fbpx

মসজিদের শহর নগর খলিফাতাবাদ: শিল্পের খোঁজে

দুকদম বাড়িয়ে তাল গাছ ছাড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছে ওয়াফি আহমেদ। তার সাথে এই সাত সকালে খাবারের ব্যাপারে একটা হিল্লে করা দরকার। কিন্তু সেই হিল্লে হচ্ছে কোথায়। জায়গা বেজায়গায় চা খাবার বিরতি যেন নিয়তিতে লেখা ছিল। একটা ছোট বিজ্ঞাপন বিরতির মত ছোট চা বিরতির পর আমরা এই মায়া ভোলা সবুজের পথে হাটতে লাগলাম। পথ রেখেছে যেন পথের দাবি। এক পাশে বৃক্ষে হেলে পড়ে আমার সাথে যেন কথা বলে আর অপর পাশে ছোট পুকুর। পুকুর পাড়ের অনেক ধরনের গাছের সবুজের মায়া যেন জলে তৈরি করেছে জলছত্র। যেন প্রকৃতির আহবান আসো পথিক তিয়াস মিটাও।

ওই তো দেখা যাচ্ছে তাল গাছ, পাশে নারকেল গাছ। নারকেল গাছের ফোকড়ে বাবুই পাখির বাসা। শেষ কবে দেখেছি এই শিল্পের বড়াই। ওয়াফির অস্থির চোখে এ সব ধরে না। তাকে প্রকৃতির কাব্য হাতে কলমে ধরিয়ে দিতে হয়। বাবুই পাখির বাসা শুধু কে মানুষের মনের চিন্তা খোড়াক জোগায়, এর সাথে যে আত্মনির্ভরশীল হতেও শিখায়। তাই তো ছোটবেলার কবিতাটা আবার মনে পড়ে গেল।

সিঙ্গাইর মসজিদের দুয়ার। ছবি: লেখক

বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই,
‘কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই,
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে
তুমি কত কষ্ট পাও রোধ, বৃষ্টির, ঝড়ে।’

বাবুই হাসিয়া কহে, ‘সন্দেহ কি তাই?
কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়।
পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা,
নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।’

শৈশবের স্মৃতি থেকে ফিরা যাক বর্তমানে। হেটে একটা মোড় পার হয়ে মহা সড়কে উঠার জন্য একটা অটো ঠিক করলাম। গ্রামের এই রাস্তা ধরে ধীরলয়ে যাচ্ছে আমাদের অটো। খুলনা আমাকে কখনও হতাশ করে না। কেউ যদি বলে কি আছে এখানে। আমি বলবো শুধু বৃক্ষ দেখতে হলেও খুলনা যাও। মহা সড়কে এসে পুরান অটো ছেড়ে নতুন অটোতে উঠলাম। এবার একটু যেন পিচ ঢালার রাস্তার স্পর্শে গতিবেগ ফিরে পেল। অটো ঠিক আমাদের ষাট গম্বুজ মসজিদের গেটের সামনে নামিয়ে দিল।

সিঙ্গাইর মসজিদ। ছবি: লেখক

ষাট গম্বুজ মসজিদের রোডের অপর পাশেই আছে এক গম্বুজ বিশিষ্ট সিঙ্গাইর মসজিদ। তাই মূল মসজিদে প্রবেশ আগের এক ঝলক এই ছোট মসজিদটি দেখে যেতে দোষের কি আছে। এই মসজিদটি পঞ্চদশ শতকে খান জাহানের আলীর সময়ে নির্মিত হয়। সবুজ সাইন বোর্ডে দেখা যাচ্ছে কিছু লেখাঝোকা। তবে ইতিহাসের বেশি কোন তথ্য পাওয়া গেল না। শুধু জানতে পারলাম সুন্দর ঘোণা নামক একটি সুন্দর নামের গ্রামের বুকেই জাকিয়ে বসেছে আমাদের সিঙ্গাইর মসজিদ।

