fbpx

বরিশালের পথে ছয় ভ্রমণ পাগল: শেষের গল্প

বরিশাল ঘাটে যখন নামলাম ঘড়ির কাটায় ৬টা। ঘাটের কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চললো ফটোসেশন। এত রিলাক্সে আসার পরও সারা রাত না ঘুমানোর ফলে শরীরটা বেশ ক্লান্ত। আমরা আর একটু সকাল হবার  জন্য অপেক্ষা করছি। ভোর ৬:৩০ এ যখন নথুল্লাবাদ বাস স্ট্যান্ড যাবার জন্য অটো ঠিক করবো তখন আমাদের বিক্রমপুরের জুয়েল ভাইটি হঠাৎ বরিশাইল্লা হয়ে গেল। তখন জানিতে পারলাম উনার এক্স ছিল বরিশালের। বরিশাল উনার নখ দর্পণে। হেঁটেই তো যাওয়া যায় নথুল্লাবাদ বাস স্ট্যান্ড।

প্রকৃতির মাঝে নিশ্চুপ চান মিয়া। ছবি: লেখক

উনার কথা মত ধরলাম হাঁটা। পথ যে আর শেষ হয় না। হাঁটা পথে চোখে পড়লো বরিশাল বেলস পার্ক যাহা বর্তমানে গ্রীণ সিটি পার্ক নামে পরিচিতি। বরিশাল সিটির সব সরকারি অফিস বেসরকারি ভবন দেখতে দেখতে অনেক দূর এসে পড়লাম নথুল্লাবাদ বাস স্ট্যান্ড তো আর আসে না। পড়ে এক ভদ্র লোক কে জিজ্ঞেস করার পর জানতে পারলাম বাস স্ট্যান্ডের রাস্তা ভিন্ন আমরা ভুল রাস্তায় এসে পড়েছি। এক মুরব্বীকে জিজ্ঞেস করার পর উনি বললেন আরও আধা ঘণ্টা হেঁটে যেতে হবে।

সেই মায়াময় রাস্তা। ছবি: লেখক

আমাদের জুয়েল ভাই এমন কড়া ছ্যাকা খেয়েছেন যে বরিশালের রাস্তা ভুলে গেছেন। লঞ্চ ঘাট থেকে নথুল্লাবাদ বাস স্ট্যান্ডের ভাড়া ছিল ১০ টাকা সেখানে ৩০-৪০ মিনিট হেঁটে ভুল পথে এসে ১০ টাকা ভাড়া গুনেই নথুল্লাবাদ বাস স্ট্যান্ড যেতে হচ্ছে। হায়রে জুয়েল বরিশালে আইসাই ছ্যাকা খাইলা। নথুল্লাবাদ পৌঁছেই আমরা মাধবপাশার মহেন্দ্রাতে উঠলাম। ২০টাকা ভাড়া গুণে আমাদের নামিয়ে দিল ঠিক দূর্গা সাগর দিঘীর কাছে।

মিষ্টি সকাল। ছবি: লেখক

দূর্গা সাগর ঢোকার জন্য এখন ১০টাকা টিকেট লাগে। তবে এত সকালে গার্ড কেন আশে পাশে কাক পক্ষীও দেখলাম না। আর গেট ছিল খোলা ধুর টিকেট কে কাটে। ঢুকে পড়লাম আমাদের প্রথম দর্শনীয় স্থানে দূর্গা সাগরে। এত বড় দীঘি আশে পাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ বেশ মনোমুগ্ধকর। বরিশালে আইসা সিলেট চট্টগ্রামের ফিলিংস পকেটে ঢুকাইয়া রাখলে দূর্গা সাগরে বেশ মজা পাবেন। কারণ বাংলাদেশের এক এক অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এক এক রকম।

প্রকৃতি। ছবি: লেখক

বিশাল বড় দীঘি, দীঘির মাঝখানে ঢিবির মত দ্বীপ আর আশে পাশের সাড়ি সাড়ি গাছ পালা আপনাকে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে দিবে। আমাদের ঈসমাইল ভাই তো হারিয়ে যায়নি, দূর্গা সাগর এসে প্রকৃতির মাঝে ডুবে গেছে। ন্যাচারাল ভিউ, সেই ভিউ। তার ভিউ নিয়ে দর্শণের সাথে সে প্রথম পরিচয় হয়েছি আশুর আর আমার সাথে নেত্রকোণায় গিয়ে। এখনও গাড়ি চলছে আর আমরা পুকুর ঘাটায় দাঁড়াইয়া ফটো সেশন পর্ব সেরে নিচ্ছি।

