fbpx

দূর-দ্বীপবাসিনী: কুতুবদিয়া দ্বীপ

পাঠ্যবইতে সবসময় পড়েছি, দেশের সবচেয়ে বড় বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে কুতুবদিয়া দ্বীপে। স্বচক্ষে দেখতে তাই এবার আমরা যাচ্ছি সেখানে। এক রাত দ্বীপে ক্যাম্পিং করারও ইচ্ছা আছে। যেমন চিন্তা, তেমনই কাজ। উঠে বসলাম চট্টগ্রামগামী তূর্ণা নিশিথায়। সকালেই পৌঁছে গেলাম চট্টগ্রাম শহরে। সেখানে নাস্তা করে বাসস্ট্যান্ডে গেলাম। আমরা যাবো কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলায়। বাস ঘণ্টাখানেক দেরি আছে শুনে হেঁটে চলে গেলাম কর্ণফুলী ব্রিজে। একেকটা গাড়ি যায় আর ব্রিজ কাঁপতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর পেকুয়ার বাস চলে এলো। আমরা রওনা হলাম। 

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, কুতুবদিয়া বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা। এটি একটি দ্বীপ, যা কুতুবদিয়া চ্যানেল দ্বারা মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। কুতুবদিয়া উপজেলার আয়তন ২১৫ বর্গ কিলোমিটার। এর উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ তিন দিকেই বঙ্গোপসাগর দ্বারা বেষ্টিত এবং পূর্ব দিকে কুতুবদিয়া চ্যানেল ও মহেশখালী উপজেলা, পেকুয়া উপজেলা এবং চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলা অবস্থিত।

মগনামা ঘাট। ছবি: মুশতাক হোসেন

দীর্ঘদিন ধরে কুতুবদিয়া দ্বীপের গঠন প্রক্রিয়া শুরু হলেও এ দ্বীপ সমুদ্র বক্ষ থেকে জেগে ওঠে চতুর্দশ শতাব্দীর শেষের দিকে। ধারণা করা হয়, পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষের দিকে এ দ্বীপে মানুষের পদচারণা। হযরত কুতুবুদ্দীন নামে এক কামেল ব্যক্তি আলী আকবর, আলী ফকির, এক হাতিয়া সহ কিছু সঙ্গী নিয়ে মগ পর্তুগীজ বিতাড়িত করে এই দ্বীপে আস্তানা স্থাপন করেন। অন্যদিকে আরাকান থেকে পলায়নরত মুসলমানেরা চট্টগ্রামের আশেপাশের অঞ্চল থেকে ভাগ্যান্বেষণে উক্ত দ্বীপে আসতে থাকে। নির্যাতিত মুসলমানেরা কুতুবুদ্দীনের নামানুসারে এ দ্বীপের নামকরণ করেন কুতুবুদ্দীনের দিয়া, যা পরবর্তীতে কুতুবদিয়া নামে স্বীকৃতি লাভ করে। 

প্রায় ঘণ্টা তিনেক সময় লেগে গেল পেকুয়া পৌঁছাতে। অনেক জ্যাম ছিল রাস্তায়। এখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম মগনামা ঘাটে। এই ঘাট দিয়েই মূলত কুতুবদিয়ার মানুষজন যাতায়াত করেন। ঘাট থেকে দ্বীপে যাওয়ার জন্য কিছুক্ষণ পর পরই ইঞ্জিনচালিত ট্রলার আর স্পিডবোট আছে। আমরা ট্রলারে উঠে বসলাম। কুতুবদিয়া চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যেতে হবে দ্বীপে। আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগলো কুতুবদিয়ার বড়ঘোপ স্টিমার ঘাটে পৌঁছাতে। কিছুদূর হেঁটে সামনে আগালেই চমৎকার একটা শুশুকের ভাস্কর্য মন ভালো করে দেয়। তার পাশেই আরেকটা মাছের ভাস্কর্যের নিচে সুন্দর করে লেখা আছে, ‘স্বাগতম কুতুবদিয়া’। প্রথম দর্শনে ভালোই লাগলো। 

স্টিমার ঘাটের শুশুকের ভাস্কর্য। ছবি: মুশতাক হোসেন
স্বাগত জানানো কুতুবদিয়া। ছবি: মুশতাক হোসেন

