ভূষণার রাজা সীতারামের দেশে: রাত্রি শেষে গান

ভ্রমণ আর জীবন দুইটা যেন এক সুতোয় গাঁথা৷ ভ্রমণপিপাসু মন থেমে থাকে না। এক গন্তব্য থেকে আর এক গন্তব্যে ছুটে যাওয়ার মাঝেই তো পরিব্রাজক জীবনের মানে খুঁজে পায়৷ আমার ভ্রমণ সঙ্গী সেই চিরাচরিত ডাবল ডিম ওয়াফি যেন জীবনে ফিরে এল নতুন কিছুর গন্তব্যের পথিক হয়ে। সর্বদা অস্থির ওয়াফি সপ্তাহের মাঝেই প্রমোদ গুণলো কোথাও যাওয়ার জন্য৷ আমি ফেসবুক গ্রুপ টিওবি, গুগলে ঘুরেফিরে মরি কোথায় যাওয়া যায়৷ তৎক্ষনাৎ আমাদের শৈশব, কৈশোরকে আনন্দময় করে তোলা হালকা পাগলার মাস্টার মাইন্ড সোহেল আফগানী ভাইয়ের নড়াইলের নৌকা বাইচ নিয়ে একটা পোস্ট খুব সুন্দর ভাবে আমার টাইমলাইনে ভেসে উঠলো৷

১১-১৪ সেপ্টেম্বর এসএমসুলতান মেলা এবং ১৪ তারিখ হবে নৌকা বাইচ। চোখের পলকেই প্ল্যান করে ফেললাম এবার যাব মাগুরা নড়াইল জোনে৷ ঘষে মেজে একটা খসড়া প্ল্যান করে ফেললাম৷ ১৩ তারিখ থাকবো মাগুরা আর ১৪ তারিখ থাকবো নড়াইল জেলা শহরে৷ সে অনুযায়ি বাসের টিকেট কিনতে গিয়ে সেই চিরাচরিত ঈসমাইলের ভাইয়ের দাগা বুকে ছ্যাকা হয়ে লাগলো৷ যথারীতি ১২ তারিখ দুপুরে টিকেট কেটে ফেললাম মাগুরা৷ আমরা যেহেতু সবাই পুরান ঢাকার নিবাসি তাই জর্জকোটের উল্টাদিকে হানিফের কাউন্টার থেকেই টিকেট কাটলাম। সদরঘাট কাউন্টার থেকে আমরা উঠবো সেই গাড়ি যাবে ফুলবাড়িয়া গাবতলী হয়ে৷

দিনের শেষ প্রহর জানায় রাতের আহ্বান। ছবি: লেখক

চারটি টিকেট কাটলাম যেহেতু ঈসমাইল ভাই এবং তার সহকর্মী রাজিব যাবে। সেই দাগার কথা স্মরণে আসলে এখনও রাগ হয়৷ তবে ভাই ব্রাদার বলে কথা। টিকেট কাটার পর তিনি রাতে মাল আসার ভয়াবহ গদ্য শুনালেন৷ খারাপ কিছু ভাববেন না। উনি জ্যাম, জেলী, মধু, ঘিয়ের জার সাপ্লাইয়ের বিজনেস করেন এবং তার সাপ্লাইয়ের হাসি মুখে বলেছেন ঠাকুর আজকে রাতেই মাল নিতে হবে নচেৎ মাল চলে যাবে অন্য পার্টীর কাছে।

তো কি আর করা। হারাধনের চারটি ছেলে পরিণতে হল দুইয়ে৷ ১২ই সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে শুরু হল আমাদে দূর্দান্ত যাত্রার৷ সদরঘাট কাউন্টার থেকে হানিফের যে বাস আসার কথা ছিল ১০:৩০ এ৷ সে বাস এল আধা ঘন্টা লেটে৷ বেনোপোল রুটের গাড়ি৷ বাসের দৈনদশা শুনায় রাত্রি শেষের গান, হানিফই তো ছিল এক সময়ের রোডের প্রাণ৷ রি-বডি করেও লুকাতে পারেনি ভিতরের লক্কর ঝক্কর সিট, আহা হিনো ইঞ্জিনের সে পুরানো মডেল শুনায় যে ঝগড়া রাতে গীত৷

ভূষণা রাজ্যের কোন মন্দিরের টেরাকোটা। ছবি: লেখক

বাস আসার পর ছেড়ে দিলেও হত৷ সে কি হয়! মাল লোড করছে বাসে৷ আর আমি দেখছি হরেক রকম মালের পসরা৷ না জানি মাল শব্দ আমার গল্পে কেন ঘুরে ফিরে বার বার আসছে৷ সে কি শুনাতে চায় কোন নিষিদ্ধ কাব্য৷ যাক সেই কাব্যকে উহ্য রেখে না হয় মালের ফিরিস্তি দেই৷ সয়াবিন তেল থেকে শুরু করে চালের বস্তা, আহা আয়রন স্ট্যান্ডও ছিল বুঝি সস্তা৷ তাই তো তিন অবস্থা। শুধু মনে হয় গরু ছাগল মুরগী নেওয়ায় বাকি৷ গাড়ি দেরি হচ্ছে বিধায় ওস্তাদ খেলেন সে গালি। অভিমানি ওস্তাদ টান যে দিবেন। সেও কি ভাবে দিবেন৷ গুলিস্তানের বিখ্যাত জ্যাম, মধু মাস হলে খেতাম অপেক্ষার আম৷