সেই দূর্গাসাগর। ছবি: লেখক

এরপর নজরে পড়লো বেদনাদায়ক দৃশ্য। বাংলাদেশের যে অঞ্চলেই যান না কেন ট্যুরিস্ট প্লেসে ময়লা আবর্জনা ফেলা যেন নিয়মের মধ্যে পড়ে গেছে। এখানে এসেও চট্টগ্রাম সিলেটের ফিলিংস পকেটে ঢুকাইয়া রাখতে পারলাম না। সেই বিরিয়ানির প্যাকেট, চিপ্সের প্যাকেট, সাবানের প্যাকেট, বোতল। মনে মনে বলি তোরা মানুষ হবি কবে, আমার দিন কাটে যে ভবে। পুরা দূর্গা সাগর ঘুরে শেষ করার পর আমাদের পরের স্পটে যাবার জন্য বের হলাম। এখান থেকে বের হবার আগে দূর্গা সাগরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস একটু তুলে ধরি। 

প্রকৃতি। ছবি: লেখক

‘ইতিহাস বিখ্যাত বরিশাল জেলার একটা ইউনিয়ন হচ্ছে মাধবপাশা। চন্দ্রদ্বীপের রাজারা এই অঞ্চলে প্রায় ২০০ বছর রাজত্ব করে গেছেন। তাদের আমলেই তৈরি হয় এই দূর্গা সাগর দীঘি। বর্তমান সময়ে দীঘিটি তার আগের ঐতিহ্য হারালেও ধরে রেখেছে পর্যটক আর্কষণ। শীতে এখানে আসে অতিথি পাখী। দীঘিটি সর্বশেষ সংস্কার করা হয় ১৯৭৪ সালে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী আবদূর রব সেরনিয়াবাত দীঘিটি সংস্কারের কাজে হাত দেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী দীঘির মাঝ বরাবর একটি ঢিবি এবং চারপাশে নারিকেল, সুপারী, মেহগনি, শিশু প্রভৃতি বৃক্ষ রোপন করে সবুজের বেস্টনী তৈরি করা হয়। একটি দিন অবকাশ যাপনের জন্য সুন্দর একটি জায়গা। জনশ্রুতি অনুযায়ী এই দীঘি নির্মাণ করেন তৎকালীন চন্দ্র বংশের পঞ্চদশ রাজা শিবনারায়ণ রায়। তার প্রিয়তম স্ত্রী দূর্গাবতীর নামে দীঘির নামকরণ করা হয় দূর্গা সাগর দীঘি। কথিত আছে রানী দূর্গাবতী যতদূর হাঁটতে পেরেছেন ততটুকু জায়গা নিয়ে দীঘিটি খনন করা হয়। জনশ্রুতি আছে এক রাতে রানী দূর্গাবতী প্রায় ৬১ কানি জমি হাঁটেন। বর্তমান সরকারী জরিপ অনুযায়ী দীঘিটি ৪৫ একর ৪২ শতাংশ জমিতে অবস্থিত। এর ২৭ একর ৩৮ শতাংশ জলাশয় এবং ১৮ একর ৪ শতাংশ পাড় । পাড়টি উত্তর-দক্ষিনে লম্বা ১,৪৯০ ফুট এবং প্রশস্ত পূর্ব পশ্চিমে ১,৩৬০ ফুট।’

