fbpx

ভূষণার রাজা সীতারামের দেশে: মাগুরা শহর

এসে পড়েছি মাগুরা শহর। বাস থেকে নেমে হালকা আড়মোড়া ভাঙ্গলাম৷ শরীরের জড়তা কাটার পর প্রকৃতি মাতা তার দ্বারে থেকে থেকে ডাক দিচ্ছেন। সে ডাকে সারা না দিলে পাপ হবে। পাশেই ছিল পেট্রোল পাম্প৷ যে ভাবা সেই কাজ৷ আমার কাজ ছিল ছোট৷ ওয়াফি বড় কাজে গিয়ে যে ফেসে গেল৷ বের হবার পর টয়লেটের কর্তা মশাই হাজির৷ জিজ্ঞেস করলেন হাগছেন না মুতছেন। ওয়াফি যখন বড়টা সিগনাল দিল দশ টাকা চেয়ে বসলো কর্তা মশাই৷ দূর থেকে আমি তামাশা দেখছি৷ যেন আমি অদৃশ্য মানব৷ মুখ কালো করে সুখানুভূতিকে বিলীন করে এল৷ চাপমুক্তির সুখ কি দশ টাকার জন্য দুঃখে রূপান্তর হয়৷ জগৎ পিতা কি আজব তোমার মানব সন্তান।

এবার নাস্তা সারার পালা৷ আমি যত গুলো জেলা শহরে গিয়েছি মাগুরার মত শেষ ভাল নাস্তা খেয়েছিলাম বগুড়ায়৷ বাস স্ট্যান্ডের একটি হোটেল ঢুকে নাস্তার অর্ডার দিলাম। তেলের পরোট এল৷ কিন্তু এত হালকা ফুলকা নরম মুখে মাখনের মত গলে যায়৷ সাথে সবজি তোফা খাবার৷ ডাবল ডিম ওয়াফির পাল্লায় পড়ে আমি দুইটা ডিম পোচ অর্ডার করলাম৷ সকাল বেলা তো রাজার হালে খেতে হয়। খাওয়া পর্ব শেষে তৃপ্তির ঢেকুর দিলাম৷ এবার মালাই মারকে চায়ের খোঁজে বের হলাম দুজন।

নিজনান্দুয়ালী গ্রামের সেই শিব মন্দির। ছবি: লেখক

এখন ঘড়িতে বাজে সকাল সাতটা৷ ছোট একটা শহর সবাই জগিং সেরে চায়ের দোকানে ভিড় জমাচ্ছে। সকালের মিষ্টি রোদে চিকন ঘামের রেখা কপাল বেয়ে নেমে গেছে চিবুকের কাছে। এরপর টুপ টুপ করে পড়ে মিশে যাচ্ছে মৃত্রিকার সাথে। সকাল তো দিনের শুরু দেখায়৷ আর আমরা মালাই চা পাব না৷ তা তো হয় না৷ চায়ের দোকানে বেশ ভাল ভিড়৷ চা এর কাপে চুমুক দিয়ে নিজনান্দুয়ালী ও আঠারখাদা গ্রামের দুইটা প্রাচীন স্থাপনা নিয়ে আলাপ পর্ব সেরে নিলাম ওয়াফির সাথে।

এরপর ভ্যান ভাড়া করলাম এই দুইটা গ্রামের স্থাপনা দেখার জন্য৷ সব কিছু ঘুরিয়ে আমাদের শ্রীপুর যাবার বাস স্ট্যান্ডে নামিয়ে দিবে৷ ভ্যানয়ালা মামা একশত টাকা চেয়ে বসলেন আমরাও বাহাস না করে চড়ে বসলাম ভ্যানে৷ এবার পিচ ঢালা পথে চলছে আমাদের ত্রিচক্রযান৷ সকালের দক্ষিণা হাওয়ায় নতুন দিনের গান শুনায়। পাখিদের কলতান ও শুনা যায় প্রকৃতির বুকে৷ আমাদের ভ্যানয়ালা মামা প্রথমে যাবেন নিজনান্দুয়ালী গ্রামে৷৷ পথে মাগুরা শহরের কালীবাড়ি মন্দিরের দর্শণ করিয়ে নিল৷ নলডাঙ্গার রাজা রামদেব মিত্র (১৩২৯ বঙ্গাব্দ) ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে মাগুরা কালীবাড়ী মন্দির নির্মাণ করেন।

