in ,

মসজিদের শহর খলিফাতাবাদ: ঐতিহ্যের শহর

রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি দেখে আমরা পিরোজপুর বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি। বরিশাল বিভাগ থেকে এবার প্রবেশ করবো খুলনা বিভাগে। আর প্রাচীন শহর খলিফাতাবাদ আমাদের জন্য অপেক্ষায় বসে আছে। খান জাহান আলীর শহর, ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যে যার নাম জ্বলজ্বল করছে। সেই শহরের হাতছানি কে উহ্য রাখি। শহর সঙ্গী সদা অস্থির ওয়াফি আহমেদ যেন মালাই চায়ের মাঝের ঐতিহ্যের সর খুঁজে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যেই বাগেরহাটের বাস এসে গেল। আমরা এক মুহূর্ত দেরি না করে উঠে পড়লাম বাসে।

দীঘির ধারে ওয়াফি। ছবি: লেখক

বাসে ছুটে চলছে তার আপন গতিতে পিছে পিরোজপুরের মায়া ছেড়ে। হেডফোনে বাজছে আর্টসেলের আমার পথ চলা গান। যেন বেলা শেষে আকাশ কার মোহে দেখিয়েছিল নতুন দিনের স্বপ্ন। বাসটা কানায় কানায় পরিপূর্ণ। নেই শ্বাস ফেলার জায়গা। ভ্যাপসা গরমের মাঝেও মানুষ কিভাবে নাক ডেকে ঘুমায় পাশে ওয়াফি আহমেদ না থাকলে হয়তো জানতেই পারতাম না। আমি চলে গেলাম আধো তন্দ্রা, আধো ঘুমু ঘুমু জাগরনের জগতে। বাসের সামনে সিটে জেন জন মরিসন বসে আছে আমাকে রাইডার অফ স্ট্রর্ম শুনাতে। একি মোর কল্পনা, নাকি অন্য ভুবনে বিচরণ।  

খলিফাতাবাদের কিছু নিদর্শণ। ছবি: লেখক

এক ঘণ্টার পথ পারি দিয়ে যখন বাগেরহাট পৌঁছালো আমাদের বাস তখন রাতের লেনদেন নিয়ে বসে ছিল বনলতা সেন। বাগেরহাটে এসে বনলতাকে খুঁজা তো অলীক স্বপ্ন। তবে বাংলাদেশের আগুন সুন্দরিদের বাস যে খুলনায় তা এই রাতের আধারেও টের পাচ্ছি, এবার হ্যালুসেনেশন নয়। কোমড় ছুই ছুই চুল, কাজল চোখের মেয়ে শেষ আমি কবে দেখেছি। তবে আমার সব ভাবালুতা মাঠে মারা যায় বেরশিক ওয়াফির কারণে। আশিক চলেন মালাই চা খাই।

চা পর্ব শেষে সেই চিরাচরিত হোটেল আলামিনেই ঠাই হল আমাদের। এর আগে তিন চার বার আসা পড়েছে বাগেরহাট বিভিন্ন কারণে, শেষ এসেছি মার্চ মাসে। সে সময় উঠা পড়েছিল হোটেল আলামিনে। দেরি না করে সাময়িক বাসস্থানে এসে গা এলিয়ে দিলাম। সারাদিনের ক্লান্তি জাকিয়ে বসেছে দেহে। ধীরে ধীরে লম্বা শাওয়ার সেরে দুজন নামলাম রাতের শহরে।

মাটির ফলক। ছবি: লেখক

এই তো খান জাহান আলীর বাগেরহাট, হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের শহর নগর খলিফাতাবাদ। বিলুপ্ত শহরের খুঁজতে এসেছি আজ ইতিহাসের শিকড়। তৎকালীন সময় বাগেরহাটের পশ্চিমে একটি অংশ জুড়েই ছিল নগর খলিফাতাবাদ। শাহী বাংলায় এই শহর পুদিনার শহর হিসাবেই বেশ পরিচিত। তবে এর সাথে পুদিনা গাছের কোন সম্পর্ক আছে কি না জানা যায়নি। তুর্কি সেনাপতি একাধারে ধর্ম প্রচারক খান-ই-জাহান ১৫ শতকের শুরুর দিকে গড়ে তুলে এই ঐতিহ্যের শহর। ফোর্বস ম্যাগাজিনের হারিয়ে যাওয়া ১৫টি শহরের লিস্টে ছিল এই নগর খলিফাতাবাদ।

এক সময় সুন্দরবনের অংশ ছিল এই শহর। এখন গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র নদীর মিলনস্থানে এই শহরের অবস্থান। উপকূল থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে। নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে বর্তমান খলিফাতাবাদ আজ বহুদূরে হলেও শহরটি তো আর টিকে নেই। তবে টিকে আছে খান জাহান আলীর তৈরি শেষ নির্দশণ। যা সাক্ষ্য দেয় এক সমৃদ্ধ জনপথের। ষাট গম্বুজ মসজিদ, খান জাহান আলীর মাজারসহ আছে সিংগার, রনবিজয়পুর, বেবী বেগনিসহ আর কিছুই স্থাপত্যশৈল্য। ঘন জঙ্গল আর বাঘের কথা মাথা রেখে অসাধারণ কাঠামোয় গড়ে তুলেছিল এই শহর। কালের বির্বতনে জঙ্গলে হারিয়েছে পামগাছে ঘেরা কৃষিজমির মাঝে।

