fbpx

বরিশালের পথে ছয় ভ্রমণ পাগল: শুরুর গল্প

ভ্রমণ বিলাসী মন থেমে থাকে না, যতদূর চোখ যায় দূরে হারিয়ে যেতে চায়। জাতে সবাই ইবনে বতুতার বংশধর না হলেও, কাজে তার দর্শনধারী ৬ পাগলা চলে গেলাম বরিশাল ঘুরতে। ইভেন্ট ছিল চাঁদপুরের। উড়ানোর কথা ছিল জাহাজের ডেকে বসে ফানুস। তবে রোমাঞ্চপ্রেমী মানুষ তো নিজেরাই ভবের ফানুশ।

কারও সাথে কারও তেমন ভাল পরিচয় নাই। তবু কিসের টানে এক হওয়া! বিশেষ করে জুয়েল রানার সাথে সেই দিনই ছিল আমার প্রথম দেখা।

২০১৬ সালের ৬ জানুয়ারি আশরাফ ভাইয়ের সেই মহা ডাকে সাড়া দিয়ে রাজিব ভাই, ঈসমাইল ভাইয়ের সাথে পূর্ব পরিচয় থাকলেও আদরের জুয়েল রানা ভাইয়ের সাথে ছিল প্রথম ট্যুর এবং প্রথম দেখা। এবং সেই দেখাতেই বুঝতে পেরেছিলাম উনি একজন ভদ্রবেশী মিচকা শয়তান। আর সেই ৬ই জানুয়ারির কাল রাতে দেখা হয়েছিল আর এক বদমাইশ চান মিয়া ওরফে মুন ভাইয়ের সাথে। আর আমাদের সবাইকে একত্রিত করেছিল বাংলাদেশের ভ্রমণকারীদের প্রাণের গ্রুপ টিওবি। ৬ জন অপরিচিত মানুষ যারা এক অপরকে ভাল মত চিনেও না, এই ট্যুর এনে দিয়েছিল তাদের সম্পর্কের ভিত্তি। যাক শুরু করা যাক আমাদের ৬ জনের প্রথম ট্যুরের কাহিনী। এরপর এক সাথে অনেক ট্যুর দিলেও এই ট্যুরটা ছিল স্মরনীয়। 

মাস্টার ব্রিজের অংশ। ছবি: লেখক

জাহাজের ডেকে সবার আগে পৌঁছালো জুয়েল রানা ভাই। টাইম টেবিল মেনে চলা মানুষ একেবারে ৪:৩০ এ এসে গেছেন। এরপর মুন ভাই বাহির হব বাহির হব করতে করতে উনিও চলে এলেন। এরপর আমি সদরঘাটের ঠেলা খাইতে খাইতে চলে এলাম। এরপর দেখলাম রাজিব ভাই একখানা শপিং ব্যাগ নিয়ে হাজির। ডেকে ল্যাটানোর জন্য চাদর এনেছেন। আমরা ৪ জন এসে পড়েছি কিন্তু বাকি ২ জনের খবর নাই। এর মধ্যে জাহাজ ছাড়ার সময় হয়ে গেল। জাহাজের ক্যাপ্টেন খলিল ভাই অমায়িক মানুষ। খলিল ভাইয়ের সাথেও এই ট্যুরে আমাদের প্রথম পরিচয়। বার বার জিজ্ঞেস করছেন বাকি ২ জনের খবর কি। ৬:৩০ বাজে জাহাজ কিন্তু ছেড়ে দিবে অলরেডি ৫ মিনিট লেট।

