ভূষণার রাজা সীতারামের দেশে: শ্রীপুর জমিদার বাড়ি

দিনের প্রথম ঘণ্টাটি শেষ হয়নি। সাত ঘটিকায় উঠেছিলাম ভ্যানে। এখন ঘড়ির কাটা টিকটিক করে জানান দিচ্ছে আটটা বাজতে আরও পাঁচ মিনিট বাকি। আর আমাদের ভ্যান সো সো বেগে ছুটে চলছে পিচঢালা এই পথে। যেন এখানেই খুঁজে পেয়েছে মায়া। ঠিক কাটায় কাটায় ভ্যান আমাদের শ্রীপুর যাবার বাস স্ট্যান্ডের সামনে নামিয়ে দিল। মামার মুখে তৃপ্তির হাসি। যেন দ্বিগ্বিজয় করে এলেন। বাসে উঠে বসার পাঁচ মিনিটের মাথায় ছেড়ে দিল। সারা রাত ঘুম ভাল হয়নি। আধা ঘণ্টার রাস্তা এই মুরগীর খোপে আধো ঘুম আধো জাগরণে কেটে গেল। এত কম লেগ স্পেস আর পাশে যদি ওয়াফি থাকে তাহলে তো কথাই নেই। সেই ঘুমাচ্ছে হা করে। যেকোন সময় মাছি ঢুকে যেতে পারে।

শ্রীপুর উপজেলা ঢুকার মুখেই কুমার নদী দেখতে পেলাম। একটা ছোট ব্রিজ পার হয়ে আমাদের বাস নামিয়ে দিল। এই ব্রিজের পাশেই একটা ছোট পার্ক। ভাবলাম জমিদার বাড়ি হয়ে এখানে আসবো। সে অনুযায়ি খুঁজতে লাগলাম ভ্যান। নয়টা এখনও বাজেনি শরতের শুভ্র সকাল। আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা মেঘের দল, যেন বলতে চায় পথিক আমার সাথে চল। নীল আকাশের ছেড়া ছেড়া ছন্নছাড়া মেঘেদের দল সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়ে জানান দিচ্ছে নতুন দিনের বার্তা। মন ভাল করে আবহাওয়া ছুটে চলছে আমাদের ত্রিচক্রযান, পিচ ঢালা পথে আবার ফিরে এল যে প্রাণ।

আলো আধার। ছবি: লেখক

শ্রীপুর জমিদার বাড়ি যাবার রাস্তাটা অনেক সুন্দর, সবুজের আচ্ছাদনে ঘেরা। বড় বড় বৃক্ষ মাথা নুইয়ে সড়কের সাথে যেন মিশে যেতে চায়। আকাশটা সবুজের এই সারিবদ্ধ বৃক্ষের আড়ালে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। উপরে তাকালে সবুজ ভেদ করে এক চিলতে আকাশ দেখা যায়। আর সড়কে পড়েছে সেই মহীরুহের ছায়া, এই সবুজের মাঝে পরিব্রাজক মন না হারালে বল কোথায় হারাবে। আমি যে একমুঠো সবুজের ছোঁয়া চাই, পাই না সহজে ওই নাগরিক জীবনে, ওয়ই ইট পাথরের শহরে। শহর ছেড়ে নেমেছি গ্রামের পথে আহা বৃক্ষগুলোও যেন আমার সাথে ছুটছে। তোমার ছায়া, তোমার নির্জনতার, তোমার কোমলতা কি আমায় ছুয়ে যায়নি বৃক্ষ? বৃক্ষের অভিশাপ কেমনে বইবে এই মানব সভ্যতা?

ভাবলুতার জগৎ থেকে ফিরে এলাম বাস্তবে। আমাদের ভ্যান কখন যে শ্রীপুর জমিদার বাড়ির সামনে এসে পড়েছে খেয়ালই ছিল না। সামনে সেই জমিদার বাড়ির সিংহ ফটক। ভগ্ন দশায় বলা যায়। টপাটপ কিছু ছবি তুলে ভিতরে ঢুকতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হলাম পিছে ডাক শুনে। মামা দাঁড়ান এইটা তো মহিলা মাদ্রাসা ভিতরে ঢুকবেন কিভাবে। ভ্যানয়ালা মামার কাষ্ট হাসি যেন দিচ্ছে আমাদের নতুন চ্যালেঞ্জ। যথারীতি কলিংবেল টিপার পর এক সুরেলা কণ্ঠের মেয়ে মানুষ বলে উঠলেন আপনারা কারা।

ভিতর থেকে বাহির। ছবি: লেখক

আমি বললাম, ‘আপু আমরা ঢাকা থেকে এসেছি আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের জন্য।’

সুরেলা আপু – ‘এইটা তো মহিলা মাদ্রাসা। পুরুষ মানুষ প্রবেশ নিষেধ৷’
আমি – ‘আপু আমরা ভিতরে একটু দেখেই চলে যাব৷ সেই ঢাকা থেকেই এসেছি৷’
সুরেলা আপু – ‘ঠিক আছে দাঁড়ান, খুলে দিচ্ছি৷’

