fbpx

মনভোলানো মনপুরায় ক্যাম্পিং-১ম কিস্তি

মনপুরা দ্বীপের কথা আমরা সবাই জানি। সেটা গিয়াস উদ্দিন সেলিমের সাড়া জাগানো মনপুরা চলচিত্র থেকে অথবা ইলিশ মাছের আধিক্যের কারণে। আমি ছোটবেলা থেকেই মনপুরা, হাতিয়া, সন্দীপ নামের সাথে পরিচিত। পদ্মার চরে বাড়ি হওয়াতে এই এলাকার অধিকাংশের জীবিকা ছিলো মাছ ধরা। সবাই পেশাদার জেলে এরকমও নয়। বেশিরভাগই মৌসুমি জেলে। পেশায় কৃষক, সারাদিন জমিতে কাজ করে অনেকেই রাতে ছোট্ট নৌকা নিয়ে যেতো মাছ ধরার জন্য। আরেকটা অংশ ছিলো কয়েকমাসের জন্য ইলিশ মাছ ধরার জন্য চলে যেতো মনপুরা, হাতিয়া। মূলত বর্ষাকালে ইলিশ মাছ ধরার মৌসুম। বর্ষার আগেই আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে এলাকায় ধুম পড়ে যেতো বড় বড় নৌকা তৈরি করে মাছ ধরার জন্য রওনা দেওয়ার। নৌকার মালিকরা অনেকেই আত্মীয় স্বজন হওয়ার ফলে মিলাদে দাওয়াত পেতাম। আমি আমাদের বাড়ির ইমাম সাহেবের সাথে সাথে সব নৌকায় মিলাদে যেতাম আর মিষ্টি, জিলাপি, বিস্কুট খেতাম।

মাছ ধরার ট্রলার। ছবি: লেখক

এই নৌকাগুলো আবার বর্ষা শেষে মাছ ধরে ফিরে আসতো। যখন ফিরে আসতো তখন এলাকায় একটা উৎসবের আমেজ তৈরি হতো। আমরা ছোট বড় সবাই মিলে নদীর তীরে উপস্থিত হতাম সারি সারি নৌকা দেখার জন্য। প্রত্যেকটা নৌকা নানারকম ভাবে সাজিয়ে আসতো। লাল-নীল-হলুদ বিভিন্ন কাগজ রঙবেরঙের পতাকা দিয়ে সাজানো নৌকা। প্রত্যেকটা নৌকা দেখতাম আর পার্থক্য করতাম কোনটা বেশি সুন্দর হয়েছে সাজানো। নৌকা থেকে আমরা প্লাস্টিকের পুলুট (জাল ভাসিয়ে রাখার জন্য ব্যবহার করা হয়) এবং স্পঞ্জ নিতাম খেলনা বানানোর জন্য। বাড়িতে গিয়ে দেখতাম কেউ কেউ লবন দেওয়া ইলিশ দিয়ে গেছে। বিশাল বড় বড় একেকটা ইলিশের পিছ, যেগুলো এখন কোথাও দেখা যায়না। এরকমভাবে ছোটবেলা থেকে মনপুরা আমার কাছে পরিচিত। মনপুরা যাওয়ার একটা সুপ্ত বাসনা সবসময় কাজ করতো। ইদানীংকালে মনপুরায় ক্যাম্পিং আর সাইক্লিং খুব জনপ্রিয় হয়েছে পর্যটকমহলে। যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও সেরকমভাবে উপায় হচ্ছিলো না কিংবা আলসেমির কারণে যাওয়া হচ্ছিলো না। কিন্তু এবার গোপন ট্রাভেলার্সের সিজন-৯ সে সুযোগ করে দিলো।

প্রয়োজনীয় উপকরণ গোছগাছের পালা। ছবি: লেখক

গোপন ট্রাভেলার্স ব্যতিক্রমী এক গ্রুপ। প্রতিবছর একটা করে ট্রিপ আয়োজন করা হয়। ট্রিপ আয়োজনও শেষ হওয়া পর্যন্ত গ্রুপের কার্যক্রম থাকে। ট্রিপ শেষে আবার গ্রুপ বন্ধ হয়ে যায়। আয়োজকরা সবাই পরিচিত হওয়াতে প্রত্যেক সিজন শেষেই তাদের পোস্টগুলো ফেসবুক নিউজফিডে ভেসে বেড়াতো আর যাওয়ার জন্য আমার মনে উথালপাতাল ঝড় উঠতো। আর গুজব বাতাসে কান পাতলেই শোনা যায়, গোপনের ইভেন্ট থেকে আসার পরে সবার ওজন বেড়ে যায়। এবার সিজন আয়োজনের আগেই মুসা ভাইয়ের কাছ থেকে জেনেছিলাম এবারের গন্তব্য দ্বীপ জেলা ভোলার অপরূপ মনপুরা। তাই যাওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম। এক অলস দিনে ফেসবুক ঘাটাঘাটি করছিলাম এরকম সময়ে নোটিফিকেশন পেলাম গোপন ট্রাভেলার্সের গ্রুপ আন আর্কাইভ করা হয়েছে এবং নতুন ইভেন্ট খোলা হয়েছে সিজন-৯ এর, সাথে সাথেই বুকিংয়ের টাকা বিকাশে পাঠিয়ে দিলাম।

