মসজিদের শহর নগর খলিফাতাবাদ: রণবিজয়পুর গ্রামে

ছুটে চলছে গাড়ি। এই শহরের সাথে লেনদেন শেষ করে যেতে হবে খুলনায়। তবে খলিফাতাবাদের মায়া কি ছাড়া যায় বড়। একেবারে অটো ঠিক করে নিলাম রণবিজয়পুর গ্রাম ঘুরিয়ে নামিয়ে দিবে আমাদের আলামিন হোটেলের সামনে। সেখানে আমাদের গাট্টি বস্তা। একেবারে আদর্শ ব্যাচেলার রুম বানিয়ে এসেছি। গামছা গুলো ফ্যান ছেড়ে শুকাতে দিয়েছি। না জানি কি অবস্থা।

অটো মহাসড়ক হয়ে আবার নেমে গেল একটা গ্রামের রাস্তায়। চারপাশে আবার সবুজের দেখা। বৃক্ষগুলো আমায় কখনও হতাশ করে না। দেখতে দেখতে চলে এলাম রণবিজয়পুর গ্রামে। ছুটে চলছে অটো। রাস্তার ডান পাশে যেন এক চিলতে ঐতিহ্যের ঝিলিক দেখলাম। জঙ্গলাকীর্ণ সুনসান নিরিবিলি পরিবেশে সে যে বসে আছে একা একা পথিকের পথ চেয়ে। খান জাহান রীতিতে তৈরি এইটি বাংলাদেশের এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ গুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ।

রণবিজয়পুরের পথে। ছবি: লেখক

গ্রামবাসীর কাছ থেকে জানতে পারলাম পূর্বে এইটি দরিয়া খাঁর মসজিদ নামে পরিচিত ছিল। আবার কেউ কেউ বলে এটি ফকিরবাড়ি মসজিদ। কিংবদন্তি বলে রণবিজয়পুর গ্রাম খান জাহান আলী যুদ্ধের মাধ্যমে জয় করে, আর যুদ্ধের নিশান রাখার জন্য ১৪৫৯ সালে নিমার্ণ করা হয় এই মসজিদটি।

আকাশের অসীম চোখে ছেড়া ছেড়া মেঘ গুচ্ছ যাযাবর পথিকের মত এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। বলছে যেন আমায় যাযাবর তুমি আকাশে নিচে বেধেছো ঘর। শরতের আকাশ শুনায় মন ভুলানো গান। তবে পথিক সময় যে দ্রুত চলে যায় ফিরে দেখা যাক রণবিজইয়পুর মসজিদ।

গ্রামের পথে রণবিজয়পুর মসজিদের খোঁজে। ছবি: লেখক

স্থাপত্যের বিচারে অপূর্ব এই মসজিদটি বর্গাকার এবং এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ১৮মিটার। মসজিদটি সুলতানি আমলের রীতি বজায় রেখে লাল ইটে গড়ে উঠেছে। মসজিদের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে তিনটি প্রবেশদ্বার লক্ষ্য করা যায়। পূর্ব দিকের দেওয়ালের তিনটি প্রবেশপথ বরাবর পশ্চিম দিকে রয়েছে কারুকার্যময় ঝুলন্ত শিকলের নকশা এবং ফুলেল অলংকারখচিত তিনটি মিহরাব। মাঝের প্রবেশপথটি পার্শ্ববর্তী প্রবেশপথ দুটির তুলনায় খানিকটা ছোট।

কৌণিকের খিলানকৃতির নকশা প্রবেশপথগুলোকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য্য। সুলতানি রীতি অনুসারে মসজিদের কার্নিশ বাংলার চালা ছাদের মত নির্মিত হয়েছে। দেয়ালেরগুলো বেশ পুরু, যার ঘনত্ব প্রায় ২ মিটার। দেয়ালের অভ্যন্তরে কোন নকশা বা অলংকরণের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। তবে শোনা যায় এক সময় দেয়ালের হায়ে শোভা পেত নানান রকমের পোড়ামাটির নকশা, যা কালের কড়াল গ্রাসে হারিয়ে গেছে।