ব্যাগপত্র সমেত একটা অটোতে উঠে পড়লাম ঝটপট। আমরা যাচ্ছি জেলা পরিষদ ডাকবাংলোতে। যাওয়ার পথে প্রচুর লবণের ঘের দেখা গেল। লবণের চাষ হয় দ্বীপে। ডাকবাংলোতে একটা ঘর নেয়া ছিল আমাদের জন্য। সেখানে আমরা ফ্রেশ হয়ে, লাগেজ রেখে গেলাম আমাদের ক্যাম্পসাইটে। বড়ঘোপ বাজারের পাশেই সাগর, তার পাড়েই আমাদের ক্যাম্পিং হবে। বাজারে বেশ কিছু খাবার হোটেল আছে। দুপুরের খাওয়া হয়নি। খেতে গেলাম। দেখি গলিতে নানারকম শুঁটকির পসরা সাজিয়ে বসে আছে লোকজন। জানা গেল, সেদিন শুঁটকির হাট বসেছিল। কুতুবদিয়ায় ভালো শুঁটকি পাওয়া যায়। 

দুপুরের খাবার মেন্যুতে ছিল সুরমা মাছ। ঢাকায় যে সুরমা মাছ আমরা খাই, তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের এটা। খুবই সুস্বাদু! ভাবছিলাম, ঢাকায় সুরমার নামে কি খাই কে জানে! খাওয়া শেষ হলে আমরা অটো রিজার্ভ করে ঘুরতে বের হলাম। দ্বীপে জেনারেটর আর সৌর বিদ্যুৎ দিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো হয়। ঘোরাঘুরি পর্ব তাই সন্ধ্যার আগেই শেষ করা ভালো।

শুঁটকি! ছবি: লেখক

প্রথমেই আমরা চলে গেলাম দ্বীপের পশ্চিম সৈকতে। কুতুবদিয়ায় আছে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত। নিরিবিলি এই সৈকতে মানুষের আনাগোনা একেবারেই কম। আমরা আমরাই ছিলাম। কি ভালো লাগছিল! তেহজীব আর আমি বালু দিয়ে খেলছিলাম। সমুদ্রে গেলে এটা আমাদের প্রিয় খেলা। 

সৈকত ধরে উত্তর দিকে গেলে দেখা যাবে দ্বীপের বাতিঘর। জানা যায়, প্রাচীনকাল থেকে চট্টগ্রাম ছিল একটি সমুদ্রবন্দর। সেকালে সামুদ্রিক জাহাজে উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ছিল না, অভিজ্ঞ নাবিকরা প্রাচীন প্রচলিত পদ্ধতিতে সাগর-মহাসাগর পাড়ি দিতেন। ব্রিটিশ শাসনামলে বন্দরের শ্রীবৃদ্ধি ঘটলেও সমুদ্রে জাহাজ পরিচালনায় কোন সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার ব্যবস্থা ছিল না। ১৮২২ সালে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস উপকূল ভাগ বিধ্বস্ত করে দেয়। প্লাবনের ফলে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় সমুদ্রবক্ষে পলি জমে সৃষ্টি হয় অনেক চর। বিস্তীর্ণ এলাকায় নতুন নতুন চর জেগে ওঠার ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে দেশী-বিদেশী জাহাজ চলাচলে সমস্যা দেখা দেয়। নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচলের স্বার্থে ব্রিটিশ সরকার বাতিঘর স্থাপনের জন্য জরিপ কাজ পরিচালনা করে এবং চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ২৫ মাইল দক্ষিণে তিন দিকে বঙ্গোপসাগর পরিবেষ্টিত কুতুবদিয়ায় একটি বাতিঘর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সবচেয়ে প্রাচীন বাতিঘরটি ছিল কুতুবদিয়ায়। কুতুবদিয়া বাতিঘরের নির্মাণকাল ১৮৪৬ সাল এবং ঘূর্ণায়মান বাতি স্থাপিত হয় ১৮৯২ সালে।

কুতুবদিয়ার পশ্চিম বিচ। ছবি: লেখক
অদূরে লাইট হাউজ। ছবি: লেখক

পাথরের ভিতের উপর নির্মিত কুতুবদিয়া বাতিঘরটির উচ্চতা ছিল প্রায় ৪০ মিটার। আট তলা বাতিঘরের সর্বোচ্চ কক্ষে জ্বালানো হত বাতি। বাতিঘরটি ১৮৯৭ সালের প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমগ্র লাইট হাউজ নড়বড়ে হয়ে যায়। ১৯৬০ সালের ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে স্থায়ী ভাঙ্গনে বিলীন হবার পূর্ব পর্যন্ত এ বাতিঘর বিরামহীন আলো দেখিয়ে সমুদ্রগামী জাহাজের নাবিকদের প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূর থেকে দিকনির্দেশনা দিত। বর্তমানে বাতিঘরটি লোহার তৈরি সুউচ্চ একটি স্থাপনা। দূর থেকেই দেখতে হলো। ভেতরে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। 

