মসজিদের শহর নগর খলিফাতাবাদ: বিবি বেগনীর খোঁজে

ছুটে চলছে পদযুগল। গল্পের ঘোড়া তো থামেনি এখনও। তবুও ঘোড়াকে যে থামতে হয়। ষাট গম্বুজ মসজিদের পশ্চিম পাশেই যে ঘোড়াদিঘী। ৩৬০ টি দীঘি খনন করা হয় খকিফাতাবাদে। ধারণা করা হয় ঘোড়াদীঘি এই অঞ্চলের খননকৃত প্রথম দীঘি। কিংবদন্তি বলে এই দীঘি খননের সময় একটি ঘোড়াকে ছেড়ে দেয়া হয়। ঘোড়াটি এক দৌড়ে যত দূর গিয়েছিল তত দূরই এই দীঘি খনন করা হয়।

বিবি বেগনী মসজিদ। ছবি: লেখক

আবার কারও মতে দীঘি খননের সময় খান জাহান আলী ঘোড়ার পিঠে চড়ে খননের কাজ পরিদর্শণ করতে আসতেন তা থেকে দীঘির নাম হয় ঘোড়াদীঘি। আবার অনেকের মতে দীঘি খননের পূর্বে এখানে ঘোড় দৌড় হত, ঘোড়ের খুড়ের শব্দের সাথে সৈনিকদের কুচকাওয়াজের হর্ষধ্বনি আকাশে বাতাসে মিলে মিশে একাকার হয়ে যেত। তাই এর নাম হয় ঘোড়াদীঘি। তৎকালীন আমলে সুপেয় জলের এই দীঘিকে বেশ পবিত্র ধরা হত। ১৯৮৬ সালে এই দীঘিকেও সংরক্ষিত পুরাকীর্তির (সংরক্ষিত জলাশয়) তালিকাভুক্ত করা হয়।

বিবি বেগনীর মসজিদের দুয়ার। ছবি: লেখক

আজব হলেও সত্য ঘোড়াদীঘি বাংলাদেশের একমাত্র সংরক্ষিত জলাশয়। আয়তকার দীঘিটি পূর্ব পশ্চিমে লম্বা। দীঘিটির আয়তন প্রায় ২০০০’ x ১২০০’। দীঘির পূর্ব দিকে পাকা ঘাট দেখা যায়। আর দক্ষিণ পাশে ১১টি দৃষ্টিনন্দন শেডসহ পর্যটকদের বসার জন্য করা হয়েছে সুব্যবস্থা। ঘুরতে ঘুরতে যখন হয়ে যাবে ক্লান্ত দুদণ্ড শান্তির পরস পেতে এখানে বসাই যায়। আবার বসতে পারেন সবুজ নরম ঘাসের গালিচায়। দীঘির জলে লাল শাপলা বিশেষ আর্কষণ বলা যায়।

এত মনোরম পরিবেশে হারিয়ে যেতে নেই মানা। আমরা পাশের দোকান থেকে ডাব নিয়ে চুমুকে চুমুকে আবিষ্কার করেছি প্রশান্তি তার মাঝে দেখতে পেলাম পুকুরের শান বাধানো ঘাটে ভক্তকূলরা মানত করে জান্ত মাছ ছাড়ছে। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। আমাদেরও তো বহুদূর যেতে হবে। তাই পদযুগল আবার পড়লো বাংলার পথে।

বিবি বেগনী মসজিদের অভ্যন্তরে। ছবি: লেখক

এই ঘোড়াদীঘি থেকে অনুমানিক ৮০০ মিটারে পশ্চিমে বারাকপুর গ্রামে অবস্থিত বিবি বেগনী মসজিদ। আমরা ঘোড়াদীঘির উত্তর পশ্চিম দিকের পথ ধরে হেঁটে চলছি ইট সুড়কি আধা পাকা রাস্তায়। এই চলার পথে সঙ্গী ওয়াফি ছাড়াও ঘোড়াদীঘি। ঘোড়াদীঘির নান্দনিকতা যেন আর সুন্দরভাবে উপভোগ করার জন্যই এই পথের শুরু। সবুজ বৃক্ষের ছায়াঘেরা পথ, আশেপাশে সুনসান নিরবতা যেন একটি সুই পড়লেও আওয়াজ পাওয়া যাবে। এর মাঝে আমরা বার বার জিজ্ঞেস করছি বিবি বেগনীর মসজিদ কোথায় স্থানীয় মানুষজনদের। জিজ্ঞেস করতে করতে এক সময় এসে পড়লাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। ঐ তো দেখা যাচ্ছে বিবি বেগনী মসজিদ।

