ভূষণার রাজা সীতারামের দেশে: কবি কাদের নেওয়াজের বাড়ি

শ্রীপুরের পথে পথে সবুজের সারি
বেখেয়ালী কবির আঁখি হল ভারি
যেখানে আমি খুঁজে পাই বৃক্ষের শীতলতা
সেখানেই কবি কহে গল্প কথা।

গল্প গুলো বাড়ি গেছে
যাযাবর বলে কি, বলি আমি মিছে
শব্দের বুননে গড়ে তুলি শিল্প
পরিব্রাজকের ঝুড়িতে ফুরায় না গল্প।

বলেন কবি বাংলার রুপের কথা
কিংবদন্তি হয়ে থাকবে নতুন রুপকথা।

যাব কবি কাদের নেওয়াজের বাড়ি একটু কবিতা না হলে কি হয়। শিক্ষকের মর্যাদা নিয়ে যে শুনিয়েছিল গল্পের কাব্য সেই কবির স্মৃতিকে স্মরণ করে না হয় একটু ভাবুলুতার প্রকাশ। ‘বাদশাহ আলমগীর কুমারে তাঁহার পড়াইত এক মৌলভী দিল্লীর; একদা প্রভাতে গিয়া, দেখেন বাদশাহ-শাহাজাদা এক পাত্র হস্তে নিয়া; ঢালিতেছে বারি গুরুর চরণে…’ ছোট বেলায় এই কবিতা পড়েনি এমন মানুষ এখন খুঁজে পাওয়া বড় বিরল। সেই বিরল প্রজাতির মধ্যে নতুন প্রজন্ম কি পড়েছে আমার জানা নেই, জানা নেই এই কবিতা এখনও পড়ানো হয় কি না, তবে কাদের নেওয়াজকে তো এই কবিতার মাধ্যমেই চেনা।

ভিতর থেকে বাহির। ছবি: লেখক

ছুটে চলছে আমাদের ত্রিচক্রযান। অনন্ত এই ছুটে চলার শেষ কোথায়, আমি ছুটে যাব মহাকালের শেষ অবধি চোখে মুখে এক রাশ অবাস্তব স্বপ্ন নিয়ে। লোকে বলবে পাগল, বয়সের ভারে ছাগল। তবুও তো তুমি জানো প্রকৃতি মা, আমি এই সবুজ কত ভালোবাসি। রাস্তার দুপাশে নুয়ে পড়া বৃক্ষ যেন চুইয়ে চুইয়ে আমার গালে সবুজের ছোঁয়া দিয়ে যাচ্ছে। আমি হারিয়ে যাচ্ছি কোথাও যেন। এই রাস্তা, এই গ্রাম বাংলা দেখেই কি কবিরা এত পাগল হত। চির সবুজের দেশে সে তো মিছে বলে যায়নি কবিরা।

বাংলা সাহিত্যের কৃত্তিমান এই কবি ১৯০৯ সালের ১৫ জানুয়ারি মুর্শিদাবাদ জেলার মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। মাগুরার শ্রীপুরের মুজদিয়া গ্রামেই ছিল কবির বসতভিটা। তার পৈতৃক নিবাস বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট গ্রামে। নেওয়াজ সাহেবের ইংরেজি সাহিত্যে ছিল পাণ্ডিত্য, তাই তো ইংরেজি সাহিত্যে তৎকালীন ব্রিটিশ আমলে বহরমপুর কলেজ থেকে ১৯২৯ সালে ইংরেজিতে অনার্স পাস করেন। সে সময়কার মুসলিম সমাজের জন্য সে ছিল রেয়ার ব্রিড মানুষ। কারণ মুসলিমদের ইংরেজি শিক্ষার প্রতি অনীহা ছিল অনেক।

আমাদের ভ্যানয়ালা মামা দেখছেন লুকানো ঐতিহ্য। ছবি: লেখক

দেশ ভাগের পর ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ ত্যাগ করে তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৫১ সালে দিনাজপুর জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হয়ে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। এরপর সুদীর্ঘ ১৬ বছর সুনামের সাথে চাকুরি করে স্বপদে বহাল থেকে ১৯৬৬ সালে শিক্ষকতার পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অতঃপর ফিরে আসেন সেই প্রাণের মুজদিয়া গ্রামে। এখানেই তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।  ১৯৬৩ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরষ্কার ও প্রেসিডেন্ট পদক লাভ করেন। কথায় আছে না ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙ্গে। মুজদিয়া গ্রামের বাড়ি ফিরে এসেও শেকড়ের টান ভুলতে পারেননি। এখানে কিছুদিন শ্রীপুর মহেষচন্দ্র স্কুলের প্রধার শিক্ষকের দ্বায়িত্ব পালন করেন।