শেরে বাংলার তৈরি মসজিদ। ছবি: লেখক

দূর্গাসাগর থেকে বের হয়ে আমরা একেবারে চাখার শেরে বাংলার বাড়ি আর জাদুঘর দেখার জন্য একটি মেহেন্দ্রা রির্জাভ করলাম। চাখার যাবার রাস্তাটা এত অপূর্ব আপনি প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাবেন। এই রকম প্রকৃতি বিলাস করতে করতে চলে আসলাম শেরে বাংলার বাড়ির সামনে। এর মধ্যে দেখা হয়ে গেল রাজিব ভাইয়ের ছোট ভাইয়ের সাথে। অমায়িক মানুষ। ততক্ষণে ক্ষিধার ঠ্যালায় পেট চোঁ চোঁ করছে। উনি আমাদের নিয়ে গেলেন লোকাল এক হোটেলে। ডাল-সবজি আর পরোটা সাথে ভিজা মিষ্টি দিয়ে সকালের নাস্তা সারলাম। ভাই কিছুতেই আমাদের বিল দিতে দিল না। তার অঞ্চলে আসছি আমরা কেন বিল দিব তার কথা হচ্ছে এইটা। জাদুঘরের প্রবেশের টিকেটের টাকাও উনি দিলেন।

শেরে বাংলার জাদুঘর। ছবি: লেখক

এতদিন একটা ভুল ধারনা ছিল জাদুঘরের বাড়িটা উনার। বাড়ির কেয়ারটেকারের কাছে শুনে ভুল ভাঙ্গলো। এই বাড়িটি নতুন করা হয়েছে জাদুঘরের জন্য। পাশের সবুজ বিল্ডিংটায় শেরে বাংলা এসে থাকতেন। জাদুঘরের পাশেই উনার নির্মিত মসজিদ। জাদুঘরের সন্নিকটেই ফজলুল হক কলেজ। এই কলেজের মূল বৈশিষ্ট হল ক্লাসরুমে কোন জানালা নেই সব দরজা। যাক কথা না বাড়িয়ে জাদুঘরে ঢুকা যাক। জাদুঘরের ভিতরে শেরে বাংলার বর্ণাঢ্য জীবনের ইতিহাস আর আর রাজনীতিক জীবনের ছবি দেওয়া আছে। এ ছাড়া রইয়েছে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের ব্যবহৃত আসবাবপত্র, আর কিছু স্মারক লিপি। তিন রুমের জাদুঘর ঢুকলাম আর বাহির হইলাম আর দীর্ঘশ্বাস ফেললাম যে লোকটা আমার দেশের জন্য এত কিছু করলো তার জাদুঘরটা কি আরও সুসংগঠিত হতে পারতো না। ম্যাগি ন্যুডলসের মাত্র দুই মিনিটে দেখা শেষ হয়ে যায় জাদুঘর।

গামছা রানা। ছবি: লেখক

যারা যাবেন তাদের জন্য জাদুঘরের সময় সূচি নিচে দিলাম:
‘জাদুঘর বন্ধ ও খোলার সময়সূচি:
গ্রীষ্ম কালীন সময়সূচি: সকাল ১০ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা। ১-১:৩০ মধ্যাহ্নভোজন বির‍তি।
শীতকালীন সময়সূচি: সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৫টা। ১-১.৩০ মধ্যাহ্নভোজন বিরতি।
রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি। সোমবার দুপুর ২টা থেকে খোলা। শুক্রবার দুপুর ১২টা থেকে ২:৩০ পর্যন্ত মধ্যাহ্ন ও নামাজের বিরতি।
টিকেটের মূল্য: সর্বসাধারনের জন্য ১০টাকা। ৫ বছরের নিচের বাচ্চার টিকেট লাগবে না। সার্কভুক্ত বিদেশী দর্শনার্থীর জন্য ৫০ এবং বিদেশী নাগরিকদের জন্য ১০০ টাকা।’

ছবি: লেখক

এখান থেকে বের হয়ে টংয়ের দোকানে চা খেতে ঢুকলাম এখানেও যথারীতি বিল পে করলো ছোট ভাই। এখন আমাদের পরের স্পট গুঠিয়া মসজিদ যাব। আমরা গুয়াচিত্রার জন্য ভ্যান নিলাম। ভ্যান থেকে নেমে আবার গুঠিয়া মসজিদ যাবার জন্য অটো বাইক ঠিক করলাম। হাওয়া খেতে খেতে চলে আসলাম গুঠিয়া মসজিদ। কিন্তু একরাশ হতাশা নিয়ে বাহিরে থেকে দেখতে হল গুঠিয়া মসজিদ। কারণ মসজিদের গেট খোলা হয় ১২:৩০ টায়। আমরা আসছি ঘড়িতে তখন ১১:২০ বাজে।