উইন্ডমিল। ছবি: লেখক

পড়ন্ত বিকালের সৈকতে আমাদের অনেকটা সময় কেটে গেল। এরপর গেলাম বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র দেখতে। ছোটবেলায় বইতে অবাক হয়ে ছবি দেখতাম উইন্ডমিলের। এখন তেহজীব যেমন দেখে অবাক হয়। ওকে যখন উইন্ডমিলের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলাম, সে কি খুশি! সত্যি বলতে আমারও খুব ভালো লাগছিল। সূর্যটা তখন ডুবে যাওয়ার আগের কমলা আভায় রাঙা। সেই আলোতে উইন্ডমিলগুলো কেমন অন্যরকম লাগছিল। পাশেই লবণের ক্ষেত। আমরা একটু লবণও চেখে দেখলাম। দানাদার, মোটা লবণ। 

লবণের ঘের। ছবি: লেখক

সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। আমাদের ক্যাম্পিংয়ের আয়োজন করতে হবে। ডাকবাংলোতে ফিরে কাপড় পাল্টে রওনা হলাম ক্যাম্পসাইটের উদ্দেশ্যে। যাওয়ার পথে বড়ঘোপ বাজারে হালিম, গজা, জিলাপি খেয়ে নিলাম। আহ! গরম গরম জিলাপি! বাকিদের জন্যেও কিনে নেয়া হলো। যেয়ে দেখি আশরাফ ভাইসহ বাকিরা তাঁবু খাটানোতে ব্যস্ত। দেখতে দেখতে তাঁবুগুলো পিচ করা হয়ে গেল। 

এদিকে তাঁবু দেখে স্থানীয় বাচ্চাকাচ্চাসহ অনেকেই ভিড় করে দাঁড়িয়ে গেলেন। তারা পর্যটক দেখে অভ্যস্ত, কিন্তু হয়তো তাঁবুতে থাকাটা তাদের কাছে নতুন। বেশ কিছুটা সময় লাগলো ক্যাম্পিংয়ের জায়গাটা খালি হতে। আর এইখানে যে এতো কুকুর! বলার মতো না। রীতিমতো তাঁবু কামড়ে, আঁচড়ে একাকার করে ফেলছিল। আমরা সৈকতের পাশেই যে হোটেলটা, সেখানে বারবিকিউ আর পরোটা দিয়ে রাতের খাবার শেষ করলাম। তাঁবুর সামনে ক্যাম্পফায়ার করা হলো। তেহজীব খুব শখ করেছিল ক্যাম্পফায়ার দেখবে। কিন্তু তার আগেই ঘুম! মুশতাক বাকিদের নিয়ে বসে গেল কার্ড খেলতে। আমিও শুয়ে পড়লাম। 

আহ! জিলাপি। ছবি: লেখক

রাত কয়টা বাজে জানি না, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। কুকুরের ডাকে আর তাঁবু ধরে টানাটানিতে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। বাইরে বের হয়ে এলাম। দেখি আকাশে সোনালী থালার মতো একটা চাঁদ। পানিতে তার ছায়া পড়ে চিকচিক করছে। দূরে মাছ ধরা নৌকাগুলো আবছা আলোয় কেমন অদ্ভুত লাগছে! 

ভোরেই ঘুম ভাঙলো। তাঁবুর বাইরে বের হয়ে দেখি, আবারও অনেক লোকজনের আনাগোনা। সবাই অবাক, এগুলো কি আর আমরা এগুলোতে কি করছি! অবাক কতোগুলো দৃষ্টিকে পেছনে ফেলে আমি হাঁটছি সমুদ্রের দিকে। সেখানে এক ঝাঁক গাংচিল তখন ঢেউয়ের তালে দোল খাচ্ছে। 

মহেশখালীর উদ্দেশে ট্রলারে। ছবি: শাহেদ ভাই

কুতুবদিয়াকে বিদায় জানানোর সময় হয়ে এলো। স্টিমার ঘাট থেকে ট্রলারে উঠে বসলাম। প্রায় তিন ঘণ্টা ট্রলারে এবং আধা ঘন্টা অটোরিকশায় যাত্রা শেষে পৌঁছালাম মহেশখালীর ঘটিভাঙা ঘাটে। আমাদের গন্তব্য এইবার সোনাদিয়া। 

কুতুবদিয়া ট্যুরের ইউটিউব লিংক:
https://youtu.be/ftGUaRuTeLY

আমার অন্যান্য ভ্রমণকাহিনী পড়তে ক্লিক করুন এই লিংকে: https://www.vromonguru.com/author/azmi/

বিঃদ্রঃ নিজের দেশ পরিচ্ছন্ন রাখুন। ময়লা-আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন।

ফিচার ছবি: লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top