fbpx

আইল্যান্ড কোয়ারেন্টাইনের দিনগুলি

১৫ই মার্চ আমি সেন্ট মার্টিন আসি কিছু দিন অবকাশ যাপনের জন্য। ১৯ তারিখ শেষ জাহাজ ছেড়ে যায় দ্বীপ থেকে। তখন আমি যাব নাকি যাব না এই চিন্তায় সিদ্ধান্তহীতায় পড়ে যাই। চিন্তা করে দেখলাম ঢাকা গিয়ে কোন কাজ নাই, অফিস বন্ধ থাকবে। আবার ইতালি বা স্পেনের মত যদি অবস্থা হয় তাহলে তো বাসা থেকে বেরই হতে পারবো না।

শেষ পর্যন্ত হিসাব মিলিয়ে দেখলাম দ্বীপে থেকে যাওয়াই ভাল। নির্জন দ্বীপ উপভোগ করা যাবে। আমি উঠেছিলাম সায়রী ইকো রিসোর্টে। আমার রুমটা একদম বিচের পাশে, ফিতা দিয়ে পরিমাপ করলে ৩ ফুটের বেশি না। তাই ঘুমাতে যাই সুমদ্রের ঢেউয়ের শব্দ শুনে আবার ঘুম থেকে জেগে উঠি ঢেউয়ের শব্দে। আমরা তিনজন ও রিসোর্টের দুইজন স্টাফ সব মিলিয়ে আমরা ৫ জন। সিন্ধান্ত নিলাম আমরা আমাদের রান্নাবান্না নিজেরাই করবো।

সমুদ্র সৈকতের সাথে লাগানো রুম

দুই দিন যেতে না যেতেই একটা সুন্দর রুটিনের মধ্য পড়ে গেলাম, দুপুর ১২টার থেকে ঘুম থেকে উঠা, রান্না শেষ করে খেয়ে, ফেসবুকিং করা। বিকেলে বিচে হাঁটাহাঁটি, সূর্যাস্ত দেখে রাতের রান্না শেষ খেয়েদেয়ে মুভি দেখে ২-৩ টার দিকে ঘুম। দেখলাম প্রতিদিন নতুন নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে, যেমন জোয়ার ভাটার টাইম, প্রতিদিন এক এক রকম সূর্যাস্ত। নীল আকাশে সাদা মেঘের দল সব মুহূর্তেই পরিবর্তণ হচ্ছে।

সবচেয়ে ভাল লেগেছে দ্বীপবাসির কালচার, সিজন চলাকালীন সময়ে স্বাভাবিক ভাবেই তারা একটু বেশি কমার্শিয়াল থাকে। কিন্তু এখন তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেমন আমরা তেমন মাছ কাটতে পারি না। মাঝে মাঝে মাছ আনলে রিসোর্টের পাশের ঘর ইসহাক ভাইয়ের মেয়েরা মাছ কেটে দেয়া । কাশেম ভাইয়ের ঘরে ভাল মন্দ কিছু রান্না করলে আমাদের এনে দেয়, মফিজ ভাইয়ের জমির তরমুজ, জাবেদ ভাইয়ের জমি থেকে কিছু সবজি আনা, আজিজ ভাইয়ের ফ্রিজ ব্যবহার করা সব কিছু মিলিয়ে এক কথায় অসাধারণ।

এরকম নীল সমুদ্রের দেখা মিলেনি আগে কখনো

তাদের আঞ্চলিক শব্দগুলোও অনেক মিষ্টি, কিছু শব্দ দিলাম বুঝার জন্য:

বিবাহের অনুষ্ঠান: মেলা।
মুরগীর রোস্ট: দুরুস কুড়া।
নাপিত/সেলুন: চুল মিস্ত্রী।
লবস্টার: পাইন্না পোক।
রিটা মাছ: গুইজ্জা মাছ।
মিলাদ মাহফিল: জলসা।
বিচ: বিক্স ।
সাইকেল : সারকেল।