গুঠিয়া মসজিদ। ছবি: লেখক

আমাদের ঈসমাইল ভাই মুন ভাইকে সাথে নিয়ে চলে গেল পিছনে ছবি তুলতে বাকিরা তেমন আগ্রহ পেল না। আমার আগ্রহ না পাবার অন্যতম কারণ বরিশাল আমার নানা বাড়ি। আর এই মসজিদ আমার বেশ কয়েকবার আশা পড়েছে। বরিশাল উজিরপুর ইউনিয়নে অবস্থিত গুঠিয়া মসজিদ দক্ষিণ বংগের অন্যতম সুন্দর মসজিদ। ২০০৩ সালে ব্যবসায়ী সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু নিজ উদ্দ্যেগে মসজিদটি নির্মাণ করেন। ইউরোপ, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের নামকরা মসজিদের নকশার ধাচে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়।মসজিদটি নির্মাণে প্রায় ২১ কোটি টাকা ব্যয় হয়। মসজিদ কমপ্লেক্সের সীমানার মধ্যে আরও আছে মাদ্রাস, ঈদগাহ, বাগান, পুকুর।

মসজিদ দর্শন শেষে জানতে পারলাম আমাদের টিওবির এক মেম্বার রাইসা আপুর বাসা বরিশালে এবং তার সাথে দেখা করার জন্য রাজীব ভাই তাকে শহরের বিবির পুকুরের সামনে আসতে বলেছেন। তো চল যাই বিবির পুকুর। ঠিক করলাম অটো বাইক, সে আরেক ঘাউড়া ড্রাইভার। মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে রেকলেস ড্রাইভ করে। জান হাতে নিয়া বিবির পুকুরে আসলাম। বিবির পুকুর আর বরিশাল চৌ মাথার বেশ সৌন্দর্য বর্ধন করেছে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন। বরিশালের প্রাণ বিবির পুকুর। শহরবাসীর আড্ডার জায়গা বিবির পুকুর।

বিবির পুকুর। ছবি: লেখক

আমরা রাইসা আপুর জন্য অপেক্ষা করছি। ইতিমধ্যে উনি চলে আসলেন। আদি টবের চঞ্চল রাইসার সাথে বাস্তব জীবনের রাইসাকে মিলাইতে পারলাম না। এতগুলো বড় ভাইয়ের সাথে প্রথম দেখা তাই হয়তো লজ্জা পেয়েছেন। রাইসা আপুকে নিয়ে হকের মিস্টির দোকানে গেলাম সেখানে চললো মিস্টি ভক্ষণ পর্ব। খাবার পর চললো সেলফি পর্ব। এর মধ্যে নামাজের সময় হয়ে গেল ৪ পাপী বাদে সবাই গেল নামাজে। এখানে নাম উল্লেখ্য করে লজ্জা দিতে চাই না। রায়সা আপুকে বিদায় দিয়ে আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম দুই নামাজী বান্দার জন্য।সারা রাত ঘুম নাই আর দিনের অর্ধেক সময় ঘুরার উপর তাই সবার সিদ্ধান্ত বাসে ঢাকায় ফিরবো। আমরা সবাই আবার নথুল্লাবাদ বাস স্ট্যান্ডের পথে রওনা হলাম। আমাদের ছয় ভ্রমণ পাগলের প্রথম ট্যুর এখানেই শেষ হল। কিন্তু ভিত্তি তৈরি করে দিল আরও কিছু নতুন সফরের, নতুন সম্পর্কের।

বরিশাল ঘাট। ছবি: লেখক

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্পগুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

2 thoughts on “বরিশালের পথে ছয় ভ্রমণ পাগল: শেষের গল্প

  1. Would you be interested in submitting a guest post on georgemartjr.com or possibly allowing us to submit a post to vromonguru.com ? Maybe you know by now that links are essential
    to building a brand online? If you are interested in submitting a post and obtaining a link to vromonguru.com , let me know and we will get it published in a speedy manner to our blog.

    Hope to hear from you soon
    George

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top