fbpx

ভূষণার রাজা সীতারামের দেশে: আঠারখাদা গ্রাম

ইটের খাঁচার এই শহর ছেড়ে গ্রামের পথে পথে যেন খুঁজে পেয়েছি পথিক এক বুক নিঃশ্বাস। আশেপাশের প্রকৃতি যেন শান্ত সকালের বার্তা নিয়ে আসে। আর আমরা চলছি সিদ্ধেশ্বরী মঠ দেখতে আঠারখাদা গ্রামে। চারপাশে কি সবুজের প্রাচুর্যের চাষ করতে বসেছে এখানে প্রকৃতি। কি নীরব কি শান্ত। অথচ মাগুরা আসবো শুনে সুধী সমাজের কতজন ছা ছা করেছে। এই মাগুরায় কি আছে। মাগুরায় সবুজ আছে, আছে নিরব শান্ত প্রকৃতি, আছে ঐতিহ্য, আছে বাংলার ইতিহাস। আছে ভূষনার রাজা সীতারাম রায়। সে পর্বে আমরা আসবো খুব শিগগড়ি। সবুজের সমরোহের মাঝে উড়ে যায় এক হলুদিয়া পাখি। তারই মাঝেই কি দেখলাম প্রজাপতি। পাখির কুহুতান, পিচঢালা পথ দিচ্ছে আধুনিক গ্রামের ছোঁয়া। এখন মেঠোপথের গ্রামের রাস্তা খুঁজে পাওয়া যে বিরল।

শহরে ভিতরেই যে গ্রাম, গ্রামের ভিতর শহর। মাগুরা পিপড়ার মতই একটা ছোট জেলা শহর। মাগুরা শহর হতে মাত্র দেড় মেইল দূরে আঠারখাদা গ্রাম। সেই গ্রামের নবগঙ্গা নদীর খুব কাছেই অবস্থিত সিদ্ধেশ্বরী মঠ। সু-প্রাচীন যুগে এই মঠ কালিকাতলা শ্মশান নামে পরিচিত ছিল। সেই যুগ থেকেই শ্মশানের সেই মঠে সিদ্ধেশ্বরী মাতার মন্ত্রে-মন্ত্রাঙ্কিত শিলাখণ্ড ও কালীমূর্তি প্রতিষ্ঠিত ছিল। গভীর জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল এই কালিকাতকা শ্মশান। আর এখানেই ছিল সন্ন্যাসীদের তপস্যার তীর্থস্থান। সপ্তদশ শতকে বা তার আগে পরে এখান থেকে নবগঙ্গা নদী ধরে পূণ্যাত্মা ব্যক্তিরা তীর্থে কামরূপ কামাক্ষ্যা যেতেন। যে কারণে এখানে সমাগম বহু সাধু সন্ন্যাসী জাদুকরদের।

শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরীর গেট কাম ব্যানার। ছবি: লেখক

ততদিনে রঙ্গমাচার্য নামে এক সাধক পুরুষের পদধূলি পায় এই সিদ্ধেশ্বরী মঠ। এরও প্রায় অনেক দিন পর ব্রহ্মাণ্ডগিরি বা ব্রহ্মানন্দগিরি নলডাঙ্গার অধিশ্বর শ্রীমন্ত রায় বা রনবীরকে দীক্ষিত করেন এই সন্ন্যাসী। সে সময় থেকেই তিনি কালিকাপুরে তার স্থায়ী খুটি গেড়ে বসেন। তখন এই মঠে সন্ন্যাসীদের বাসপযোগী কোন আশ্রয়স্থল ছিল না। তখন নলডাঙ্গার জমিদার শ্রীমন্ত রায় দীক্ষা গুরুর আদেশ সাধু সন্ন্যাসীদের জন্য বাসপযোগী আশ্রম গড়ে তুলেন। ২৫০ বিঘা জমি দেবোত্তর সম্পদ হিসাবে দান করে উপযুক্ত শিষ্যের পরিচয় দেন। ব্রহ্মাণ্ডগিরি বহুকাল জীবিত ছিলেন। রাজা চণ্ডীচরণ,ইন্দ্রনারায়ণ ও সুরনারায়ণ সবাই তার শিষ্য।

ব্রহ্মাণ্ডগিরি মহাপ্রয়ানের পর মাগুরা কালিকাপুর (বর্তমান আঠারখাদা গ্রাম) পরবর্তী রাজারা সু-দৃষ্টি দেননি। নলডাঙ্গার জমিদারগণ পরবর্তীতে রাজা উপাধি পান। এরপর অনেকেই মঠের জায়গা দখলের প্রচেষ্টা করে, কিন্তু দৈব অভিশাপে দখলকারি সকলেই কালগ্রস্থ বা নির্বংশ হইয়ে যায়। প্রায় দুইশত বছর দেবীর কৃপা দৃষ্টি থেকে বঞ্চিত ছিল এই সিদ্ধেশ্বরী মঠ। জঙ্গালাকীর্ণ হয়ে পড়ে মঠ ও মঠ সংলগ্ন স্থান।