তালা খোলার শব্দ শুনলাম৷ আমাদের ভ্যানয়ালা আমাদের দিকে হা করে তাকিয়ে রইলো৷ যেন বলতে চাচ্ছে এও কি সম্ভব? ভ্যানয়ালা মামা বলে উঠলেন এর আগে তিনি অনেক পর্যটক নিয়ে এসেছেন এখানে কাউকেই ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আমরা এই রকম ভুজুংভাজুং দিয়ে যে পটিয়ে ফেলবে সে কথা হয়তো ভাবেনি৷ আমরা ভিতরে ঢোকা মাত্রই আপুটা মুখে ওরনা চাপা দিয়ে ভো দৌড় দিল৷ আমরা ঘুরে ঘুরে দেখছি। আর অন্দর মহল থেকে শুনি খিলখিলানো হাসি৷ একটু উঁকিঝুঁকি করছে মেয়েদের দল৷ চোরা দৃষ্টি ধরা পড়লে আবার হাসতে হাসতে ভিতরে চলে যাচ্ছে৷ মনে হয় এতগুলো মেয়েদের বিনোদন দেওয়ার জন্যই যেন জগৎপিতা আজ আমাদের এই শ্রীপুর মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে৷ এদের জগৎতে পুরুষ মানে অন্য গ্রহের প্রাণি৷ মনে পড়ে গেল আমার বড় ভাইয়ের বন্ধু সিকান্দার আবু জাফর ভাইয়ের বাসার সেই মেয়ের কথা৷ সে দিন আমি আর আমার আমেরিকা প্রবাসি বড় ভাই বসে ছিলাম সিকান্দার ভাইয়ের ড্রইংরুমে৷ টুংটাং কলিং বেল বাজলো৷ দেখলাম ভাবী গেট খোলার সাথেই সাথেই মেয়েটা বলে উঠলো, ভাবী পরে আসি, এখানে তো পুরুষ আছে! পুরুষ৷!

লেখকের নূরানী চেহারা। ছবি: ওয়াফি আহমেদ

সেদিন থেকেই এখানে তো পুরুষ আছে লাইনটা আমি ভুলতে পারি না৷ সামনের সিংহ ফটকটাই আছে হয়তো এই জমিদারির ইতিহাসের সাক্ষি হয়ে৷ সিংহ ফটকের ভিতরে তিন চারটা টিনেসেডের মাদ্রাসা৷ টিনসেডের ঘর পার করে দেখা যাচ্ছে এক চিলতে পুরানো দালান। এইটাই জমিদার বাড়ি সেই পুরান অংশ৷ আপুটা বুঝলো কোন দিকে তাকিয়ে আছি৷ যখন বললাম ওই পাশে যাওয়া যায় না৷ সুরেলা আপু রিনিঝিনি কণ্ঠে বললেন, ‘যায় তো ভাইয়া। সে জন্য আপনার মাদ্রাসা থেকে বের হয় পিছনের রাস্তা দিয়ে যেতে হবে।’ আহারে যার কণ্ট এত সুন্দর, না জানি সে কত সুন্দর৷ কত সুরেলা কণ্ঠে সে কোরআনের তেলাওয়াত করে৷ মনে পড়ে গেল লতিফুল ইসলাম শিবলী ভাইয়ের কবিতা

‘সসীমকে ভালোবেসে করেছ পূজা
ভালোবেসে হয়ে গেছ দাস
তোমার অনন্ত মন আর কারো নয়
এক অসীম প্রভুর নিবাস৷’

পুরানের মাঝে আধা কাচা শতবর্ষি নতুন। ছবি: লেখক

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সব সময় যেন এক শান্ত পরিবেশ বিরাজ করে৷ এরপর এতগুলো ধর্মপ্রাণ মুসলিমা কি ভাবে পর্দা করছে দেখে বার বার অভিভূত হয়৷ শহরে ডিস কালচার, ফেবু, ইন্সট্রা, টিকটকের কড়াল গ্রাসে এই মাধুর্য কোথায়৷ পর্দা করা যেন এখন আদিম যুগের কিছু শহরের মেয়েদের কাছে৷ যাই হক সে তো সবার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত৷ কারও উপর তো কিছু চাপিয়ে দেওয়া যায় না। কি অদ্ভূত ইতিহাস, এক কালের হিন্দু জমিদার বাড়ি এখন মহিলা মাদ্রাসা৷ তবে ছবি যে এখনও বাকি৷ ওপারে জমিদার বাড়ি শেষ অংশ টিকে আছে৷ বের হয়ে যাচ্ছি আমরা শ্রীপুর জমিদার বাড়ির এই অংশ থেকে৷ যাওয়ার সময় আপুটাকে ধন্যবাদ জানাতে ভুললাম না৷ দূরে থেকে দাঁড়িয়ে থেকে আপুটি বললো, ইউ আর ওয়েলকাম ভাইয়া।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top