in ,

মসজিদের শহর নগর খলিফাতাবাদ: জিন্দাপীরের খোঁজে

ঠাকুর দীঘি থেকে চলতে লাগলাম আরো পশ্চিমে। স্থানীয় মানুষকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিলাম মাজারের আশেপাশে অবস্থিত দুইটি মসজিদের অবস্থান। হেঁটে চলছি গ্রামের পাকা রাস্তার মাঝে, কি অদ্ভুত মায়া। দু পাশে অলিঙ্গন করেছে আমায় সবুজ আরে পাশে ওয়াফির মত প্রকৃতি প্রেমিক। বন্যরা বনেই সুন্দর, তাই তো বলতে হয় বুনো গন্ধের রেশ না পেলেও গ্রামের গন্ধের রেশ পাই। হয়তো আশেপাশে কোথাও পাতা পুড়েছে মাটির গন্ধের সাথে কয়লা পোড়া একটা গন্ধ নাকে ঝাজের উদয় করলো।

অচিন পরিব্রাজক যেন এই সবুজের মাঝে মিশে গেছে। প্রকৃতির মাতার সৈন্যদল বৃক্ষের সারি দিয়ে যাচ্ছে উম দেওয়া আমুদি উত্তাপ। শরতের সকালে মহুয়া বাতাসের মাদকতায় যেন মন উড়ছে সাথে আত্মা পরিশুদ্ধ হতে চাচ্ছে সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে। খানিকটা হাঁটার পরেই পেয়ে গেলাম আমাদের প্রথম গন্তব্য নয় গম্বুজ মসজিদ।

পথের দাবি। ছবি: লেখক

শীতল হাওয়ার স্পর্শে গুণগুণিয়ে যায় কোন ইতিহাস। বাতাসে ফুসফুস ফিসফাস। তবে তোমার ইতিহাসটা যেন আজানাই রয়ে গেল। কিছু রাজহাসের পাল ঘুরছে তোমার আঙ্গনে। যেন আমাদের এই স্বাগত জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে ছিল। খানিকটা থমকে দাঁড়িয়ে দেখি নয় গম্বুজ মসজিদ। প্রত্মতত্ত্ব অধিদপ্তরের সবুজ সাইনবোর্ডে চোখ বুলিয়ে জানতে পারলাম এর স্থাপত্য শৈলী নিয়ে।

১৫শ শতাব্দিতে নির্মিত এই মসজিদ বহন করছে খান জাহান আলীর স্থাপত্য শিল্পের নির্দশন। যার আর্কষণেই ছুটে আসে পথিক। মসজিদের পশ্চিম দিকের দেয়াল মুখ করে আছে সেই প্রাণের নবীর দেশ মক্কায়। দেয়ালে ভিতরের অংশে বসানো মিহরাব, মিহরাবের চারপাশে ফুলের নকশার টেরাকোটা যেন শুনায় এক নান্দনিক স্থাপত্য শিল্পের কাব্যিক ভাষা।

প্রকৃতির সন্তান। ছবি: লেখক

মসজিদের চার কোণায় মিনার যা দেখতে অনেকটা সুউচ্চ গোলাকার টাওয়ারের মত। মসজিদের দেয়ালগুলো বিশাল একটি গম্বুজ ধারণ করে যার চারপাশে আটটি অপেক্ষাকৃত ছোট গম্বুজ রয়েছে। সালফেটের স্পর্শে হারাতে বসেছিল আর্কষণ তার আগেও প্রত্মতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের কোমড় বাধা কাজে সংরক্ষণের সাজে দাঁড়িয়ে আছে সে আমাদের সামনে।

জিন্দা পীরে কহিলেন। ছবি: লেখক

মসজিদের অভ্যন্তরে পাথরের দুসারি থাম মোট নয়টি চৌকো খণ্ডে বিভক্ত। প্রতি খণ্ডের উপর তো বসে আছে মসজিদের ছাদের নয়টি গম্বুজ। সামনে, মাঝে, পিছে তো দেখো সব জায়গায় তিনের সন্নিবেশে মোট নয়টি গম্বুজ জাকিয়ে বসেছে। ধারাবাহিল ভাবে সাজানো তারা। যেন যে দিক দিয়েই দেখি মনে হবে প্রতিটি গম্বুজের একটি গম্বুজ থেকে আর একটি গম্বুজের দূরত্ব সমান। পশ্চিমের কিবলা দেয়ালে নিদিষ্ট দূরত্ব পর পর একটি করে আবার তিনটি অবতল মিহরাব দেখা যায়। এগুলোর টিম্প্যানাম ও স্প্যানাড্রল অংশে পোড়ামাটির কারুকাজ লক্ষ্য করা যায়।মসজিদটির সামনের দিকে মোট ৩টা দরজা রয়েছে।

মুরিদানের কবর। ছবি: লেখক

ঐতিহ্য এমন জিনিষ আপনাকে দুদণ্ড ভাবাবে। এবার এই মসজিদ থেকে খুবই কাছে অবস্থিত জিন্দা পীরের মসজিদের উদ্দেশে আমাদের পদযুগল বাড়ালাম। বার আউলিয়ার দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কত মসজিদ। সেই প্রাচীন যুগে থেকে বঙ্গের এই অংশে মসজিদের অধিক্য লক্ষ্য করা যায়। এমন নয় এ দিক দিয়ে পিছিয়ে আছে পশ্চিমবঙ্গ। তবে সেই কাটাতারের বেড়া এখন পুড়ায় হিন্দু মুসলিম কমিউনিটির মানুষদের। সে সব বিষয় না হয় থাকুক উহ্য। আমার না হয় বের হই জিন্দা পীরের খোঁজে।