সিদ্ধেশ্বরীর সেই বিখ্যাত শ্মশান। ছবি: লেখক

মায়ের কৃপা থেকে বঞ্চিত দু শতক কাটানোর পর আমলানন্দ নামক একজন ব্রাহ্মন সাধু সন্যাসি স্বপ্নাদেশ অনুসারে উক্ত স্থানে এসে পুনরায় মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। আবার কালিকারপুর জেগে উঠে। ভগ্নস্তুপের উপর জেগে উঠে নতুন মন্দির। তার মধ্যে এক অপূর্ব মৃন্ময়ী কালিকা প্রতিমা স্থাপনা হয়। দুটি শব’ শিশু কাঁধে করে নীল বরনী শ্যামা শিব বক্ষে নৃত্য করেছেন। বর্তমান কালে এরুপ প্রতিমা খুবই বিরল। ততদিনে নলডাঙ্গার রাজাদের ও সুদৃষ্টি ফিরে আসে। তারা মাগুরা কালিকাপুর মঠের অনুকরণে নলডাঙ্গাতে গড়ে তোলে সিদ্ধেশ্বরী দেবীর মন্দির। এরপর আধুনিক বাংলাদেশ পিরিয়ডে মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয় এই মন্দির। কিন্তু ভক্তকূলের কৃপায় আবার নব জাগরণে জেগে সিদ্ধেশ্বরী মঠ।

ইতিহাসের নির্যাসেই তো ডুবে ছিলাম। কখন যে আঠারখাদা গ্রামে এসে পড়লাম। তা খেয়ালই ছিল না। তবে সিদ্ধেশ্বরী মঠে এসে হতাশ হতে হল। পুরুত মশাইকে পাঁচ মিনিট আগে আসলেই ধরতে পারতাম। তিনি বাসায় চলে গেছেন। হয়তো আর এক দুই ঘণ্টা পর আসবেন। তথ্যগুলো দিলেন মঠের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা সাইকেল আরোহী। কোথায় যেন উনার চেহারা দেখেছি মনে করি করি করে মনে পড়ে গেল। উনিই সে ব্যক্তি যাকে আমরা কালীবাড়ি মন্দিরে দেখেছিলাম।

প্রতিষ্ঠাতাদের নাম। ছবি: লেখক

আমাদের পরিচয় দিয়ে বললাম আধা ঘণ্টার ব্যবধানে তাঁর সাথে দেখা হবার কথা। তিনি হো হো করে হেসে দিলেন। বেশ অমায়িক হাসি। বললেন তিনি, আমি আমার দাদা ঠাকুর বাবা সবাই এই মঠের সেবায়ক ছিলেন। আংকেল অনেক তথ্য দিলেন এবং তাঁর বংশ লতিকায় এই মঠের সেবায়ক ছিলেন অনেকেই। এই মন্দির নতুন করে গড়ে তোলা হয়েছে বেশিদিন হয়নি। ২০০৬-০৭ হবে। বর্তমানে এখানে প্রতি পূণ্য তিথিতে পূজা অর্চনা হয়। নতুন মন্দির খনন করার সময় মাটির নিচে না কি পাওয়া গেছে হাজার বছরের পুরানো আগের একটি মন্দিরের ধ্বংসস্তূপ। সেখানে পাওয়া গেছে পুরাতন প্রাচীর এবং বেশ কারুকার্যময় নকশা করা বিভিন্ন আকারের ইট। ইটগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে মন্দিরে।

দুলাল নন্দীর পিতা খুব ধার্মিক মানুষ ছিলেন। শেষ বয়সে এসে মায়ের চরণে পড়ে থাকতেন। আংকেল হঠাৎ বলে উঠলেন রাগ না করলে কি বলবেন, ‘আপনারা কোন ধর্মের?’ আমরা আমাদের ধর্ম বিশ্বাস বলার পর তিনি বললেন মানুষ মানুষে ভেদাভেদ নেই। এইটা জেনে নেওয়াতে আপনাদের প্রতি আমার কোন বিরূপ আচরণ হবে না। আসেন আপনাদের শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরী মঠে মহাশ্মশ্বানটা না হয় দেখিয়ে দেই। এত দূর থেকে এসেছেন যেহেতু আশাহত হবেন না।

শ্মশানের স্নানাগার আর পাশে শিক্ষকের সৌধ। ছবি: লেখক

মঠের পাশেই মহাশ্মশ্বান আর সেই শ্মশ্বানের পাশেই নিতাই চন্দ্র নামে এক শিক্ষকের সৌধ। বেঁচে থাকতে নাকি উনি হিন্দু মুসলিম সবার কাছেই বেশ প্রিয় শিক্ষক ছিলেন। শ্মশ্বান নিয়ে আমার বেশ ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আছে। মনে পড়ে যায় বছর দশেক আগের। যখন আলমডাঙ্গায় বন্ধুর সাথে ঘুরতে গিয়েছিলাম আনন্দধাম কালী মন্দিরের সেই মহাশ্মশ্বান। মনে পড়ে যায় নরবলী দেওয়া সেই দিগম্বর কাপালিকের কথা। রাতে শ্মশ্বানে থাকবো বলে বাজি লাগিয়েছিলাম দুই বন্ধু। কিন্তু মধ্যরাতেই লেজ গুটিয়ে পালাতে হল। সে আর এক গল্প। যাই হোক দিনের শ্মশ্বান বেশ শান্ত নীরব। যেন অনন্ত কাল ধরে অপেক্ষায় আছে সে পোড়া মাংসের গন্ধে সিক্ত হতে। আংকেলের সাথে আমাদের টপিক কাজী রবি পর্যন্ত গড়িয়ে আর দূর গড়াতে পারতো কিন্তু এর আগেই যেন উনি ছুটির ঘণ্টি শুনে ফেললেন। উনার ছেলেকে কোচিং থেকে বাসায় নিতে হবে। বেশ অবাক আমি মাগুরা শহরে ফজরের পর থেকেই কোচিং শুরু হয়ে যায়। আংকেল চলে যাচ্ছেন সেই পিচ ঢালা পথে সাইকেল চালিয়ে আমরা তৈরি হলাম আমাদের নতুন গন্তব্যের পথে।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

ফিচার ছবি: আরিফুর রহমান উজ্জল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top