মাস্টার ব্রিজের অংশ। ছবি: লেখক

সবাই খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। এর মধ্যে জুয়েল রানা ভাইয়ের কাছ থেকে জানতে পারলাম তারা সদরঘাটের ৮ নাম্বার পল্টুনে এসে গেছে। আমরা সবাই জাহাজের বারান্দায় আসলাম। দেখলাম ঈসমাইল ভাই দৌড়াছেন তার পিছে নধর কান্তি দেহ নিয়ে দৌড়াছেন আমাদের প্রাণপ্রিয় পারভেজ ভাই। অল রেডি ৮ মিনিট লেট। জাহাজের ক্যাপ্টেন খলিল ভাই তার সিনিয়রকে নিয়ে আসলেন বললেন সরকারী জাহাজ লেট করিয়ে দেবার জন্য তো আপনাদের জরিমানা হবে। ফানুশ কই সাথে। ঈসমাইল ভাইয়ের এপিক উত্তর, মানুষই পাই না সাথে, ফানুস কখন কিনুম। যাক সিনিয়ন আংকেলের (উনাকে আংকেল বলায় ব্যাপক মাইন্ড খেয়েছিল) কাছে জানতে পারলাম কোন কর্ণেলের যাত্রী যাবে বলে তার জন্য জাহাজ লেট করা হয়েছে। নিজেদের অপরাধবোধ কিছুটা কমে গেল। 

মাস্টার ব্রিজ থেকে দেখি লঞ্চের যাওয়া। ছবি: লেখক

আমাদের জাহাজ নির্দিষ্ট টাইমের ১০ মিনিট দেরি করে ছাড়ায় বেশ স্পীডে টানছে। আর আমরা পুরো জাহাজ ঘুরে ঘুরে দেখছি আর মুগ্ধ হচ্ছি। ফাস্ট ক্লাস কেবিন থেকে ডেক, সেলুন, ড্রয়িং রুম। আর সামনের দিকে যাত্রীদের বসার জন্য সুন্দর জায়গা। যেখানে বসে জ্যোৎস্না বিলাস প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়া যায়। এইভাবে বুড়িগংগা, ধলেশ্বর, মেঘনা, পদ্মা, কির্তনখোলা নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে চলে যাবেন বরিশাল। এত প্যাচাল পাড়লাম জাহাজের নাম এম ভি মধুমতি সেইটাই বলা হয় নাই। আর জাহাজের ক্যাপ্টেন খলিল ভাই একজন সুন্দর মনের মানুষ আমাদের মত ট্রাভেলার। উনার সাথে অনেক বিষয়ে কথা হল। মাস্টার ব্রিজ থেকে শুরু করে পুরা জাহাজ আমাদের উনি ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে দেখালেন। সেলুনের পাশেই রান্নাঘর। সেখানে গিয়ে খলিল ভাই আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন বাটলার হযরত আলী ভাইয়ের সাথে। উনার কাছ থেকেই জানতে পারলাম জাহাজের রসনা বিলাস। খাবারের মেন্যু কিন্তু বেশ লম্বা। যা খাওয়াবে সব হাইজেনিক ফুড। আমরা ইলিশ খিচুড়ি খাব সেইটা তাকে আগেই জানিয়ে রাখা হইয়েছিল।

এই সেই সেলুন। ছবি: লেখক

আমি জাহাজের মেন্যু লিস্টটা হযরত আলী ভাইয়ের কাছ থেকে শুনে লিখে রাখছি, এই সময় জুয়েল রানা ভাই আমাকে হঠাৎ বললো ভাই আমাদের প্ল্যান চেঞ্জ আমরা এখন চাঁদপুর না বরিশাল যাব। আপনার কোন অসুবিধা হবে। দোটানায় পড়ে গেলাম। প্ল্যান করলাম চাঁদপুরের যাব এখন বরিশাল। কোন প্ল্যান ছাড়া ঘুরা আমার সব সময়ই ভাল লাগে বাকি সবাই যখন রাজি কি করবে কাজী। এর মধ্যে খলিল ভাই কন্ট্রোল রুমে চলে গেল উনি ১২টার পর আবার ফ্রি হবেন তখন আমাদের সময় দিবেন। আমরা ফিশ ফ্রাইয়ের অর্ডার দিয়ে বরিশালে কি কি দেখবো এইটার প্ল্যান সাজাতে লাগলাম। রকেটের ফিশ ফ্রাই খাসা জিনিষ। 