দ্বীপের পরিবেশ, সেন্ট মার্টিনের পূর্ব উপকূল থেকে মিয়ানমারের দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার প্রায়। প্রথম ১০-১২ দিন ওপারের পাহাড়গুলো দেখায় যায়নি। কিন্তু আস্তে আস্তে আকাশ যখন পরিস্কার হতে লাগলো, এখন ওপারের পাহাড়গুলো খুবি স্পষ্ট দেখা যায়। আর পানির রং পুরাই নীল। আমাদের সমতল থেকে এখানে বৃষ্টি অনেক পরে হয়।

নির্জন দ্বীপের সূর্যাস্ত

এ বছর প্রথম বৃষ্টি হয় এপ্রিলের শেষের দিকে। বৃষ্টির পর সৈকতের কেয়া গাছ ও নারকেল গাছের পাতাগুলো তার যৌবন ফিরে পেয়েছে। নিজ চোখের সামনে এমন পরিবর্তন দেখলে, কার না ভাল লাগে। এখানকার আকাশ এক এক দিন এক এক রকম থাকে, প্রতিদিনের সূর্যাস্তটাও কেমন যানি অদ্ভূত মায়া নিয়ে আসে।

সংখ্যায় এবার অনেক বেশি সামুদ্রিক কচ্ছপ

অন্যান্য বছর থেকে এই বছর প্রায় ১৫-২০দিন আগেই পর্যটকের জন্য সেন্ট মার্টিন বন্ধ করে দেয়া হয়। আর গ্রিন ও অলিব কচ্ছপের ডিম দেয়ার টাইম হল ঠিক ঐ সময়টায়। গত বছরের তুলনার এ বছর ৬টি কচ্ছপ বেশি ডিম দিয়ে যায়। ৬ টি কচ্ছপের ডিম মানে প্রায় ১২০০ এর অধিক। ভাবা যায়?

সামুদ্রিক কচ্ছপের বাচ্চার সমুদ্র যাত্রা

আমি আসার আগে একটা অলিব কচ্ছপ আমাদের রিসোর্টের সামনে ২১৮ ডিম দিয়ে গিয়েছিল। সেই ডিম থেকে এপ্রিলের ৩০ তারিখ বাচ্চা ফুটে। সেই বাচ্চাগুলো হ্যাচিং থেকে তুলে সাগরে ছাড়ার মুহূর্তটা ছিল খুবি রোমাঞ্চকর। মার্চ এপ্রিল মাসে সাগরের মাছেরা ডিম দেয়। সাগরের ৮০% মাছ উপকূলীয় অঞ্চলে ডিম দেয়, কারণ সূর্যের তাপে ডিম থেকে বাচ্ছা ফুটতে সাহায্য করে। এ বছর লক ডাউন থাকার কারণে ফিসিং বোট সাগরে যায়নি। তাই আশা করা যাচ্ছে আগামি মৌসুমে অনেক মাছ পাওয়া যাবে।

অন্যরকাম সুন্দর এখন সেন্টমার্টিন

এখন ২০০-৩০০ টাকা দিয়ে যে কোন মাছ কিনতে পাওয়া যায়। আমি তরকারি রান্না করি, সাদ্দাম বাজার করে পাতিল ধোয় , টুটু ভাই কাটা কুটি, রাজু ভাই ভাত আর খিচুরি, আরিফ এগিয়ে দেয়। সবাই মিলে কাজ করাতে তেমন চাপও পড়ছেনা। রিসোর্টে থাকা পুরো ফ্রি, আর দৈনিক জনপ্রতি খরচ হচ্ছে ১০০-১৫০ টাকা মতো। কবে আসা হবে জানি না। তবে এখানে থেকে মনে হচ্ছে আমি জীবনের সোনালী দিন কাটাচ্ছি।

লেখা ও ছবি: এনজামুল হক আকাশ

লেখকের সঙ্গে তার দুই বন্ধু আরিফ ও টুটু ভাইও দ্বীপে আছেন।

Back to top