নান্দনিক নকশা। ছবি: লেখক

তখন দিল্লীর সালতানাতে আসন জাকিয়া বসেছিলেন সুলতান নাসির আলদীন মাহমুদ শাহ। ১৫শ শতাব্দিতে সুলতানের একজন প্রশাসক উলুঘ খান জাহান হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় এই শহর। খান জাহান আলী এ শহরের রাস্তা, সেতু এবং পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। ঘোড়াদিঘী ও দারগাদিঘী নামক দুটি বিশাল পুকুর এই পরিকল্পিত শহরের অংশ ছিল। অনেকগুলো মসজিদ, মাজার, প্রাসাদ তার দক্ষ শাসন আমলেই নির্মিত হয়।

নির্দশণ। ছবি: লেখক

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে দিল্লীর সালতানাত ভারতবর্ষ থেকে সুদূর এই বঙ্গে প্রচার করতে চেয়েছিলেন ইসলাম ধর্ম। এই দুঃসাধ্য কাজের জন্য উলুঘ খান জাহানকে বঙ্গদেশে প্রেরণ করা হয়। দক্ষিণ বাংলায় প্রশাসক হিসাবে অসাধারণ দক্ষতায় এই অঞ্চলের মানুষদের নিয়ে আসেন ইসলামের ছায়াতলে। তার প্রশাসনিক অঞ্চল তৎকালীন ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালি এবং বরিশাল নিয়েই গড়ে উঠেছিল। তিনি ছিলেন একাধারে পীর, সাধক পুরুষ, দক্ষ প্রশাসক ও ধর্ম প্রচারক। তবে বাংলার জনগণের সাথে এভাবে তিনি মিশে গিয়েছিলেন মনে হয়নি তিনি এখানে কোন রাজ কর্মচারি হিসাবে এসেছেন তাই তো এত বছর পর খান-ই-জাহানের নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারণ হয়। 

ঐতিহ্য। ছবি: লেখক

স্থাপত্য বিষয়ে তার জ্ঞানের জন্যও তিনি ছিলেন সমাধিক পরিচিত। তার স্থাপত্য রীতিতে এই খলিফাতাবাদ শহর গড়ে উঠেছিল। খলিফাতাবাদের পরিকল্পনায় ইসলামিক স্থাপত্য রীতির প্রভাব তীব্রভাবে লক্ষ্য করা যায়; বিশেষ করে মসজিদের কারুকার্যে মুঘল এবং তুর্কী স্থাপত্যরীতির ছাপ আর্কষিত করে পর্যটকদের। এই শহরে ছিল ৩৬০টি মসজিদ, সরকারি ভবন, গোরস্থানসহ যোগাযোগের জন্য ছিল সেতু ও সড়ক। সুপেয় পানি পান করার জন্য ছিলা জলাধার।

এই সেই কালা পাহাড়। ছবি: লেখক

বিশেষ করে মসজিদগুলোর অধিকাংশের নকশা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ও স্বতন্ত্র। ১৮৯৫ সালে এলাকাটি পরীক্ষা নিরিক্ষা করে ব্রিটিশ রাজ এরপর ১৯০৩-০৪ সালের দিকে ষাট গম্বুজ মসজিদ পুনরুদ্ধার কাজ দৃশ্যমান হয়। ১৯০৮ সালে ছাদের এবং ২৮টি গম্বুজ পুনরুদ্ধার করা হয়। ১৯৮৩ সালে খলিফাতাবাদের নাম উঠে যায় বিশ্ব ঐতিহ্যে। আর এই ষাট গম্বুজের খ্যাতি ছড়িয়ে যায় বিশ্বব্যাপী। সিটি অফ মস্ক, খান জাহান আলীর শহর পরিণত হয় ঐতিহ্য অন্বেষণকারীর জন্য স্বর্গরাজ্য। শুধু কি ষাট গম্বুজ আশেপাশে আবিষ্কৃত হয় আরও দশটি মসজিদ। যা বেশির ভাগ খান জাহান আলীর সময়ের। কিছু মসজিদ তাঁর মৃত্যুর পর স্থাপত্যরীতি অনুযায়ি তৈরি করা হয়।

দুই পীরের মাজার। ছবি: লেখক

রাতের বাগেরহাট মনে হয় এই শহরের কাব্য শুনাতেই বসে ছিল। কাব্যের গদ্য যে আকাশের চাদের মতই ঝলসানো রুটি হয়ে গেছে। ছুছো দৌড়াচ্ছে পেটে। দেরি না করে চলে এলাম মুসলিম হোটেলে। যা বাস স্ট্যান্ডের আশেপাশে সব থেকে ভাল খাবার হোটেল। এর আগেরবার বাগেরহাটে এসে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছিল খাওয়া নিয়ে। তা না হয় উহ্য থাকুক। 

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্পগুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

ফিচার ইমেজঃ বাবলি চাকমা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মারায়নতং চূড়ায় অতৃপ্ত সূর্যোদয়: চান্নি পসর রাইতে প্রস্থান

মসজিদের শহর খলিফাতাবাদ: খান জাহান আলীর মাজার