fbpx

মন চলরে লালদিয়ার বনে: চল যাই বনে

দক্ষিণের থেকে ফিরে এলাম কিছুদিন আগেই। তবুও যেন থামছে না দক্ষিণের পথে লেনদেন। সেই কুরবানি ঈদ থেকে শুরু হয়ে এখনও গাড়ি ছুটে চলছে। যদিও গাড়ির যাত্রী দুজন। সেই ঘুরে ফিরে আমি আর ওয়াফি আহমেদ। মাগুরা নড়াইল থেকে ঘুরে আসার পর থেমে থাকেনি পদযাত্রা। এক সপ্তাহ রেস্ট নেবার পর আবার ঘর থেকে দুকদম ফেলতে মনটা ছুটে যাচ্ছে যেন দক্ষিণে। সে ডাকে সারা না দিলে তো পাপ হবে। এবার দুজন মিলে তিন দিন সময় নিয়ে বের হলাম। প্রথম গন্তব্য বরগুনা পাথরঘাটার সেই লালদিয়ার সংরক্ষিত বন। যা এখন পর্যটকদের কাছে হরিণবাড়িয়া পর্যটন কেন্দ্র নামেও বেশ পরিচিত। 

তবে পাথরঘাটা যেন বান্দরবানের মতই দূর্গম। আরামে যেতে চাইলে এখানে লঞ্চে আসতে হবে কিন্তু অংকের হিসাবটা মিলবে না। বরগুনার লঞ্চের বেহাল দশা তার উপর নামিয়ে দিবে আবার কাকচিরা বন্দরে সেখানে থেকে ঘণ্টা দুয়েকের পথ। তাও যদি একটু দেরি করে লঞ্চ ছাড়তো। এই রুটের সব লঞ্চ ৬-৬:৩০ এর মধ্যে ছেড়ে দেয়। তাই আমরা ঠিক করলাম পাথরঘাটায় বাসে যাব। বিধি বাম সেই পাথরঘাটার শেষ বাস ও ছাড়বে ঢাকা থেকে রাত আটটা বাজে। কাকচিরা সত্যি আমাদের চিরে ফেললো যেন। যাই হোক বরিশালে শেষ কবে বাসে গিয়েছি খেয়াল নেই। তাই সাকুরা পরিবহন বরিশালের রাজাতে চড়ার লোভটা ফেলে দিতে পারলাম না।

সবুজে ঘেরা ভোর। ছবি: লেখক

যাই হক যথারীতি পরিব্রাজকদের জন্য সেই পবিত্র দিন বৃহস্পতিবার রাত আটটার গাড়িতে আমরা পাথরঘাটার বাসে চড়ে বসলাম। এরপর সারা রাতটা তো গল্প বলার জন্য তো পড়েই রইলো। সে গল্পের মধ্যে না হয় জেনে নেই নতুন ট্রান্সলেশন। বাসে উঠিবার পূর্বেই ওয়াফি আহমেদ ঘুমিয়ে গেল। তালের সাথে পূর্বে রাখলেও সে যে বাসে উঠিবার মাত্রই ঘুমের রাজ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে বুঝাই যাচ্ছে।

আজকে ফেরিঘাটে বেশি দেরি হল না দেখে বেশ অবাক হলাম। তবে সাকুরা পরিবহন বলতে গেলে বলা যায় এই লাইনে গরীবের এনা। বরিশাল গিয়ে পৌঁছাতে প্রায় আড়াইটা বেজে গেল। তবে পাথরঘাটার রাস্তায় বুঝা গেল তার আসল খেলা। মনে হয় রোলার কোস্টার উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পাথরঘাটা সকাল ছয়টা বাজে পৌঁছে গেলাম। এবার বাস থেকে হালকা আড়মোড়া ভেঙ্গে উপভোগ করতে লাগলাম আমাদের পাথরঘাটা।

মোটর যান আইন আমান্য করে চলে যায় আরোহী। ছবি: লেখক

তাবলীগ জামাতের কারণে হৌক বা ঈসমাইল ভাইয়ের পাথরঘাটার পার্টির কারণে হৌক এর নাম শুনেছি অনেক। বরগুনা অঞ্চলের এনজিওর কার্যক্রমের একটা অংশে পাথরঘাটাকে বেশ গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। বেশ ছিমছাম গ্রামের মত মফস্বল শহর পাথরঘাটা। এত সকালে অনেক দোকানই খুলেনি। তবে চা আর নাস্তার দোকান বাংলাদেশের যে কোন প্রান্তেই খুব সকালে খুলে যায়।

আহা সবুজ। ছবি: লেখক

সকালে নাস্তা সেরে এবার অটো রিক্সা ঠিক করলাম হরিণাঘাটা যাবার জন্য। সেখানেই হরিণবাড়িয়া ইকো পার্কের অবস্থান। তবে এই রিক্সা নেওয়াই যেন আমাদের জন্য কাল হয়ে গেল। পিচ ঢালা রাস্তা ছেড়ে যখন ইটের সোলিংয়ের রাস্তায় ঢুকলাম তখন মনে হচ্ছিলো যেন কেউ আমাকে চানাচুরের ডিব্বায় ভরে ঝাকাচ্ছে। তবুও মন ডুবে যাচ্ছে সবুজের মাঝে।

