fbpx

ভূষণার রাজা সীতারামের দেশে: নদের চাঁদ ঘাট

সীতারামের দূর্গ থেকে আমাদের ভ্যান ছুটে যাচ্ছে আর এক কিংবদন্তির ইতিহাস জানতে৷ ছুটে চলছে ভ্যান পাঁচুড়িয়া গ্রামের উদ্দ্যেশে। যাব নদের চাঁদ ঘাট। নদের চাঁদের গল্প কি শুনেছো পরিব্রাজক৷ না শুনলে ক্ষতি নেই৷ এবার না হয় আমাদের সাথে শুনো নদের চাঁদের গল্প।

সীতারামের রাজধানী মোহাম্মদপুরের সেই পাঁচুড়িয়া গ্রামেই নদের চাঁদের জন্ম৷ সেই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যেত মধুমতি নদাই৷ তার জন্মের আগেই নদের চাঁদের বাবা গদাধর পদ্মায় মাছ ধরতে গিয়ে মারা যান। তাই যখন নদের চাঁদ বড় হল একমাত্র বুকের ধন কে মাছ ধরতে দিতে যেতে মায়ের ছিল বড় মানা৷ কিন্তু মাছ ধরতেই জানলেও বা কি, সে যে উড়নচণ্ডী, বাউণ্ডুলে সংসার ধর্মে তার ছিল বড় অনীহা৷ একদিন গভীর রাতে কোন কিছু না বলে চলে যায় নদের চাঁদ বাড়ি ছেড়ে। এরপর পার হয়ে যায় দশটি বছর।

ঘাটে যাবার পথ। ছবি: লেখক

ঠিক দশ বছর পর নদের চাঁদ বাড়ি ফিরে আসে। অশ্রুরত মা বার বার জিজ্ঞেস করেন কোথায় ছিলিরে বাপধন। নদের চাঁদ কিছুই বলে না। চুপটি করে থাকে। মা ছেলে কে ঘরে আটকানোর জন্য দিয়ে দিলেন বিয়ে। নদের চাঁদের বধুর নাম ছিল সরলা। স্ত্রী ভালোবাসায় বাউণ্ডুলে নদের চাঁদ এবার বোধ হয় এক জায়গায় থিতু হয়ে বসলো। তবে সে সুখও বা কয়দিন কপালে জুটলো।

দিন তো সুখেই কেটে যাচ্ছিলো তবে একদিন নদের চাঁদ স্ত্রী সরলার কাছে খুলে বলেন তার দশ বছরের অন্তর্ধানের রহস্য। এই দশ বছর নদ ছিল আসামের কামরুপে। সেখানে এক রুপসী নারীর কাছে জাদুবিদ্যার হাতের খড়ি হয়ে তার। জাদুর মন্ত্রে নদ হয়ে যেত কুমির। স্ত্রী সরলা সরল মনে নদের কাছে আবদার করলো নদ যেন কুমির হয়ে দেখায়।

নারিকেল, খেজুর গাছের রাস্তা। ছবি: লেখক

স্ত্রীর মন কামনা পূরণের জন্য গভীর রাতে দুটি পাত্রে পানি নিয়ে মন্ত্র পড়ে ফু দিলেন নদের চাঁদ। স্ত্রী সরলাকে জানান একটি পাত্রের পানি গাঁয়ে ছিটালে তিনি হয়ে যাবেন কুমির আর এক পাত্রের পানি ছিটালে আবার মানুষ রূপে ফিরে আসবেন তিনি। যে কথা সেই কাজ। নদের চাঁদের কথা মত সরলা প্রথম পাত্র থেকে পানি নিয়ে নদের চাঁদের গায়ে ছিটালো। তৎক্ষনাৎ নদের চাঁদ কুমিরে পরিণত হন। তা দেখে সরলা ভয় পেয়ে যায়। ভয়ে দৌড় দিয়ে পালানোর সময় তার পায়ের স্পর্শে দ্বিতীয় পাত্রের পানি সব পড়ে যায়। নদের চাঁদের মানুষ হবার পথও বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর কুমির রূপে নদের চাঁদ নিজ কুড়ে ঘরে তিন দিন অতিবাহিত করে। এর মধ্যে নদের চাঁদের গুরুকে খবর দিয়ে আনা হয় পাচুড়িয়া গ্রামে। বিধিবাম গুরু আসতে আসতে নদের চাঁদ নেমে যায় পাশের মধুমতি নদীতে, নদের চাঁদের গুরু নদীর তীরে এসে নদের চাঁদকে ডাক দিলে সে ডাকে সাড়া দেয়। গুরুর ডাকে সাড়া দিয়ে ঠিকই নদীর তীরে আসে, তবে তার মুখে ইলিশ মাছ দেখে হতাশ হয় গুরু। আহার করে ফেলার কারণে নদের চাঁদকে আর কখনও মানুষের রূপান্তর করা সম্ভব হবে না বলে জানিয়ে গেল গুরু।