আমাদের পারভেজ দাদা। ছবি: লেখক

আমরা চলে আসলাম সামনের ডেকে যেখানে খোলা আকাশ, নামাজ পড়ার ব্যবস্থা আছে।  তিন তলা জাহাজ। উপরে ছাদ। সামনের ডেকে বসলে নদীর দৃশ্য। চাঁদ মামা ও যেন ধরা দেয় আপন খেয়ালে।

নামাজ ঘরে বসে আমাদের পরবর্তী প্ল্যান নিয়ে কথাবার্তা শুরু করলাম। যেহেতু বরিশাল যাব পকেটে টাকা আনছি ৫০০ সাথে ১০০ ফ্রি শুধুমাত্র কোম্পানির প্রচারের জন্য। তো সব দোষ ঈসমাইল ঘোষ। আমাদের চলন্ত ব্যাংক ব্যালেন্স ঈসমাইল ভাই একখানা শুকনা হাসি উপহার দিলেন। যেন বুঝাতে চাইছেন ফান্দে পইড়া গেছি মামা।

চিন্তামগ্ন রাজিব আর ঈসমাইল। ছবি: লেখক

ছাদের ডেকে বসার চেয়ার আছে। সেখানে বসে কিছুক্ষণ হেড়ে গলায় গানের আসর চললো। গায়ক আমাদের মুন ভাই। এই আর এক পাবলিক যিনি ট্যুরে না থাকলে এত আনন্দ পাইতাম না। নিজের আত্ব প্রচার অনেক কইরা ফেলছি এখন আমাদের ট্যুরে যারা যারা আসছেন সবার একটু পরিচয় দেওয়া যাক। প্রথমে আমি আশিক সারওয়ার এরপর সিরিয়াল রাজিব সোহেল, ঈসমাইল হোসেন, তাহসিনুল ইসলাম মুন, আশরাফ হোসেন পারভেজ, জুয়েল রানা।

ভদ্রবেশী মিচকা শয়তান রানা ভাই। ছবি: লেখক

অভাগা যে জায়গায় যায় দুই একজন বিক্রমপুইড়া পাইয়া যায়। মুন ভাই জুয়েল ভাই আমার অঞ্চলের লোক। লঞ্চ যখন চাঁদপুর ছাড়ালো তখন খবর এসে পড়লো আমাদের রাতের খাবার তৈরি। আহা যা অর্ডার করেছি তার থেকেও বেশি খিচুড়ি, ইলিশ মাছ, মুরগী, ডিম ভুনা, বেগুন, সবজি, সালাদ, জলপাইয়ের আচার (তখনও জানতাম না আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে দারুন এক সারপ্রাইজ দেখবেন পরে ভিডিও সহ) । খলিল ভাই শুধু রুটি খাবেন (পরে অবশ্য উনি খিচুড়ি খেয়েছেন) তাই সিনিয়র আংকেলকে অনুরোধ করে নিয়ে গেলাম আমাদের সাথে খেতে। 

রাত বাড়তে থাকলো চলতে থাকলো আমাদের আড্ডার আসর। এর মধ্যে আমাদের গুড ক্যাপ্টেন খলিল ভাইও এসে পড়লো। খলিল ভাই আমাদের ব্যাড জোক্সগুলা যে কি ভাবে হজম করতেছে এই জিনিষটা আমরা খুব উপভোগ করতেছি। খলিল ভাই নিজেও অনেক হাসি তামাসা করতে পছন্দ করেন উনার সাথে এই কয় ঘণ্টা মিশে বুঝতে পারলাম। আমরা সারা রাত ঘুমাবো না ঠিক করলাম। জাহাজের গেস্ট রুম বা ড্রয়িং রুম যেইটাই বলেন ওখানে ল্যাটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম।