সেই ফুট ট্রেইলের ব্রিজ। ছবি: লেখক

ঋতুরাজ বর্ষা শেষে শরৎ এর আলতো ছোয়া এসেছে প্রকৃতিতে কিন্তু বিলম্বিত বর্ষা এবার শরৎ এর মাঝে এনেছে মুষলধারা বৃষ্টি। সে বৃষ্টির গল্প এই ট্যুরে অনেক হবে। কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হয়েছে পাথরঘাটায়। বৃষ্টির ছুই ছুই চুমুতে লাবণ্য বাড়িয়ে দিয়েছে যেন রাস্তার দুইপাশের গাছগাছালির, তার মাঝে ভাবুলুতায় ডুবার কোন পথ নেই। ঝাকিতে ঝাকিতে স্মরণ করিয়ে দেয় হরিণাঘাটা আর কত দূর পাঞ্জেরী।

যাই হোক অনেক কাঠ কয়লা পুড়িয়ে হরিণাঘাটায় যখন আমাদের নামিয়ে দিল তখন ঘড়ির কাটায় সাড়ে সাতটা ছুই ছুই করছে। কেউ আমাদের দেখিয়ে দিল বনে যাবার রাস্তা। সে পথে বেজায় প্যাক কাদা, তাই এড়িয়ে সুচারুভাবে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। সামনে একটা ঢালাই সুড়কি সেতু দেখতে পেলাম। তবে সেতু তো আগে বলেনি খেলা হবে। খানিকক্ষণ বাদে একটা ছোট খালের কাছে এসে পড়লাম। সেতুটা সিড়ি বেয়ে একটু উচুতে উঠে গেছে। উপরে অনেকটা ঝুলন্ত ব্রিজ স্টাইলে কাঠের পাটাতনে খানিকটা পথ।

সবুজের মাঝে হারিয়ে গেছে পথিক। ছবি: লেখক

সে পথ পেরিয়ে আবার নিচে নামলাম এবার সেই সুড়কির ব্রিজ। হেঁটে চলছি সে পথে কোন সবুজের সমরোহে। চারদিকে সবুজের মায়া, পড়তে দেয়নি পথে সূর্যের ছায়া। নাম না জানা কত পাখি কিচির মিচির করে শুনায় গান, প্রকৃতি আজ যেন ফিরে পেল প্রাণ। তবে এ সব ভাবুলুতা মনে হয় সাময়িক হয়। সামনে দেখতে পেলাম পথের বাধা। এত বড় ঢাক ঢোল পিটিয়ে যে হরিণবাড়িয়া ইকো পার্কের হয়েছিল শুরু, আজ ব্রিজের পাটাতনই হারিয়ে গেল গুরু।

প্রথম দেখা সেই ক্যানেল। ছবি: লেখক

কোথায় নিতে এসেছিলাম এক মুঠো প্রশান্তি, হয়ে গেলাম দিকভ্রান্তি। পাটাতন শূণ্য ব্রিজ সে একহারা লেন চ্যালেঞ্জ দিয়ে যায় নাটোরের বনলতা সেন। খাড়া পাহাড়ে উঠার সময় যে রকম কোন রকম পা রাখার রাস্তা থাকে তেমনেই এখানে একটা সরু স্তম্ভে কোন রকম পা রেখে যেতে হবে সামনে। পড়লে হাত পা ভাঙ্গবে না তবে কাটা ছিলা ইনজুরি হবার সম্ভবনা প্রবল। যেহেতু আগের রাতে বৃষ্টি হয়েছে স্তম্ভের রাস্তাটাও বেশ স্যাতস্যাতে। যেন পা হড়কিয়ে আজকে আমাদের সাথে হিল্লে করেই ফেলবে।

শেষ হয়নি জীবনের লেনদেন। ছবি: ওয়াফি আহমেদ

এই রাস্তা দেখে দমে গেল মাউন্ট কানামো জয়ী ওয়াফি আহমেদ। গাইগুই করা শুরু করলো সামনে যাবে না। আমার কথা এত দূর এসে এইটুকু দেখেই চলে যাব তা কি হয়। কাধে ৬০ লিটারের ব্যাগটাকে ভালভাবে ব্যাকল আপ করে নিলাম। এবার দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে সিমেন্টের বানানো রেলিংয়ে হাত রেখে ভারসাম্য ঠিক রাখলাম এরপর সামনের দিকে গুটিগুটি পায়ে হাঁটতে লাগলাম। জগিংয়ের অভ্যাস আছে তবে এত ওজন নিয়ে সরু রাস্তা দিয়ে যেতে গা দিয়ে কালা ঘাম বের হয়ে যাচ্ছে।

ওয়াফি গাইগুই করলেও শেষ পর্যন্ত দেখলাম আমার পিছুপিছু আসছে। প্রায় ১০ মিনিট এই রাস্তায় হাঁটার পর এই পথের কোন শেষ দেখলাম না। সামনের রাস্তা আরও স্যাতস্যাতে তাই যাওয়ার আর রিস্ক নিতে চাচ্ছি না। হতাশ ভাবে পিছে ব্যাক করলাম। তবে কি লালদিয়ার বনের দেখা আমাদের এখানেই শেষ হল।

ফিচার ইমেজ: ওয়াফি আহমেদ।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top