মসজিদের শহর নগর খলিফাতাবাদ: ষাট গম্বুজ মসজিদ

তাল খেজুড়ের ছায়াদানি মায়ায় যেন ভরা মসজিদ প্রাঙ্গন। আর দূরের সেই ষাট গম্বুজ মসজিদ দেখা যায় মুরশিদের দরবারে। শতবর্ষী রেইনট্রি গাছের সুশীতল ছায়াতলে যেম আশ্রয় নিয়েছে ষাট গম্বুজ। মসজিদের দুপাশে দুইটি রেইনট্রি। ১৯১৩ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে এক বাঙালি সাইট পরিচালক কেনাট মাতব্বর গাছ দুটি লাগান। আজ সেই সুশীতল ছায়াময়ি গাছতলায় দুদণ্ড শান্তির পরস বুলিয়ে দিয়ে যায় তার নিচে আশ্রয় নেয়া পথিকদের।

ষাট গম্বুজ মসজিদ। ছবি: লেখক

ষাট গম্বুজ মসজিদের সামনে এসে সেই রেইনট্রি গাছের ছায়ায় বসে অবাক নয়নে দেখতে লাগলাম বিশ্ব ঐতিহ্যের এক অপূর্ব বিষ্ময়। সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের আমলে কৃতি পুরুষ খান জাহান আলী নির্মাণ করেন এই ষাট গম্বুজ মসজিদ। সুন্দরবন তো তখন আরও কাছে ছিল। সুন্দরবনের কোল ঘেষে নগর খলিফাতাবাদ গড়ে উঠেছিল। প্রথম দিকে এইটা খান বাবার দরবার হল নামে পরিচিত থাকলেও কালের পরিক্রমায় পরিণত হয় ষাট গম্বুজ মসজিদ। ষাট গম্বুজ ৬০০ বছর ধরে কত কিংবদন্তি ইতিহাস তোমার বুকে চেপে রেখছো।

টেরাকোটার নান্দনিকতা। ছবি: লেখক

সুফিবাদে বিশ্বাসীরা নিজেরদের অবদান প্রচার করতে বা কোথাও লিখে রেখে যেতেন না। এর ব্যতিক্রম ঘটেনি খান জাহান আলীর ক্ষেত্রেও। তাই ষাট গম্বুজ মসজিদের কোন শিলালিপি পাওয়া যায়নি।  ১২০৪-৫ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজী কর্তৃক বাংলাদেশ বিজিত হলে ইসলামের শরীআত ও মারিফত উভয় ধারার প্রচার ও প্রসার তীব্রতর হয়।

শাসক শ্রেণির সাথে সাথে এ বাংলায় প্রবেশ করে পীর আউলিয়া দরবেশ। তারা ধর্ম প্রচার কার্যে নিজেদের নিয়োজিত করেন। এই সুফিবাদে প্রচারে পিছিয়ে ছিল না  শেখ জালালুদ্দীন তাব্রিজি (র.), শাহ জালাল (র.), শেখ আলাউল হক (র.), খান জাহান আলী (র.), শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা (র.), শাহ ফরিদউদ্দীন (র.) এর মত সুফি পুরুষরা। সুফিবাদের আধ্যাত্মিক তত্ত্ব বাংলার মানুষ লুফে নিয়েছিল। এক সময় সুফিবাদ ও বাউলিয়ানা এক সাথে মিলে মিশে সৃষ্টি হইয়েছিল অদ্ভূত এক ফিউসন।

খুলে দাও মসজিদের দুয়ার। ছবি: লেখক

ষাট গম্বুজ মসজিদের আসল নাম কি ছিল আদতে জানা যায়নি। ষাট গম্বুজ মসজিদের গম্বুজ আছে ৭০টি। এছাড়া ৭টি চৌচালা গম্বুজ ও বেশ দৃশ্যমান তবে তা গম্বুজের যথাযথ সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। এ ছাড়া চার কোণার রয়েছে চারটি উঁচু মিনার। মিনারগুলোর উচ্চতা ছাদের কার্ণিশের চেয়ে বেশি। সামনের দুটি মিনার আছে প্যাচানো সিড়ি যা দিয়ে মিনারের উপরে উঠা যায়।

এই মিনার থেকে আজান দেবার সুব্যবস্থা ছিল। রওশন কোঠা ও আন্ধার কোঠা নামে মিনার দুইটি বেশ সুপরিচিত। ইসলামের বিজয়ের প্রতীক হিসাবে এই চারটি মিনারকে ধরা হয়। এর মাথায় যে চারটি গম্বুজ অবস্থান করছে একে গম্বুজের কোন ভাষা পরিভাষায় ফেলা যায় না। বেশি হলে অনুগম্বুজ বলা যায়। তো প্রকৃতি গম্বুজ হয় ৭০টি আর সব গুণে ৮১। তো জগৎপিতা আমার অংক তো মিলে না।