সদরঘাট দক্ষিণাচলের যাতায়াতের প্রধান কেন্দ্র। ছবি: লেখক

এবার অপেক্ষার পালা কবে আসবে ১২ ডিসেম্বর! দিন গুনতে গুনতে সময় পার হচ্ছে এরমধ্যে যাওয়ার মিছিলে যুক্ত হলো আমার নিয়মিত ভ্রমণসঙ্গীদের থেকে কয়েকজন। সর্বশেষ ৭ ক্যাম্পিংয়ের সঙ্গী জাহিদুল ইসলাম তাহান, টিওবি লাখের বাত্তি থেকে পরিচিত হয়ে পরবর্তীকালে একসাথে ঘুরে বেড়ানো শাহাদাত ভাই ও আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রাভেলার পুরান ঢাকার রাফি আহমেদ ওরফে ওয়াফি। এই ট্রিপে সবাই এমনকি গোপন ট্রাভেলার্সের ইভেন্টটাই সাইক্লিস্টদের জন্য। কিন্তু সেখানে আমরা কয়েকজন সাইকেল বিহীন। পরবর্তীতে আরো কয়েকজন পাওয়া গেলো সাইকেল বিহীন। আমাদের উদ্দেশ্য যাবো, হ্যামকে দোল খাবো আর ল্যাটাবো। দেখতে দেখতে আকাশে সূর্যের নিয়মিত উঠানামা আর জোয়ার ভাটা পার হতে হতে ১২ তারিখ চলে আসলো। মনপুরা যেহেতু চতুর্দিকে সাগর নদীবেষ্টিত তাই যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম নৌপথ। ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় দুইটি লঞ্চ ছেড়ে যায় সরাসরি মনপুরা হয়ে হাতিয়া পর্যন্ত। ৫:৩০ এ ফারহান-৪ এবং ৬:০০ টায় তাসরিফ-২। আমরা যাবো ফারহান-৪ এ।

আমাদের জন্য সংরক্ষিত স্থান। ছবি: মাজহারুল সিকদার

এরমধ্যে ম্যাসেঞ্জারে একটা গ্রুপ খোলা হয়েছে। আয়োজন আর প্রস্তুতি নিয়ে বিভিন্ন আলাপ আলোচনা চলছে। সবাই যার যার ব্যাগ গুছিয়ে আপডেট জানাচ্ছে। কিন্তু মাসুম ভাই বার বার এক ম্যাসেজ কপি পেস্ট করতেছে কেউ যেনো প্লেট, মগ আর চামচ ছাড়া না যায়। কিন্তু ট্রিপে গিয়েও মগবিহীন অনেককে পাওয়া গেলো। লঞ্চ ৫:৩০ এ হলেও প্রচার করা হলো লঞ্চ ঠিক ৫:০০ টায় ছাড়বে। আমি ঠিক ৪:০০ টায় লঞ্চে এসে উপস্থিত হলাম। যদিও মুসা ভাইসহ আরো কয়েকজন দুপুরে এসেই লঞ্চে দ্বিতীয় তলায় একদম সামনে আমাদের জন্য জায়গা রেখে দিয়েছে। আমরা লঞ্চের ডেকে করেই যাচ্ছি তাই জায়গা দখলের একটা লড়াই করতে হয়। দুই একজন বা ছোট গ্রুপ হলে জায়গা নিয়ে তেমন সমস্যা হয়না। আমরা যেহেতু ৩০ জন যাচ্ছি এবং সাথে সাইকেল আছে এবং একসাথে খাবারের ব্যবস্থা আছে তাই আগে এসে সুবিধাজনক একটা জায়গা রাখার প্রয়োজন ছিলো। কেউ চাইলে কেবিন নিয়ে যেতে পারেন। সিংগেল কেবিনের ভাড়া ১০০০ টাকা ও ডাবল কেবিন ২০০০ টাকা। ডেকের ভাড়া ৩০০ টাকা।

লঞ্চ ছাড়ার মুহূর্ত। ছবি: লেখক

সদরঘাট একটা জমজমাট জায়গা, বিশেষ করে বিকেল থেকে যখন দূরদূরান্তের লঞ্চগুলো বাহারি সব আলো জ্বালিয়ে হাক ডাক দিতে থাকে গন্তব্যের নাম ধরে আর নাড়িরটানে বাড়ি ফেরা লোকগুলোর মনে উচ্ছ্বসিত খুশি আর হাসিমুখ দেখতে অন্যরকম লাগে। হকারের মুখে মুখে হাক ডাক, হাতে বিভিন্ন রঙ-বেরঙের পণ্যের পসরা।

অন্ধকার ভেদ করে শুরু হলো রাতের যাত্রা। ছবি: লেখক

এরকমভাবে সময় কেটে গেলো আস্তে আস্তে সবাই উপস্থিত হওয়া শুরু করলো। লঞ্চ ছাড়ার সময় ঘনিয়ে এলো এর মধ্যে আবিষ্কার হলো সাইফুল বাবু ভাই ফোন অফিসে ফেলে চলে এসেছেন। আরিফ রনি ভাই গাজীপুর থেকে রওনা দিয়ে লঞ্চ ছাড়ার আগেও এসে উপস্থিত হতে পারলেন না। শেষ ভরসা হিসেবে তাসরিফ ২ এ উঠলেন। ভেঁপু বাজিয়ে লঞ্চ ছেড়ে দিলো, বাতাসের বেগ বাড়া শুরু করলো, শুরু হলো মনপুরার উদ্দেশে যাত্রা, দীর্ঘতম এক যাত্রা।

(চলবে…)

ফিচার ছবি: গোপন ট্রাভেলার্স

ভ্রমণগুরু সাইটে প্রকাশিত আমার সব পোস্ট দেখুন এই লিঙ্কে:
https://www.vromonguru.com/author/jewel/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top