fbpx

ভূষণার রাজা সীতারামের দেশে: বউ ঠাকুরানীর হাট

মাদ্রাসা প্রাঙ্গন থেকে বের হয়ে তিক্ত একটা গরম অনুভব করলাম। আকাশটা মেঘলা মেঘলা। শরতের আকাশে মেঘ জমেছে বৃষ্টির আগমনী বার্তা নিয়ে। মাদ্রাসার পিছনের রাস্তা দিয়ে আমরা এসে পড়লাম জমিদার বাড়ির উলটা দিকের প্রাঙ্গনে। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে পুরানো স্থাপনা। তবে বিধিবাম পুরানের মাঝেই যে নতুনের অবস্থান। লাল ইটের স্থাপনা দেখা যাচ্ছে দুই তলায়, নিচের তলায় সাদা চুন কাম করা নতুন স্থাপনা। আহারে এই জমিদারবাড়ির বউ ঠাকুরানী নিয়েই তো বিশ্বকবি উপন্যাস লিখেছিলেন। সুরমার স্মৃতিজড়িত এই শ্রীপুর জমিদার বাড়িটা কালের কড়াল গ্রাসে শুধুমাত্র অস্থিমজ্জা টিকে আছে। উপরে খোকলা হয়ে গেছে কবে। ফিরে যাই না হয় ইতিহাসের পাতায়।

মোগল আমলের শুরুর দিকে শ্রীপুর জমিদারের পূর্ব পুরুষ সারদা রঞ্জন পাল নবাব আলী বর্দী খা’র কাছ থেকে কিনে নেন শ্রীপুরের জমিদারি। সে সময় যশোর রাজ প্রতাপাদিত্যের যশ ছড়িয়ে পড়েছিল পূর্ব থেকে পশ্চিমে। বারো ভুইয়াদের অন্যতম প্রতাপশালী রাজার দম্ভে কাপতো মোগল সেনাপতিরা। কি শের খাঁ, কি ইব্রাহীম খাঁ। সামান্য ভূস্বামী, সামান্ত্য রাজা মনে করে ভুলে করে বসেন সম্রাট আকবর। তার রক্তে যে বইছে বিক্রমাদিত্যের রক্ত। দুইবার সেনাবাহিনী পাঠানো হল প্রতাপকে পরাজিত করতে। কিন্তু দুইবার পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে পিছাতে হয় মোগল বাহিনীর। বিভিন্ন এলাকার ভূইয়াগণ তাঁর সহিত মৈত্রী স্থাপন করে মোঘল বাদশাহের বিরুদ্ধে সম্মিলিত জোট তৈরি করলো প্রত্যাপাদিত্য।

শ্রীপুর জমিদার বাড়ি যাবার রাস্তা। ছবি: লেখক

যশোর নগর ধাম      
প্রতাপ আদিত্য নাম
মহারাজা বঙ্গজ কায়সত্ম
নাহি মানে পাতশায়,      
কেহ নাহি আটে তায়
ভয়ে যত ভূপতি দ্বারস্থ
বরপুত্র ভবানীর      
প্রিয়তম পৃথিবীর
বায়ান্ন হাজার যার পল্লী
ষোড়শ হলকা হাতি      
অযুত তুরঙ্গ সাতি
যুদ্ধকালে সেনাপতি কালী

সেই যশোর রাজ প্রত্যাপাদিত্যের পদধূলিতে মুখরিত হয় শ্রীপুর জমিদার বাড়ি। তখন সারদা রঞ্জন পালের কন্যার বিভা পালের সাথে তার ছেলে উদয়াদিত্যের সঙ্গে হয়। বৈবাহিক সম্পর্ক এক করে দেয় দুই রাজ পরিবার। যে ভগ্নদশা জমিদার বাড়িটা আমরা দেখছি সেটি প্রায় ৪০০ বছর পুরানো। যশোর রাজ প্রতাপাদিত্যের সহযোগিতায় সারদা রঞ্জন নির্মাণ করেন এই জমিদার বাড়ি।

প্রতাপাদিত্য ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজা, আর সারদা রঞ্জন তার তুলনায় উদার মনের মানুষ। দুই জন দুই মেরুর মানুষ, সম্পর্ক ফাটল ধরা সে তো সময়ের ব্যাপার ছিল। দুই অভিজাত রক্তের এই দূরত্বে প্রভাব ফেলে বিভা পালের সংসারে। সেই ফাটলের গল্প নিয়েই তো তিন শতক পরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন ‘বউ ঠাকুরানীর হাট’। সেই উপন্যাসের উদায়াদিত্যের স্ত্রী সুরমাই মূলত সারদা রঞ্জন পালের মেয়ে বিভা পাল। উপন্যাসে বার বার বিভাকে বলা হয়েছে শ্রীপুর জমিদার বাড়ির কন্যা হিসাবে। সেই বিভা পালকে যত্ম করে ছদ্মনামে নিয়ে এসেছেন বিশ্বকবি। যেন হারিয়ে যাই উপন্যাসের পাতায়।