সবুজের মাঝে এক চিলতে ঐতিহ্য। ছবি: লেখক

ছোট থেকেই স্বপ্ন ছিল কবি হবেন। সাহিত্যিক পরিবেশে বেড়ে উঠা তার কবি হয়ে উঠার পথ সুগম করেছিল। বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃতি, আরবি, ফার্সি ভাষায় ছিল তার অসম্ভব পাণ্ডিত্য। ভারত ও বাংলাদেশের পত্রিকায় ছাপানো হয়েছে তাঁর অসংখ্য কবিতা ও বিভিন্ন রচনা। তার লেখা উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে আছে মরাল, নীল কুমুদী। ছোটদের জন্য লিখেছেন দাদুর বৈঠক ও দস্যু লাল মোহন। তার প্রকাশিত উপন্যাসদ্বয় হচ্ছে উতলা সন্ধ্যা ও দুটি পাখি দুটি তীরে। ১৯৮৩ সালের ৩ জানুয়ারি এই মহান কবির মৃত্যুর পর তার গ্রামের বাড়ি মুজদিয়াতে তাকে দাফন করা হয়। প্রতি বছর মাগুরায় তাঁর জন্ম মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত হয় নানান অনুষ্ঠান।

ভাবে আছে লেখক। ছবি: ওয়াফি আহমেদ

মাগুরা আসার পর ইতিহাসের ফ্ল্যাশব্যাক অনেক বেশি হচ্ছে। কিন্তু ফিরে না যেয়েও তো উপায় নেই। দেখতে দেখতে চলে আসলাম কবির বাড়ির কাছে। ভ্যান একেবারে বাড়ির গেটের সামনে নিয়ে দাঁড় করালো। এই তো সেই ভিটা আজ কালের সাক্ষী হতেই তো কংকালসার হইয়ে আমাদের সামনের দাঁড়িয়ে আছে। অযত্ন অবহেলার ছাপ বাড়ির প্রতিটা কোণে, যেন এ বাড়ির প্রতিটি ইট সুড়কি শুনাতে চায় কোন আলিসান গল্প। সেই গল্প শোনার জন্যই আমি আর ওয়াফি হারিয়ে গেলাম বাড়ির মোহমায়ায়। যেন বলতে চাইছে শব্দ জাদুর রাজ্যে তোমায় স্বাগতম পথিক।

ঘুরে ফিরে দেখছি বাড়ির ভিতর বাহির। খালি রুমে যেন প্রেমিক প্রেমিকার মিলনের দাগাদাগিতে পূর্ণ  করেছে। অমুক + তমুক এর ভিতরে বন্দী ভালোবাসা। পুরাকীর্তি কান্নায় যে একটু খানি জাগায় আশা। পুরাকীর্তি গাঁয়ে দাগানো যে ইতিহাসের কোন এক টুকরোকে কলুষিত করা সে কথা যদি মানুষ বুঝতো। প্রথম তলা থেকে ঘুরে দ্বিতীয় তলায় আসলাম। দ্বিতীয় তলার বারান্দায় বেশ কিছু চমটকার ভিউ পেলাম। তাই ছবি তুলতে দেরি করলাম না। এবার বাড়ির ছাদে গিয়ে আশেপাশের শান্ত পরিবেশের মাঝে খানিকের জন্য হারিয়ে গেলাম।

বাড়ির পিছন দিক। ছবি: লেখক

অযত্নের ছাপ যেন জানান দিচ্ছে শতাব্দির অবহেলার আত্মকথা। দালানের ইট সুড়কি পলেস্তর খসে খসে পড়ছে। জানাল দরজাগুলোও কবে খুলে গেছে, রয়ে গেছে ভবনের কংকাল। শেষ স্মৃতি রক্ষা করার কোন তাড়া যেন নেই। রবি কাজীর সময়ের কবি ছিলেন নেওয়াজ সাহেব। তাদের ছায়াতলে খুব হাকডাক হয়তো ডাকতে পারেন নেই। তবে তিনি যে ছিলেন দূর্দান্ত প্রতিভা সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়েই তো বিশ্বকবি তার শান্তি নিকেতন বেড়াবার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আজ কবি নেই, তার বাড়িও নেই নেই অবস্থা। এক রাশ কষ্ট নিয়ে বের হলাম কাদের নেওয়াজের বাড়ি থেকে।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top