বাগেরহাট জাদুঘর। ছবি: লেখক

একটি মাত্র গম্বুজ দৃঢ়ভাবে জাকিয়ে বসেছে মসজিদের ছাদে। খান জাহান রীতিতে নির্মিত অপূর্ব স্থাপত্যশৈলী অনুযায়ি গম্বুজটি পুরু দেয়ালের উপর দণ্ডায়মান এবং শীর্ষে রয়েছে বাঁকানো কার্নিশ। প্রত্যেকটি বাহু বাহিরের দিকে ৩৯ ফুট ও ভেতরের দিকে প্রায় ২৫ ফুট লম্বা। ৭ ফুট প্রশস্ত প্রাচীরসমূহ। পূর্ব দিকের দেয়ালে তিনটি প্রবেশ পথ লক্ষ্য করা যায়। আর এই প্রবেশপথ বরাবর পশ্চিম দিকের দেয়ালে দেখা যায় তিনটি অলংকৃত মিহরাব। কেন্দ্রীয় মিহরাব অপেক্ষাকৃত বড় এবং সুন্দর স্থাপত্যকলার নিদর্শণ।

জাদুঘরের নির্দশন। ছবি: লেখক

সিঙ্গাইর মসজিদ দেখা শেষে দু কদম বাড়ালাম ষাট গম্বুজের মসজিদের দিকে। বিশ টাকা টিকেট কেটে ভিতরে ঢুকে হারিয়ে গেলাম যেন ১৫শ শতকে। খান জাহান আলীর রাজ্যে তোমায় স্বাগতম পথিক। নগর খলিফাতাবাদের যে গল্পে এতক্ষণ ডুবিয়ে রেখেছিলাম সেই হারিয়ে যাওয়া শহরের মূল ও আদি নির্দশণই তো ষাট গম্বুজ মসজিদ। যেন ইতিহাস আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে তবে সেই হাতছানির ডাক শুনার আগেই বেরশিক ওয়াফি গেয়ে উঠলো টয়লেটে যাবার গান। দুপা চেপে রেখে, মুখটা কোষ্টকাঠিণ্য রোগির মত করে রেখেছে ওয়াফি।

টেরাকোটার নান্দনিকতা। ছবি: লেখক

বলে উঠলো ওয়াফি আহমেদ ‘আশিক ভাই বাথরুমে গেলাম।’ আমি বললাম যাও ক্ষতি কি। সে গদ গদ কণ্ঠে বলে উঠলো আপনিও চলেন না সাথে। নতুন জায়গায় আমায় একা পাঠাবেন। আমি কিছুক্ষণ তব্দা খেয়ে চেয়ে রইলাম এরপর বললাম, ‘হোয়াই ম্যান।’ আমার তো টয়লেট চাপেনি। এত বড় ছেলেকে বেবি সিট করার দ্বায়িত্ব কি আমার। আমার শব্দ বানে তীব্র অভিমানের বলিরেখা দেখতে পেলাম ওয়াফির ললাটে। কথা বলতে দেরি দৌড় দিতে দেরি হল না।

কালাপাহাড়ের মমি। ছবি: লেখক

ছেড়ে যাবি যখন একা ফেলে কি করবে আশিক। তাই একলা চল নীতিতে ঢুকে গেলাম ষাট গম্বুজ মসজিদ জাদুঘরে। ইউনেস্কোর দেয়া অর্থ সাহায্যে এই জাদুঘরটি গড়ে তোলা হয়। বিভিন্ন সুলতানি আমলের নিদর্শন দেখা যাচ্ছে জাদুঘরে। পেলাম কালা পাহাড়ের মমি। মরে যাবার পরে সে এখানেই দেখা করে দর্শনার্থিদের সাথে। তবে মাথাটা যে কৃত্রিম তা বুঝতে চোখ লাগে। রয়েছে বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া স্মৃতিচিহ্ন, মুদ্রা, বাসন, তৈজসপত্র, মানচিত্র, আরো আছে লিপিবদ্ধ ইতিহাস। জাদুঘরের এক কোণে নগর খলিফাতাবাদের ম্যাপটা দেখতে পেলাম। এ ছাড়া বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন প্রত্মতাত্ত্বিক নির্দশণের ছবি সুন্দর ভাবে শোভা পাচ্ছে এই জাদুঘরে। ওয়াফি প্রায় আধা ঘণ্টা পর ফিরে এল। সে একটা চক্কর দিয়ে নীল জাদুঘরের।

জাদুঘর থেকে বের হয়ে দুকদম বাড়ালাম ষাট গম্বুজের উদ্দেশে। আমার মনে হানা দেয় কত স্মৃতি। সামনেই স্বপ্নের ষাট গম্বুজ মসজিদ।

Back to top