চুনাখোলা মসজিদে যাবার পথে তার সাথে দেখা। ছবি: লেখক

কেন এই অদ্ভূত নাম তার সম্পর্কে কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে যতদূর জানা যায় বিবি বেগনী ছিলেন খান জাহান আলীর দ্বিতীর স্ত্রী। তার নাম অনুসারেই এই মসজিদের নামকরণ করা হয়। এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটির সাথে সিঙ্গাইর মসজিদের বেশ সাদৃশ্য দেখা যায়। বর্গাকার মসজিদের চার কোণে চারটি মিনার এবং উপরিভাগয়ে বৃহৎ আকারের গম্বুজটিতে খান জাহান আলীর স্থাপত্যের বৈশিষ্ট তীব্র ভাবে পরিলক্ষিত হয়। মসজিদের দেয়ালে জুড়ে মোট পাচটি খিলান যুক্ত দরজা আছে। পশ্চিম দেয়ালে তিনটি অলংকৃত মিহরাব পরিলক্ষিত হয়।

চুনাখোলা মসজিদে দুয়ারে লেখক। ছবি: রাফি আহমেদ

কেন্দ্রিয় মিহরাবটি অন্য মিহরাব গুলোর তুলনায় বেশ বড় এবং পোড়ামাটির টেরাকোটা দ্বারা আচ্ছাদিত। মসজিদের বাইরের প্রতিদিকের মাপ ৪৮’-৬’ এবং ভিতরে ৩৩’-০”। দেওয়ালের পুরুত্ব ৯’-৯’। ঘুরে ফিরে দেখতে লাগলা অপূর্ব এই স্থাপত্যশৈলীর নির্দশন। এই শহরের মায়া যে কাটে না। তবুও যেতে হবে পাঞ্জেরী। বিবি বেগনী মসজিদ থেকে উত্তরের পথে কদম বাড়ালে প্রায় ৭০০ মিটার পরই তার দেখা পাওয়া যায়। আমরা দেরি না করে হাঁটতে লাগলাম।

চারদিকে সবুজ  সবুজ। সেই সবুজের মাঝে হেঁটে যায় কোন চারন কবি। তোমার মায়ায় আমি আজ ঘর ছাড়া হয়েছি। দেখতে দেখতে চলে এলাম চুনাখোলা মসজিদের সামনে। চারদিকে বিস্তৃত দিগন্ত জুড়ে ফসলের মাঠ। আর তার মাঝেই জাকিয়া বসেছে আমাদের চুনাখোলা মসজিদ।

চুনাখোলা মসজিদ। ছবি: লেখক

এই মসজিদটি এখন বিশ্ব সাংস্কৃতি ঐতিহ্য হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। খলিফাতাবাদ নগরের গুরত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসাবে নাম লিখিয়ে ফেলেছে সে বিশ্ব ঐতিহ্যে। খান জাহান আলীর বসতভিটা পশ্চিমে যে প্রহরা চৌকি ছিল তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে এই মসজিদটি। ঐতিহাসিক মত অনুযায়ি, এই মসজিদ বা আসে পাশের মসজিদ নির্মাণের সময় খান জাহান আলী এখানে চুন উৎপাদন কেন্দ্র বা চুনের খোলা স্থাপন করেন।

যে কারণে মসজিদটির নাম হয়ে যায় চুনাখোলা মসজিদ। আর অত্র অঞ্চল চুনাখোলা গ্রাম হিসাবে সুপরিচিত লাভ করা শুরু করে। আর এই গ্রামে এক কালে প্রচুর চুনাপাথর পাওয়া যেত বলে একটা জনশ্রুতি শোনা যায়। এইটাও একটা কারণ হতে পারে এই গ্রামের নামকরণের। মসজিদটি যে সিঙ্গাইর আর বিবি বেগনী মসজিদের কার্বন কপি। নতুন করে তোমাত কি উপমা দিব। হতে পার তুমি সাইজে বড় ছোট। তাই তোমার সৌন্দর্য্য দর্শণেই শেষ হক না সব উপমার শেষ।

চুনাখোলা মসজিদের স্তম্ভ। ছবি: লেখক

মসজিদের সামনে একটি ভ্যান দেখতে পেলাম। সেই ভ্যানে কেউ বরফের চাই নিয়ে এসেছে তা থেকে গলে গলে পানি পড়ছে, আর পাশে দেখতে পেলাম খালি ড্রাম। সেখানে পানি লোড করা হচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদি কাজ বোধ হয়। তাই তো তারা বার বার আমাদের ফটো ফ্রেমে বার বার ঢুকে পড়ছে। আর ফটো কবির তাতেই বেজায় রাগ। সে রাগ সামলিয়ে দু পা বাড়িয়ে মসজিদের প্রবেশ দ্বারের সামনে গেলাম। চেগিয়ে বেকিয়ে সৃষ্টিশীল ফটোর জন্ম দিল ওয়াফি, সে কথা শব্দে এনে ধৃষ্টতা দেখিয়ে পাঠকের কাছে তাই চেয়ে নিলুম মাফি।

এবার ফেরার পালা। খলিফাতাবাদের সফর প্রায় শেষ। এবার যেতে হবে রনবিজয়পুর গ্রামে। শেষ ঐতিহ্য যেন খলিফাতাবাদের মানচিত্র থেকে মুছে গেছে। জিজ্ঞেস করে অবস্থান বের করলাম। খান জাহান আলীর মাজার থেকে সে কাছে ছিল। তাই কি করার আবার ফিরে যেতে হবে ঐতিহ্যের টানে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top