টেরাকোটা। ছবি: লেখক

এই কালীবাড়ি মন্দিরে দেখা হল এক আংকেলের সাথে। সেই আংকেল চেহারা স্মরণে ছিল বিধায় তাকে আমরা আঠারখাদ গ্রামে গিয়েও পেয়েছি৷ ভ্যান ঘুরছি মাগুরার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত৷ এর মাঝে বেশ কিছু আধুনিক স্থাপনা মন্দির দেখিয়ে ভ্যানয়ালা মামা আমাদের নিয়ে যাচ্ছে নিজনান্দুয়ালি গ্রামের পথে৷ পথের চলার মাঝে একটা ঘোর আছে৷ সেই ঘোর না কাটতে কাটতেই এসে পড়লাম নিজনান্দুয়ালি গ্রামের সেই বিখ্যাত শিব মন্দির৷

বিখ্যাত হয়ে যে কুখ্যাত হয়ে গেল যেন এই পুরনো স্থাপনা৷ কালের গ্রাসে মন্দিরের ছাদে গাছ গজিয়েছে সে কবে তা হয়তো গ্রামবাসীরাও বলতে পারবে না৷ বলতেও পারলো না এই মন্দির কবে থেকে কত শত বছর ধরে এই গ্রামের বুকে জাঁকিয়ে বসে আছে৷ সে চিরাচরিত প্রশ্ন বানে জর্জরিত আপনারা কি সাম্বাদিক৷ এবার তো ডিএসএলআর ক্যামেরা আনেনি৷ তাই চতুর ভাবে সব জায়গায় বলে বেড়াচ্ছি আমরা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের কাজে এসেছি। সার্ভে যেন অনেক ভারী ইংরেরি শব্দ। তা শুনে বলে আচ্ছা আপনারা সরকারি লুক, তা শুনে আমরা আপাতত চুপ। চুপটি করে দেখা যাক না হয় নিজনান্দুয়ালির সেই শিব মন্দির৷

ছবিয়াল কবি ওয়াফি। ছবি: লেখক

এক চালা বিশিষ্ট শিব মন্দিরটি গঠন বাংলার মাটিতে পাওয়া আর দশটা এক চালা বিশিষ্ট শিব মন্দিরের মতই। তবে এর গায়ে যে এক কালে দর্শনীয় টেরাকোটা ফুটে উঠেছিল তা অদৃশ্য হবার পথে৷ সিড়ির মধ্যে সবুজ ঘাস, সম্মুখ গেটে নতুনের ছাপ তার দুপাশে আবার কালো দাগ৷ যেন চাঁদের কংলক। ঠিকঠাক করা গেলে যে চমকপদ কিছু পাওয়া যেত সে তো আর বলতে হয় না৷ এর মাঝেই ইঁদুরের কিচকিচ শব্দ কোথা থেকে যেন শোনা যাচ্ছে৷ পুরুত মশাই আসলে হয়তো বলতাম চমৎকার ধরা যাক দুয়েকটা ইঁদুর এবার৷

মুগ্ধতার রেশ কাটিয়ে ফিরে এলাম বাস্তবে। ওয়াফি আহমেদ ছবি তোলার জন্য কোতাকুতি শুরু করেছে৷ তার এই কোতাকুতি এখনই অপূর্ণ রাখলে গাল ফুলে থাকবে সারা রাস্তা। এ এক নরম মনের দানব। মাঝে মাঝে মনে হয় বাংলাদেশে তিন গোয়েন্দা সিরিয়াল হলে মুসা আমান চরিত্র ওয়াফি আহমেদ ঠিকই বাগিয়ে নিত৷ আর কি বলা যায়৷ নিজনান্দুয়ালি থেকে বিদায়ের আগে না হয় জেনে নেই মন্দিরের ইতিহাস৷

এক কোনায় ঠাকুর মা। ছবি: ওয়াফি আহমেদ

মাগুরা জেলা শহর থেকে মাত্র ১ কিমি দুরেই এই নিজনান্দুয়ালি গ্রাম। আর এই গ্রামের বুকেই ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই শিব মন্দির। নলডাঙ্গার রাজা রামদেবের বন্ধু কৃষ্ণ চন্দ্র দাস নির্মাণ করেন এই মন্দিরটি ১৭৩৮ সালে৷ প্রায় আড়াইশো বছরের এই মন্দির দেখেছে মোগল, ব্রিটিশ থেকে শুরু করে পাকিস্তান পিরিয়ড৷ আধুনা বঙ্গের কোন কুসঙ্গের পড়ে সে হারিয়েছে নিজ রুপ৷ মন্দিরটি ২৭-৩০ ফুট উঁচু।এর দৈর্ঘ্য প্রস্থ ১২ ফুট ৩ ইঞ্চি ও প্রস্থ ১২ ফুট ৬ ইঞ্চি।

মাগুরা শহর আর গ্রামের ভিতর দূরত্ব বড়ই অল্প৷ এবার আমরা ছুটে যাচ্ছি আঠারখাদা গ্রামের দিকে৷

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top