। আল্লাহ খোদার নাম নিয়ে নামা শুরু করলাম। ভারতনাট্যম দিয়ে শুরু হয়েছিল পথা চলা এবার নৃত্যের সব কলাকে রফাদফা করে ব্রেক ডান্স দিতে দিতে নিচে নামতে থাকলাম।

কাধে কাধে এক সাথে হাম হাম। ছবি: লেখক

খাড়া এই পথ এক সময় শেষ হল। পায়ে ঝিরির শীতল পানির স্পর্শ পেলাম। আহ কি স্বর্গীয় অনুভূতি। এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সবাই কম বেশি ক্লান্ত, অবসাদগ্রস্ত৷ তাই ৫ মিনিট রেস্ট নিতে পশ্চাৎদেশ এলিয়ে দিলাম ঝিরির পানিতে। আবার যাত্রার হল শুরু। কোথাও হাঁটু সমান পানি, কোথাও কোমর সমান পানি। ঝিরিপথের আলো ছায়ার খেলায় আমি যেন অন্য জগৎতে হারিয়ে গেলাম। ঝিরিপথের দুইপাশের বাশঝাড়গুলোর মধ্য দিয়ে সূর্যের সেই আলো যখন গলে গলে পানিতে পড়ে অদ্ভূত এক মায়াবিনী পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

মায়াবী এই পথকে আরও রহস্যময় করে তুলে সুমধুর সুরে ডেকে চলা বিভিন্ন পাখির কল-কাকলি৷ একটি দূর যাবার পর শোনা যায় ঝর্ণার সেই বুনো গর্জন। ধোয়ার মত ঘন কুয়াশা এসে চশমার গ্লাস ঘোলা করে দিচ্ছে আর সাথে হাতছানি দিয়ে ডাকছে সুন্দরীর সুধা পান করতে৷ এভাবে ১৫-২০ মিনিট ট্রেক করার পর এসে পড়লাম অপরূপ সৌন্দর্যের আধার হাম হাম ঝর্ণায়।

হাম হাম ঝর্ণা। ছবি: লেখক

হাম হাম ঝর্ণার সৌন্দর্য যত বলবো তত শব্দ কম পড়ে যাবে। এ যেন এক ভয়াবহ সৌন্দর্যের মায়াবী চাঁদর জড়িয়ে বসে আছে। নৈসর্গিক এক অনুভূতি নিয়ে বসে পড়লাম ঝিরির পানিতে। আহা কি সুখ, এই তো জীবন। এতক্ষণের কষ্ট যেন সার্থক হল। কাচের ন্যায় সচ্ছ পানির স্রোতধারা পাহাড়ের বুকে চীড়ে আছড়ে পড়ছে পাথরের গায়ে। সেখান থেকে সৃষ্টি হচ্ছে কুয়াশার আভা।

দেড়শ ফুট উপর থেকে গড়িয়ে পড়া পানির সেই স্রোতধারা পাথরের পর পাথর কেটে এগিয়ে গিয়ে তৈরি করছে স্রোতস্বিনী জলধারা। সে এক বুনো পরিবেশে। বর্ষায় এই ছোয়ায় বন্য সুন্দরী মেতে উঠেছে তার সেই আদি রূপে। সুন্দরীর এই প্রবল বর্ষনে পুরো জংগল যেন ফিরে পায় প্রাণের ছোয়া। ঝিরিগুলো হয়ে উঠে কর্মচঞ্চল।

আহা ঝর্ণা। ছবি: লেখক

ঝিরির সেই মাতাল জলরাশি সাই সাই বেগে ধেয়ে আসে পথিকের পথে। স্বচ্ছ শীতল জলের স্রোত শরীর জুড়িয়ে, মনজুড়ানি এক স্বর্গীয় অনুভূতি এনে দেয় দেহ-প্রাণে। চারদিকে শীতল শান্ত পরিবেশ। ঝর্ণার জলধারা এক অদ্ভূত ছন্দের তৈরি করে৷ এ যেন কোন পাহাড়ী সংগীত। ঘন্টার পর ঘণ্টা শুনতেও কোন ক্লান্তি নেই। পাহাড় বুকে চিরে অপরূপ জলের ছন্দ পতন শুনে মনে পড়ে যায় ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা:

ঝর্ণা! ঝর্ণা! সুন্দরী ঝর্ণা! 
তরলিত চন্দ্রিকা! চন্দন-বর্ণা! 
অঞ্চল সিঞ্চিত গৈরিকে স্বর্ণে, 
গিরি-মল্লিকা দোলে কুন্তলে কর্ণে,
তনু ভরি’ যৌবন, তাপসী অপর্ণা!
ঝর্ণা!

পাষাণের স্নেহধারা! তুষারের বিন্দু!
ডাকে তোরে চিত-লোল উতরোল সিন্ধু|
মেঘ হানে জুঁইফুলী বৃষ্টি ও-অঙ্গে,
চুমা-চুমকীর হারে চাঁদ ঘেরে রঙ্গে,
ধূলা-ভরা দ্যায় ধরা তোর লাগি ধর্ণা!
ঝর্ণা!

এই সেই পর্যটকপ্রেমী কুকুর। ছবি: জুয়েল রানা

অনেক হল বর্ণনা এবার গা ডুবিয়ে দেই এই ছন্দের পতনে, গা ডুবিয়ে দিয়ে এই জলকেলিতে। আমরা সবাই ফটো সেশন পর্ব শেষ করার পর এবার ফেরার প্রস্তুতি নিলাম। আবার সেই টিলা পথ আবার কোন ইঞ্জুরির হাতছানি। পাঠক ঠিকই ধরেছেন উঠার পথে এই নধরকান্তি দেহ আর চাপ সইতে পারলো না। পিচ্ছুল এই পথে পিছলা খেয়ে লেখক পাহাড়ে উঠলে সবচেয়ে বেশি যেই খাদ্যটা খায় মানে রগে টান খেয়ে গেলাম।

এই ফেরাটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। আমাদের গাইড ভরুণদা না থাকলে হয়তো এই পাহাড় থেকে আর বের হতে পারতাম না। আমার সাথীরা সবাই এগিয়ে গেল। আমি মাসলে টান ধরায় বসে পড়লাম। এরপর ভরুণদার সাহসে হেল্প নিয়ে প্রায় ৩০ মিনিট হাঁটার পর আমাদের টিমকে ধরতে পারলাম। তারা কাঠের সাকোর সামনে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। বাকিটা পথ কোন সমস্যা ছাড়াই এসে পড়লাম কলাবন পাড়া। সবার অমানুষের মত ক্ষিদে পেয়েছে। আমাদের হাম হাম ট্যুরের সমাপ্তি এখানেই ঘটলো। ফিরে এলাম আবার হিড বাংলাদেশে। এবার ঢাকায় ফেরার পালা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top