নশিকা গর্জনের ব্যস্ত রাজিব ভাই। ছবি: লেখক

দেখলাম একটা বৃদ্ধ গ্রুপ তাস খেলেতেছে, আর দুইজনের জোয়ান গ্রুপ তাস খেলার পার্টনার খুঁজছে। ড্রয়িং রুমের পাশেই খোলা ডেক আর পাশাপাশি বসার জন্য ৬টা চেয়ার। তাস কে খেলে আমাদের পুরা গ্রুপ খলিল ভাইসহ চলে আসলাম নদী আর চাঁদ দেখতে। রাজিব ভাউ বাদে উনি ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া চৌকিদারির কাজ করবেন। এখানে কিছুক্ষণ আড্ডা দেবার পর সবার শীত শীত লাগা শুরু করলো। এর মধ্যে দেখি মুন ভাই আর জুয়েল ভাই চলে গেছে। উনাদের দেখলাম মেয়ে মানুষের মত ফটো সেশন পর্ব শুরু করেছেন। ড্রয়িং স্পেসটা দেখতে সুন্দর ছিল। যে কেউ দেখে ভাবতে পারে সুন্দর কোন হোটেল বা রেস্টুরেন্টে বসে আছি। পুরা জাহাজটাই সুন্দর। এম ভি মধুমতি এরপরও সরকারের লোকসান খাত।

কারণ আমরা উপরের চাক্যচিক্য দেখে আর্কষিত হই। ভিতরে কি আছে দেখি না। এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ঐতিহ্য প্যাডেল স্টিমারগুলো। যেখানে প্রতি বছরে অনেক ট্যুরিস্ট আসছে প্যাডেল স্টিমারে উঠতে আমরা বাংগালীরা এই ভাংগাচুরা ট্মট্মের গাড়ীতে উঠতে চাই না। যাক দুক্ষের কথা থেকে বর্তমানে আসি। ফটো সেসন একটা মারাত্মক ভাইরাস। চান মিয়া এই ভাইরাস ছড়িয়েছে। এই ভাইরাস থেকে আমাদের খলিল ভাইও রক্ষা পাই নাই। ফটো সেশনে রাজিব আর পারভেজ ভাইয়ের কিছু অশ্লীল ফটো আছে উনারা ঘুমিয়ে গিয়েছিলেন কি না। আমাদের সাথে টাইম দিয়ে খলিল ভাই ৩:৩০ এর দিকে আবার একটু রেস্ট নিতে চলে গেলেন। আমরা হাল্কা ল্যাটানোর চেস্টা করলাম।

রাতের দৃশ্য। ছবি: লেখক

তিন বিক্রমপুইড়া বাদে সবার ঘুম এসে গেল। আমরা আবার সামনের ডেক হাওয়া খেতে গেলাম। লঞ্চ ঠিক ৪টার দিকে বরিশাল ঘাটে এসে পৌঁছালো। আর সুবহে সাদিকের আগে প্রথম ধাক্কা খাইলাম। যা ধাক্কা এইটা দেখে মনে হইতেছিল সারা দিন আমাদের এই সেহরী খেয়ে রোজা রাখতে হবে। কস কি মমিন রাতের খাবারের বিল ৩,৩০০টাকা। আপনাদের বলেছিলাম সারপ্রাইজ অপেক্ষা করতেছে এইটা ছিল আপনাদের জন্য সারপ্রাইজ। ৬ জনে ৫০০ টাকা চান্দা উঠাই ছিলাম। বিল আসছে ৩৩০০টাকা আবার লঞ্চের ডেকের ভাড়া বরিশাল পর্যন্ত ৬ জনে ১২০০ টাকা। আমাদের শেষ ভরসা খলিল ভাই আমাদের চলন্ত ব্যাংক ঈসমাইল ভাই। এই বিপদ থেকে আমাদের উদ্ধার করলো জাহাজের ক্যাপ্টেন আমাদের প্রাণ প্রিয় খলিল ভাই। উনি ডেকের ভাড়া চাদপুর পর্যন্ত ৬০০ করে দিলেন আর খাবারের বিল ২৫০০ টাকা। চাঁদপুরের টাকায় বরিশাল আসলেও পকেট পুরা খালি। আল্লাহর নাম নিয়ে খলিল ভাইকে বিদায় দিয়ে আমরা বরিশাল লঞ্চ ঘাট নামলাম সকাল ৬টার দিকে। 

ব্যস্ত সহযাত্রী। ছবি: লেখক।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top