স্থানীয় কিংবদন্তি হিসাবে জুড়ে আছে এই অঞ্চলের বাতাসে জিন্দা পীর। শুনা যায় জিন্দা পীর ছিলেন বড় বুজর্গ ব্যক্তি। তিনিই এই অঞ্চলে নির্মাণ করেন এক গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ। উনি এতটাই আলেমদার ব্যক্তি ছিলেন কোরআন শরীফ তেলাওয়াত অবস্থায় একদা অদৃশ্য হয়ে যান। তখন থেকে কিংবদন্তি রটে যায় জীবিত আছেন জিন্দা পীর অদৃশ্য অবস্থায় তাই তাকে শ্রদ্ধা করে সবাই জিন্দা পীর ডাকতে আর কালের বির্বতনে এই মসজিদের নাম হয়ে যায় জিন্দাপীর মসজিদ। তবে ইতিহাসের পাতায় নয়, ইতিহাসে গর্ভে হারিয়ে গিয়েছিল এই মসজিদ। ২০০২ সালে প্রত্মতাত্ত্বিক খননের ফলে মাটির বুজ ফুড়ে বের হয়ে আসে জিন্দাপীর মসজিদ।

প্রাচীনতা। ছবি: লেখক

বাংলার এই মায়াময় পথে আছে কত মোহ। কচুরিপানার জলে কি পদ্ম খুঁজতে নেমেছিল হাঁসের দল। জল তরঙ্গের মাঝে জেগে উঠা হেলেঞ্চা কলমি লতা শুনায় গাঁও গ্রামের কিচ্ছা। তার মাঝেও দেখা যায় মাউচ্ছা রানীর বিচরণ। মাউচ্ছা রানী একটি বিষহীন সাপ, তবে সাপ হয়ে জন্ম নেওয়াই তার আজন্ম পাপ। সাপের বিষ কজনে মরে এর থেকে বেশি মরে সাপের ছোবল খেয়ে প্যানিক হয়ে। আমার বাবা শুনিয়েছিলেন একবার নির্বিষ সাপের কামড় খেয়ে সলিম চাচার হার্ট এটাক করে মরার মহাকাব্যিক গল্প সে না হয় বাংলার পথে চলতে গিয়ে উহ্য থাক। কারণ আমরা তো এসে পড়েছি আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।

নয় গম্বুজ মসজিদ। ছবিঃ লেখক।

প্রাচীনকে জাকিয়ে বসে জিন্দা পীরের আঙ্গিনায় আজ কত তার অনুসারি শুয়ে আছে চির নিদ্রায়। মসজিদ সামনে দেখা যাচ্ছে কিন্তু চুম্বকের মত আর্কষণ করছে কবরের হাতছানি। এই মাটির নিচেই যেতে হবে আমায়। যেখানে শুয়ে আছে ৫০০ বছরের আগের আদি পুরুষ। কে এই জিন্দাপীর, নাম নিয়ে কত বিভ্রম। কেউ বলে আহমদ খা কেউ বলে আহমদ আলী তবে সৈয়দ আহমদ শাহ বলার যে বাকি। এই আঙ্গিনায় সে কোথায় শুয়ে আছে সে যে আজও রহস্য। তবে এই প্রাচীন কবরস্থানের উত্তর পাশে একটা পাকা কবর রয়েছে যা জিন্দা পীরের পুত্রের কবর নামে পরিচিত।

জিন্দা পীরের মসজিদ। ছবি: লেখক

কবরের মোহ কাটিয়ে এবার না হয় দেখি সেই পীরের মসজিদের স্থাপত্যশৈলী। উত্তর-পশ্চিমে দেখা যায় ওই মুরশিদের মসজিদ। এক গম্বুজের মসজিদের চারপাশের চারটি গোলাকার বুরুজ। দেয়ালগুলো প্রায় ১.৫২ মিটার পুরু।  পুবের দেয়ালে আপন খেয়ালে জাকিয়ে বসেছে তিনটা দরজা ওই পশ্চিমে দেয়ালে দেখা যায় তিনটি মিহরাব। উত্তর ও দক্ষিণ বলেনি যাব আরও পশ্চিম, সেই দুই দুকের দেয়ালেও ১টি করে দরজা।  আট কোনায় চার মিনারের বলয়, মসজিদের গায়ে পোড়ামাটির চিত্রফলক এখন পরিব্রাজকের বুকে তুলে প্রলয়। আহা আমি যে ইবনে বতুতা। তবে শুনার জিন্দা পীর ফিসফিসিয়ে গুঞ্জন এই মসজিদ নয় খান জাহানের সময়ের। খান জাহান আলীর মৃত্যুর পর হোসেন শাহ বা তার পুত্র নুসরত শাহর আমলে নির্মাণের গল্প শুনিয়েছিল জিন্দা পীর।

অনেক কাব্যিক ঢং ছিলাম তাই শুনিয়ে গিয়েছি জিন্দা পীরের গাথা, এবার যে আগে বাড়াতে হয় দাতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মায়ুং কপাল: গুমতী তৈসায় বনভোজন

মায়ুং কপাল: স্বর্গের খোঁজে স্বর্গের সিঁড়িতে