সেই আমের স্বপ্ন দেখতে দেখতে ডাবল ডিম ওয়াফির কথা স্মরণ হল৷ জগৎ পিতা সে তো বংশাল ঢালে সেই আল নাসিরের সামনে ১০:৩০ থেকে অপেক্ষা করছে৷ জিম করে বাসায় ঢুকেই নাকে মুখে খেয়ে দিয়েছিল ভৌ দৌড়৷ অপেক্ষা গান শুনতে শুনতে সে আল নাসিরের জুস কয় প্যাক মেরে দিল সে হিসাব আমাকে আর কি দিবে৷ সেও খেয়ে ডায়েট করে৷ যাই হোক বাস রায়েসা বাজার আটকিয়ে রইছে প্রায় আধা ঘণ্টা। এর মধ্যে ওয়াফি ফোনের পর ফোন দিয়ে আমাকে ব্যস্ত রাখছে, ‘ওই আশিক ভাই বাস কত দূর!’ আমি শুনাই কোন হারানো সুর৷ অবশেষে বাস বংশাল এল৷ সদা অস্থির ওয়াফি লাফ দিয়ে উঠে পড়লো বাসে৷

বয়ে যায় কুমার নদী ভূষণা রাজার দেশে। ছবি: লেখক

বাসে খানিকক্ষণ সুখ দুঃখের কথা শেষ করার আগেই গুলিস্তানের জ্যাম শেষ, আহা উন্নয়নের বাংলাদেশ৷ এরপর ওস্তাদ যা টান দিলেন সত্যিই ফাইন। বিশ মিনিটে গাবতলি৷ গাবতলি শেষ স্টপেজে গাড়ি ভাল মত লোড করে বুড়ো শরীরে যেন ভর করলো অশুরের আত্মা৷ আমরা দুজন আরও উপহাস করছিলাম এই বুড়ো মাল্লা কি আর টানবে৷ আমাদের ভুল প্রমাণ করতেই যেন ওস্তাদ রাত্রি শেষের গানটা শুনানো বাকি রেখেছিল৷ সব অপমানের গ্লানি যেন মিটিয়ে দিচ্ছে আজ মহাসড়কে। ওটি দিতে দিতে যেন উপহাস করছে আমাদের৷ দেখেছিস বুড়ো হারে এখনও জোর আছে৷

ওয়াফি পাশে গণ্ডারের মত ঘুমাচ্ছে৷ যেন সে নেই এই জগতে৷ আর আমি মায়াবী এই রাতে চলে গেছি যেন অপার্থিব কোন জগতে। মনে পড়ে অতীতের কথা। আর সেই অতীত জুড়ে যে ছিল তাকে হারিয়ে আজ এত বছর পর ও মনে পড়ে৷ আমার ছ্যাকাময় প্রেমের কাব্য শুনতে নিশ্চয়ই আগ্রহী নন৷ নাইট ইস স্টিল ইয়াং৷ আর আমাদের হানিফ বাস চলছে দূরন্ত গতিতে৷ চাঁদের সেই আলো চুইয়ে চুইয়ে এক চিলতে জানলার ফাঁক দিয়ে আমার হৃদয়ের দরবারে আঘাত হানছে৷ কিন্ডেলে পড়ছিলাম টেস গেরিটসনের দ্য সার্জন৷ সেই ভয়াবহ খুনীর গল্প যেন চাঁদের আলোয় মিশে রূপকল্প হয়ে গেল৷ পাটুরিয়া ঘাটের ফেরি পাড়ি দিয়ে আমাদের বাস শুধু চলছে। চলছে সে আমাদের গন্তব্যে৷ আর আমি রাত্রি শেষেড় গানের ইতি টানতেই যেন কবিতায় ফিরে গেলাম।

প্রাচীনকে জাকাইয়া বসেছি। ছবি: লেখক

রাত্রি তুমি আসো কার উঠান জুড়ে
কত শতাব্দি কষ্ট খুঁড়ে বের কর কুড়ে কুড়ে
আলোতে যেন দেখি আধারের আলেয়া
প্রেমিকা আমার চলে যায় কোন খেয়ায়?

শুনাই কবি রাত্রি শেষের গান, বেঁচে আছে ছিটেফোঁটা প্রাণ
আধার যে শেষ হয়নি, শুনো তুমি আধারের কবির গান
প্রিয়ার বুকে খঞ্জর বসাতে পারেনি, নিজেকে করি রক্তাক্ত
নিশাচর পাখি শিষ দিয়ে যায়, আমি যে অভিশপ্ত৷

রাত্রি শেষে ভোরের আলো ফুটেছে ধরণিতে৷ পোচ ডিমের মত কমলা সেই সূর্যের আভা উম দিয়ে যাচ্ছে। আর আমাদের সুপার ভাইজার ডেকে যাচ্ছেন মামা আইসা পড়ছি মাগুরা শহর৷

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top