পথের দাবি। ছবি: লেখক

‘রাত্রি অনেক হইয়াছে। গ্রীষ্মকাল। বাতাস বন্ধ হইয়া গিয়াছে। গাছের পাতাটিও নড়িতেছে না। যশোহরের যুবরাজ, প্রতাপাদিত্যের জ্যেষ্ঠ পুত্র, উদয়াদিত্য তাঁহার শয়নগৃহের বাতায়নে বসিয়া আছেন। তাঁহার পার্শ্বে তাঁহার স্ত্রী সুরমা।’

সেই প্রিয়তম উদয়াদিত্য ধৈর্য্য ধরে সুরমার সাথে সুখের সংসার করতে চেয়েছিলেন। পেয়েছিল কি সুখ। রাজপ্রাসাদের জন্মের অভিশাপ নিয়ে উদয়াদিত্যের জীবনে সুরমা এসেছিল দক্ষিণা হাওয়ার মত। এরপর কি হল। তা জানতে হলে তো পড়তে হবে ‘বউ ঠাকুরানীর হাট’। ইতিহাস ও সাহিত্যের জগৎ থেকে না হয় ফেরা যাক বাস্তবে। আমাদের ওয়াফির আজকাল চেতনা উঠেছে ফটো তোলার। চেগিয়ে বেকিয়ে, বুক উঁচু করে বিভিন্ন অঙ্গ ভঙ্গিমার ছবি তুলে দিতে গিয়ে কিঞ্চিত বিরক্তবোধ করলেও শিল্পী মনে আঘাত দিতে নেই। সে তো ছবিয়াল কবি।

টিকে আছে শুধু সিংহ দুয়ার। ছবি: লেখক

আমাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন এক ভদ্রমহিলা। জিজ্ঞেস করলেন আমাদের কেন এসেছি। বললাম আসলে এই জমিদার বাড়িটা দেখতে এসেছি। শুনে অবাক হলেন। তবে তার রক্তে যে অভিজাত রক্ত ধারা বইছে সেইটা তার বংশের ইতিহাসের আশ্রুধারা হয়ে জমাট বেধে আছে চোখের কোনায়। উনি সারদা রঞ্জন পালের বংশধারা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এই বংশের নতুন বউঠাকুরানী। কপালে লাল সিঁদুর, চলনে অভিজাত সেই ধারা যেন বিভা পাল ফিরে এসেছে এই জমিদারির শেষের গল্প দেখতে।

শুনালেন বউদি মাদ্রাসার অংশের গল্প। তার চাচা শশুর মশাই এই অংশ মাদ্রাসার কাছে বিক্রয় করে ঢাকা পারি জমিয়েছেন। আর তারা পড়ে আছেন শেকড় ধরে, এই জমিদারি যে তাদের হৃদয় জুড়ে। দীর্ঘশ্বাসের সাথে সেচ্ছায় তারা গ্রহণ করেছে রাজ রক্তের কারাবাস। যাক বউদির কাছে সাদা চুনকাম করা একতলার গল্পটিও শুনলাম। এই অংশটিও নাকি তিন পুরুষ আগে নির্মান হয়ে। হিসাব করলে এর বয়সও ৮০-৯০ হবে। এই সাদা অংশ জুড়েছে লাল ইটের দুই তলা বিল্ডিংয়ের সাথে। গল্পের ছলে বউদি বললেন কবি কাদের নেওয়াজের বাড়ি ঘুরে যেতে ভুলো না ভাই। এইটা যে শ্রীপুরে পড়েছে সে কথা আমার মাথায় ছিল না। যাই হক এবার যে বিদায়ের নেবার পালা।

ভিতর থেকে বাহির। ছবি: লেখক

এই বাড়ির সাথে বিদায় পর্ব ও আমায় মুগ্ধ করেছে। প্রজা নাই, নাই জমিদারি এরপরও রক্তে যে আছে আভিজাত্য।

বউদি বলে উঠলেন, ‘কোথায় যাচ্ছো তোমরা, আজকে জল খাবার আমাদের সাথে করে যাও।’

তার এই সরল ভাবে বলার মাঝেও যে আভিজাত্যের অহমিকা লুকিয়ে আছে, আর বলে বাঙ্গালির অতিথি আপ্যায়নের সংস্কৃতি। চেনা নাই, জানা নাই এরপর দুজন অপরিচিত মানুষ কে ক্ষণিকের পরিচয়কে আপন করে নিতে পারে। এর জবাব কি হবে।

‘বউ’দি আপনি বলেছেন এইটা আমাদের জন্য অনেক, অপরিচিত মানুষের জন্য আপনার এই কথাটুকুই অনেক। কিন্তু আমাদের যে যেতে হবে।’ বউদি আমাদের বাধা দিলেন না। তবে তার চোখে আকুতি ছিল থেকে গেলে কি হয়। বাংলার পথে পথে পেয়েছিলাম এমন সাদা মনের মানুষ। পরিব্রাজক মনের আর কি চাই। শহরের মানুষদের মত এরা স্বার্থপর নয়। শ্রীপুর জমিদার বাড়ি প্রস্থান করে আমাদের ভ্যান যাচ্ছে নতুন কোন পথের সন্ধানে।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top