রণবিজয়পুর মসজিদ। ছবি: লেখক

মসজিদের চার কোণার চারটি মিনার যেন বিনিদ্র প্রহরীর মত আজ পাহাড়া দিয়ে যাচ্ছে। এই মসজিদের আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে এর অর্ধবৃত্তাকার গম্বুজটি। যা মসজিদকে অন্য সব এক গম্বুজ মসজিদ থেকে স্বতন্ত্রতা। গম্বুজটি স্কুইঞ্জ পদ্ধতিতে নির্মিত এবং বর্তমানে এটিকে পলিস্তারায় আবৃত দেখা যায়, যা আগে কোনাকুনিভাবে ইটে নির্মিত ছিল।

দেখতে দেখতে খলিফাতাবাদ শহর ছাড়ার সময় হয়ে গেল। তবুও এ শহরের ইতিহাসের মায়া যেন ছাড়ছে না। চলছে অটো বাগেরহাট শহরের উদ্দেশে আর আমি যেন ডুবে যাচ্ছি ইতিহাসের পাতায়। দিগ্বিজয়ী তৈমুর লংয়ের দিল্লী আক্রমণের পরপরই খান জাহান আলী এই বঙ্গদেশে আসেন। দিল্লির তুঘলক সুলতানের অধীনে তাকে এই খলিফাতাবাদের গর্ভনর হিসাবে পাঠানো হয়। সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের সাথে খান জাহান আলীর বন্ধুত্বের কথা সে তো অজানা নয়। সুন্দরবন এলাকার গভীর বন কেটে এই খলিফাতাবাদ শহর গড়ে তোলেন খান জাহান আলী।

পথিকের চোখে রণবিজয়পুর। ছবি: লেখক

তিনি বৃহত্তর যশোর খুলনা অঞ্চলে গড়ে তোলেন বেশ কয়েকটি শহর। নির্মাণ করেন মসজিদ, মাদ্রাসা, সরাইখানা, মহাসড়ক ও সেতু। তার আমলেই অত্র অঞ্চলে খনন করা হয় ৩৬০টি দীঘি। তবে তিনি খলিফাতাবাদ ছাড়াও মারুলি কসবা, পৈগ্রাম কসবা ও বারো বাজারে তিনটি শহর প্রতিষ্ঠা করেন। যার মধ্যে বারো বাজারের বিখ্যাত শহরটি নগর মোহাম্মদাবাদ বেশ পরিচিত। সম্প্রতি আর্কিলজিকাল সার্ভের ফলে সেখানেও মাটির নিচ থেকে উঠে এসেছে প্রাচীন শহরের কিছু নির্দশণ। এই শহর মোহাম্মদাবাদ নিয়ে আমি লিখেছিলাম। সে সময় ভ্রমণ সঙ্গী ছিল কায়েস ভাই। আহা কত স্মৃতি যে মনে পড়ে যায়।

রণবিজয়পুর মসজিদ। ছবি: লেখক

তবে শহর গুলোর প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল নগর খলিফাতাবাদ। এর থেকেই বুঝা যায় প্রাচীন আমলে এ শহরের গুরত্ব কতটুকু ছিল। ষাট গম্বুজ মসজিদ এ শহরের সব থেকে বড় কীর্তি। নামাজ আদায়ের পাশাপাশি এই মসজিদ ছিল খান জাহানের দরবার হল। শোনা যায় এই মসজিদের দরবারে এশার নামাজ আদায়ের সময় তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৯০।

রণবিজয়পুর মসজিদ। ছবি: লেখক

এ শহর নিয়ে আবার লিখবো না হয় কোন সময়। এবার যে খুলনা যাবার ঘণ্টি বেজে উঠছে। অটো আমাদের আলামিন হোটেলের সামনে নামিয়ে দিল। দেরি না করে রুমে ঢুকে নিজেদের ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে নিলাম। খানিক জিরিয়ে বের হলাম হোটেল রুম থেকে। এবার দাঁড়িয়ে আছি বাগেরহাট বাস স্ট্যান্ডে। গন্তব্য খুলনা হলে যেতে হবে বহুদূর। সেই চুকনগর হয়ে ভরতের দেউল। চা বিরতির ফাকে দেখতে পেলাম খুলনা বাস আসছে।

দেরি না করে উঠে বসলাম। কানে হেডফোন গুজে এলিয়ে দিলাম দেহ, ক্লান্তি জাকিয়ে বসেছে আজ। বাস ছুটে চলছে আর আমি জানলা দিয়ে মাথা বের করে পিছন দিকে চাইলাম। বিদায় শহর খলিফাতাবাদ। তুমি থেকো স্মৃতিতে। আবার আসা হবে তোমার বুকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top