in ,

মসজিদের শহর খলিফাতাবাদ: খান জাহান আলীর মাজার

ভোর হল দোর খোল খুকুমনি উঠোরে। খুকুমনিরা উঠে গেলেও ঘুম ভাঙ্গে না ওয়াফি মনির। সেই সাতটা থেকে গুতিয়ে যাচ্ছি জগৎ পিতা, সে কি কোন মিতার স্বপ্ন দেখেই শেষ পর্যন্ত উঠলো। যাই হক ওয়াফি মনি উঠার পর ফ্রেশ হয়ে সকালের নাস্তা সেরে রওনা হলাম খলিফাতাবাদ শহরের প্রথম নিদর্শনের খোঁজে। বাগেরহাট বাস স্ট্যান্ডের সামনে থেকেই উঠে বসলাম অটোতে। সেই অটো নামিয়ে দিবে আমাদের খান জাহান আলীর মাজারের সামনে।

অটো ছুটে চলছে প্রাচীনের খোঁজে নতুনের মাঝে। সেই পথে ছুটার মাঝেই যে কত মায়া লুকিয়ে আছে তা ধরা দেয় পরিব্রাজকের পাখির চোখে। পথ দেখায় পথের প্রেম। দেখা যায় কত অদ্ভূতুড়ে লোক, এ পথেই যে জ্ঞান, এ পথেই আশা পরিব্রাজকের ভালোবাসা। তাই কি পরিব্রাজকের ললাটে নেই মায়াবতির প্রেম। সকাল সকাল সেন্টুর সাগরে ভেসে খান জাহান আলীর গেটে মামা আমাদের নামিয়ে দিল হেসে হেসে।

গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দুই পথিক। ছবি: লেখক

গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে দেখতে পেলাম সাধক পুরুষের শেষ ঠিকানা। এখানেই চির নিদ্রায় আচ্ছন্ন আছেন খলিফাতাবাদের স্বপ্নদ্রষ্টা। গৌড়ের সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন খান জাহান আলী। আর সেই বন্ধুর উপর বিশ্বাস রেখেই তো খলিফাতাবাদের ভিত্তি স্থাপনে সায় দেন। সেই স্বপ্নদ্রষ্টার হাত ধরেই সৃষ্টি হয় নগর খলিফাতাবাদ। ৩৬০ জন আউলিয়ার আগমনের সংখ্যার সাথে মিলে রেখে এ শহরে ৩৬০টি মসজিদ ও ২৬০ দীঘি খনন করা হয়।

কালের পরিক্রমায় সবই ভূগর্ভ গ্রাস করেছে। টিকে আছে গুটি কয়েক। আর সেই ঠাকুর দিঘীর পাশেই সমাধিত হয়েছে সাধক পুরুষ। কিংবদন্তি বলে এই ঠাকুর দিঘীতেই এক কালে কালা পাহাড় ও ধলা পাহাড়ের বাস ছিল। এই দুই কুমির ছিল খান জাহান আলীর সময়ের। তবে এর কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

ঠাকুর দীঘির সামনে মানুষের ভিড়। ছবি: লেখক

এক ঝলক পিছে তাকিয়ে মাজারটা দেখতে লাগলাম। বর্গাকৃতি সমাধিসৌধটি খননের সময় উত্তলিত পদার্থ দিয়ে পাড় তৈরি করে তার উপর সমাধি সৌধটি তৈরি করা হয়েছে। সমাধিটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট এবং এর প্রাচীর ফুট উঁচু। ১৮৮৬ সালের নথিভুক্ত সূত্র থেকে জানা যায় যে এই সমাধির মেঝে নীল, সাদা, হলুদ ছাড়াও বিভিন্ন রঙের ষড়ভুজাকৃতির টালি দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল।

কাল পাথরের তিন ধাপে সাজিয়ে কবর তৈরি করা হয়েছে। পবিত্র কোরআন শরীফের আয়াত পার্সিয়ান ও আরবি ভাষায় কবরের আশেপাশে লেখা রয়েছে। ধর্ম কর্ম প্রচারের থেকে অবসরের পর এখানেই তার বাকি জীবন কাটে তাই ১৪৫৯ সালের ২৫ অক্টোবর মৃত্যুবরণের পর এখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। খান জাহান আলীর মাজারের পাশেই আছে পীর আলীর মাজার। যিনি ছিলেন খান জাহান আলীর একান্ত সহযোগী।

মেলার সময় মাজার প্রাঙ্গন। ছবি: লেখক

ওয়াফি আহমেদের ছবি তোলার নেশা জাগিলো, সিন্দাবাদের ভূতের মত সেই নেশা একেবারে লালদিয়া বন থেকে তাড়া করে আসছে। যাই হক দেখার শেষ নেই ছবি তোলার ও শেষ নেই। আমার মাজার প্রাঙ্গন থেকে এসে পড়লাম ঠাকুর দীঘি। প্রায় ২০০ বিঘা জুড়ে বিশাল দীঘি। চারপাশে গাছপালার মাঝে বিশুদ্ধ অক্সিজেনে নির্যাস চাষ হয়। তারই হীম শীতল বাতাসে স্পর্শে ভুলিয়ে দেয় যেন পথের ক্লান্তি। দীঘির শান্ত জল রেখে যায় কত ইতিহাস।