ঘুঘুর ফাদ দেখি গাছে। ছবি: লেখক

এরপর থেকে এক দুখিনী মা বসে থাকতো মধুমতির তীরে। ডাকতো তার প্রাণের ধন নদের চাঁদকে। মা খাবার নিয়ে আসতো, নদ খাবার খেয়ে আবার ফিরে যেত নদীর গর্ভে। এভাবেই বেশ চলছিল মা ছেলের জীবন।

এরপর থেকে নদের চাঁদের মা নদীর পারে বসে থাকতেন। নদকে ডাকলেই চলে আসতেন তিনি। মা খাবার দিতেন। খেয়ে আবার ফিরে যেতেন। বেশ কিছুদিন পর মধুমতির পার দিয়ে যাচ্ছিলো একদল বণিক। জাহাজ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পায় তারা চরে এক বিশাল কুমির। এত বড় কুমির দেখে ভীত হয়ে কুমিরটি মেরে ফেলে বণিকের দল। এরপর থেকে নদের চাঁদ কে আর দেখা যায়নি এই মধুমতির পারে। কারণ মেরা ফেলা কুমিরটি ছিল নদের চাঁদ।

এই নদীতেই ছিল নদের চাঁদের বাস। ছবি: লেখক

আহা মাগুরা। কে বলেছে তোমার বুকে রহস্য নাই। মাগুরা এক রহস্যঘেরা জেলা যার আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে ইতিহাস, সাহিত্য, মিথলজি। মিথের জগৎ থেকে ফিরে আসি বাস্তবে। আমরা এসে গেছি নদের চাঁদের ঘাটে। সেই মধুমতি নদীর তীর যেথায় হারিয়ে গেছে নদের চাঁদ। ঘাটে আজ রমণীদের সমাগম। তা দেখে কিঞ্চিত লজ্জা পেলাম। সখীরা জলকেলি খেলায় মগ্ন, সেদিকে নাই বা তাকালাম।

মধুমতির বুকে একরাশ বিষণ্নতা। আকাশটা যে আজ কালচে, নদীর পানি হল ঘোলাটে। এরপর কি সচ্ছ নদীর পানি। নিশ্চয় আকাশ পরিষ্কার থাকলে নীলের ভুবনে ডুব দেয় মধুমতি। বাশ দিয়ে বাধানো ঘাটটি আগের মতই আছে। এই ঘাটেই তো নদের চাঁদের মা বসে থাকতো, যে ঘাট দিয়ে নদ নেমে গিয়েছিল এই মধুমতির বুকে।

নদের চাঁদ ঘাট। ছবি: লেখক

দেখা শেষ হল নদের চাঁদের ঘাট। তবে গল্পটি ফুরালো না। আমাদের গল্পের প্রথম ভাগের শেষ প্রান্তে এসে পড়েছি। মাগুরা জেলা ঘুরা শেষে এবার রওনা হব নড়াইলে উদ্দ্যেশে। ফিরে এলাম মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ড। ক্ষুধার পেট চো চো  করছে। গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। লোক ভরেনি এখনও আমরা এ ফাকে খেয়ে নিলাম দুপুরের খাবার। গুড়া মাছ, দেশী মুরগী, ডাল, ভাত দিয়ে খাওয়ার পর যখন তৃপ্তির ঢেকুর দিচ্ছি তখনই বাসের হেল্পার আমাদের ডাকতে আসলো বাস ছেড়ে দিল বলে। খাওয়া পর্ব শেষে আমরা দ্রুত বাসে উঠে বসলাম। বাস আমাদের নামিয়ে দিবে ধরলা তিন রাস্তার মোড়। সেখান থেকে উঠতে হবে নড়াইলের বাসে।

সো সো বেগে চলছে আমাদের বাস ২০ মিনিটের মধ্যে ধরলার মোড় এসে পড়লাম। আকাশটা অনেকক্ষন ধরে মেঘাচ্ছন্ন ছিল। এবার যেন ধৈর্য্যের সব বাধ ভেঙ্গে দিল। আঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছে আর আমরা মালাই চায়ের দোকানে বসে প্রতি চুমুকে চুমুকে উপভোগ করছি। এর মধ্যে নড়াইলের বাস আসলো। বৃষ্টিতে ভিজে কোন রকম উঠে পড়লাম বাসে। এবার যে মাগুরা কে বিদায় দেবার পালা। বাস চলছে নড়াইলের পথে আর আমি বিষণ্ন দৃষ্টিতে পিছে তাকিয়ে আছি। বিদায় মাগুরা, তুমি যে ইতিহাসের শহর, তুমি যে বঙ্গ মিথলজির শহর। তোমায় নিয়ে লিখছে কত কথা সাহিত্যিক উপন্যাস, দিলাম তোমায় আমার হৃদয়ে বাস।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top