মসজিদের অভ্যন্তরে। ছবি: লেখক

সেই অংকের হিসাব মিলাতে মিলাতে আমরা দুজন ষাট গম্বুজ মসজিদের ভিতরে ঢুকে গেলাম। ঘুরে ফিরে দেখছি আর বিভিন্ন শ্রুতির কথা মনে করছি। এক শ্রুতি মতে, গম্বুজের মাঝ বরাবর যে সাতটি চৌচালা গম্বুজ রয়েছে তা বিবর্তিত হয়ে ক্রমে ষাট গম্বুজ নাম হয়ে গেছে। আবার আর এক মতে শোনা যায় যে ষাটটি পাথরের স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে মসজিদটি ফারসি ভাষায় তাকে বলা হত খামবাজ বা চলিত বাংলায় খাম্বা। আর তা থেকে ধারনা করা হয় ৬০টি খামবাজ বা খাম্বার উপর দাঁড়িয়ে আছে বিধায় মসজিদটির নাম হয় ষাট গম্বুজ মসজিদ।

মসজিদের পাশে সেই ঘোড়া দিঘী। ছবি: লেখক

গল্পের ঘোড়া এখানে থেমে গেলে কি হত না, তা কি আর হয়। মজার বিষয় হল এই মসজিদের কোন ছাদ নেই। একটু অবাক হলেন বুঝি পাঠক। হবারই কথা। ছাদ নেই মানে আমরা সাধারণ প্রচলিত যে সব সমান ছাদ দেখি তা খুঁজে পাওয়া যাবে না ষাট গম্বুজ মসজিদে। এই মসজিদে যেইটা খুঁজে পাওয়া যাবে সেইটা হল গম্বুজ আচ্ছাদিত ছাদ। আর গম্বুজ ছাড়া আর কোন ছাদ নেই বলে একে ছাদ গম্বুজ মসজিদ বলা হত। কালের বির্বতনে তা হয়ে দাড়ালো ষাট গম্বুজ মসজিদ।

আসো খান জাহানের দরবারে। ছবি: লেখক

মসজিদের ভিতর ডুবে ছিলাম হারিয়ে যাওয়া কোন ইতিহাসের শেকড়ে। শেকড়ের এই টানের কারণেই কি শেকড় সন্ধানি বার বার বের হয়ে যায় বাংলার পথে ঘাটে। সাত সারির  তিন গুণে ২১ টি কাতার। এক সঙ্গে প্রায় ৩ হাজার মুসল্লি নামাজ পড়তে পারে এখানে। আছে নারীদের জন্য নামাজ পড়ার আলাদা সংরক্ষিত জায়গা। আহা আমার মনের দুয়ার যেন খুলে দিল দক্ষিণা হাওয়া। বিশাল যেমন মসজিদ তেমনেই নেই আলো বাতাসের আভাব। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে রয়েছে ৬ টি করে ছোট ও একটি করে বড় খিলান। পূর্ব পাশে বড় আর তার দুপাশে ৫ টি করে ছোট খিলান লক্ষ্য করা যায়।
 
দৈর্ঘ্যে ১৬৮ ফুট ও প্রস্থে ১০৮ ফুটের এ মসজিদের দেয়ালগুলো আট ফুট করে চওড়া। বিশ্বের বিষ্ময় এই মসজিদের সৌন্দর্য্য দেখতে ছুটে আসে দূর-দূরান্ত থেকে কত মানুষ। ইতিহাসে নিয়ে পাঠ্যবইয়ে পড়ে জ্ঞান পিপাসুদের তৃষ্ণা কি মিটে যদি আসো এখন ইতিহাস ফুড়ে দেখবে এই স্থাপত্যের প্রতিটি কর্ম সব আধুনিকতাকে হার মানায়। তাই তো পুরাণকে আমি ভালোবাসি, ইতিহাসকে ধারণ করি হৃদয়ে।

যেন কেন দূর্গ নগরী। ছবি: লেখক

চুন, সুরকি, কালো পাথর ও ছোট ইটের তৈরি এ মসজিদটিতে তুঘলকি ও জৌনপুরি স্থাপত্যকলার বিশেষ ছোয়া আছে রয়েছে বলে অনেক বিশেষজ্ঞদের ধারনা। মসজিদের মিহরাবের সংখ্যা দশটা। মূল মিহরাবের পাথরের আর বাকি নয়টি মিহরাবে টেরাকোটার কাজ বেশ লক্ষনীয়। এই টেরাকোটার ইন্টেরিয়র বৌদ্ধ পাল আমলের স্থাপত্যশিল্পের সাথে বেশ মিল আছে। মিহরাবে টেরাকোটার নকশায় দেখা যায় গোলাপ, পদ্ম, পাপড়ির অলংকরণ। চৌচালা ভল্টটি বাংলার চৌচালা কুড়েঘরের মত দেখতে। টার্কিশ স্থাপত্যের স্পর্শ রয়েছে তাতে। আবার শোনা যায় মদিনার মসজিদ-ই-নববীর আদলে গড়ে তোলা হয় এই মসজিদ। এক মসজিদেই খান জাহান আলী এনেছেন কত গুলো সভ্যতার ফিউসন।

সত্যিই অপূর্ব এই বিশ্ব ঐতিহ্য। তাজমহল দেখে অভিভূত হই অথচ আমাদের দেশেই কতটা নিরবে নিভৃতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কত ঐতিহ্য। ষাট মসজিদের সাথে এবার আমাদের সাত কাহন শেষে সামনে আগানোর পালা এবার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top