গ্রাম্য মেলা। ছবি: লেখক

দীঘির নাম ঠাকুর দীঘি কিভাবে হল। এই নাম নিয়েও আছে কিংবদন্তি। কিংবদন্তি কোন ইতিহাস নয়। তবে যেন ইতিহাসের পাশাপাশি এক হাত ধরেই চলে। এক বুজুর্গের কাছে শুনতে পেলাম হিন্দু ঠাকুরের মূর্তি এই দীঘির তলদেশ থেকে উপরে উঠে এসেছিল একদা, তা দেখে নামকরণ হয় ঠাকুর দীঘি। আবার আর একজনের মুখে শুনলাম খান জাহান আলীকে সনাতনীরা শ্রদ্ধা ভরে ঠাকুর বলে ডাকতো। খান জাহান আলীর বিশেষ তত্ত্বাবধানে এ দীঘি খনন করা হয় বলে দেশীয় হিন্দুরা ভক্তি দেখিয়ে এই দীঘিকে ঠাকুর দীঘি বলতো। আমরা ৫০০ বছর আগে হিন্দু মুসলিমদের যে ভাতৃত্ব দেখেছি এই আধুনিক সমাজে দিন দিন যেন তা উবে যাচ্ছে।

স্টলে ব্যস্ত গ্রাহক। ছবি: লেখক

কিংবদন্তি এখানে শেষ হয়ে গেলেও কথা ছিল। তবে কিংবদন্তি যেন আজ আমাদের শুনাতে চায় তার দুঃখ। অন্য সূত্রে থেকে জানা যায় পীর আলী মোহাম্মদ তাহের ছিলেন খান জাহানের প্রিয়তম বন্ধু। তিনি পূর্বে ব্রাহ্মণ ছিলেন। ইসলামের ছায়াতলে আসার আগে শ্রী গোবিন্দ লাল রায় নামে পরিচিত ছিলেন। খান জাহান আলী তাঁকে আদর করে ঠাকুর বলে ডাকতেন। তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে তিনি এ দীঘির নাম দেন ঠাকুর দীঘি। মরণের পর দুই বন্ধু শায়িত আছে একই আঙ্গিনায়।

হরেক রকম মিষ্টি। ছবি: লেখক

কিংবদন্তির জগৎ থেকে এবার বাস্তবে ফিরার পালা। এই শান্ত সকালের দীঘির পাড়ে মানুষের ভিড়। কপোত-কপোতিরা ধর্মীয় কুসংস্কারের ভিড়ে যেন লাগিয়েছে অধর্মের আগুন। পৌড় দম্পত্তির গজ গজ করে অভিশাপ দেওয়াই যেন হাওয়ায় হাওয়ায় যুগ বদলের বার্তা পৌঁছে দেয়। কালা পাহাড় ধলা পাহাড় নেই তবে ভণ্ড মাজার ব্যবসা তো বন্ধ নেই। এসেছে নতুন কুমির। আর সেই কুমিরের উদ্দেশ্য হাঁস, মুরগি, ভেড়া, খাসিসহ নানা ধরনের মানতের পশু উৎসর্গ করছে ভীরু ধার্মিক। ভীরুই বটে না হয়ে কিভাবে এই কুসংস্কার একবিংশ শতাব্দিতে এসেও রটে। তাই তো ধর্ম ভীরু থেকে ভীরু ধার্মিকের সংখ্যাই এখানে বেশি।

ঠাকুর দীঘি। ছবি: লেখক

আর তাদের মাঝে পাপের উত্তাপ ছড়াতে হাজির হয় আশেপাশের স্কুল কলেজ পড়ুয়া মেয়ে ছেলের দল। আহা একই প্রাঙ্গনে কত ধরনের মানুষ। দীঘির প্রধান ঘাটটা বেশ প্রশস্ত ও সুন্দর। বেগানা নারীদের জন্য আবার আলাদা ঘাট আছে। এর মধ্যে বাবা টাইপের কাউকে বলতে শুনলাম এই দীঘির পানি পান করলে রোগ নিরাময় হয়। এ যেন ভণ্ড মজিদের প্রতিচ্ছবি। আহা লাল সালু এভাবেই কি যুগে যুগে ফিরে আসে আমাদের মাঝে। রোদের তাপ বাড়ছে আমরা আগালাম নতুন গন্তব্যের উদ্দেশে।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্পগুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মসজিদের শহর খলিফাতাবাদ: ঐতিহ্যের শহর

মায়ুং কপাল: গুমতী তৈসায় বনভোজন