fbpx

ক্বীন ব্রিজ: সিলেট শহরের প্রবেশদ্বার

মনে আছে কি সিলেটের বিখ্যাত প্রবাদ। চাঁদনী ঘাটের সিঁড়ি/আলী আমজদের ঘড়ি/জিতু মিয়ার বাড়ি/বঙ্কু বাবুর দাঁড়ি। সেই বঙ্কু বাবু অনেক আগে মারা গেলেও টিকে আছে বাকি তিন ঐতিহ্য। এর মধ্যে আলী আমজাদের ঘড়ি সিলেটবাসিদের ১৪৬ বছর ধরে সময় জানিয়ে যাচ্ছে। ছুটছে আমাদের রিক্সা ক্বীন ব্রিজের উদ্দেশে। ক্বীন ব্রিজের আশেপাশেই আলী আমজাদের ঘড়ির অবস্থান।  

আলী আমজদের ঘড়ি। ছবি: লেখক

এ ঘড়ি সুরমা নদীর পাড়ে স্থাপিত হয় ১৮৭৪ সালে। সে বছর তৎকালীন বড় লাট নর্থব্রুক সিলেট সফরে এলে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কুলাউড়ার জমিদার নবাব আলী আহমদ খান ঘড়িটি নির্মাণ করেন। নামকরণ করেন তাঁর নিজের ছেলে আমজদ খানের নামে। সাই সাই বেগে চলে এলাম সুরমা নদীর পাড়ে। ক্বীন ব্রিজকে পাশ কাটিয়ে আলী আমজদের ঘড়ির দিকে এগিয়ে চললো রিক্সা। রিক্সা থেকে নেমে ইতিহাসের সাক্ষী সেই ঘড়িটাকে দুই নয়ন ভরে দেখে নিলাম। অদ্ভুত হলেও সত্যি ২০০৪ এর পর প্রথম আমার সিলেট শহরে আসা। সে সময় যে রকম দেখে গিয়েছিলাম এখনও যেন তেমনেই আছে।   

সুরমা নদীতে ভাসমান রিভার ক্রুজ। ছবি: লেখক

সময় থমকে আছে সেখানে। কিন্তু মাঝখানে চলে গেছে কতগুলো বছর। আমজদ মিয়ার ঘড়ি দেখা শেষে ফিরে এলাম ক্বীন ব্রিজের কাছে। এখানে বিকালে মানুষের আনাগোনা প্রচুর বেড়ে যায়। ক্বীন ব্রিজের রাস্তার পাশে বসেছে নানান খাবারের পসরা নিয়ে। আবার গ্রাহকদের বসার জন্যও আছে সুব্যবস্থা। পথের ক্লান্তি জাকিয়ে বসেছে। ক্লান্তি দূর করতে পারে এক কাপ চা। টংয়ের দোকানে চায়ের অর্ডার দিয়ে বসলাম দুই অভিযাত্রি।

চায়ের কাপ হাত নিয়ে দূরের সেই ক্বীন ব্রিজ দেখছি। এই ব্রিজ লুকিয়ে রেখেছে কত ইতিহাস। সুরমা নদীর উপর স্থাপিত এই লোহার ব্রিজ মূলত সিলেট শহরের প্রবেশদ্বার। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে। আর আমি হারিয়ে গেলাম ইতিহাসের পাতায়। অসংখ্য স্মৃতি বিজড়িত এই ব্রিজ কলোনিয়াল সময়ের সাক্ষী বহন করছে। তৎকালীন আসাম প্রদেশের গর্ভনর মাইকেল ক্বীনের নামে এই ব্রীজের নামকরন করা হয় ক্কীন ব্রিজ।

ক্বীন ব্রিজের পাশে বসে চাপানরত লেখক। ছবি: জুয়েল রানা

১৯৩৬ সালে এই কিংবদন্তির জন্ম হয়। সুরমা নদীর বুক চিড়ে নির্মিত হয় ক্বীন ব্রিজ। সে সময় আসামের সাথে সিলেটে একমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল ট্রেন। তাই সুরমা নদীর উপর দিয়ে একটি রেলওয়ে ব্রিজ করার প্রয়োজনীয়তা একান্ত ভাবে দেখা পরিলক্ষিত হয়। রেলওয়ে বিভাগ ১৯৩৩ সালে এই ব্রিজ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয় এবং এর নির্মাণ শেষ করে ১৯৩৬ সালের প্রথম দিকে।

ক্লান্তি দাও আমার ক্ষমা। ছবি: জুয়েল রানা

আসাম সরকারের এক্সিকিউটিভ সদস্য রায় বাহাদুর প্রমোদ চন্দ্র দত্ত এবং শিক্ষামন্ত্রী আব্দুল হামিদ ব্রিজটি নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তাদের প্রচেষ্টায় নির্মাণ শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হয় ক্বীন ব্রিজ। যা আজ পর্যন্ত ইতিহাসের সাক্ষী বহন করে চলছে। ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর বোমার আঘাতে ব্রিজটির ব্যাপক ক্ষতি সাধন হলেও স্বাধীনতার পর ব্রিজটি কাঠ ও বেইলী পার্টস দিয়ে মেরামত করা হয়। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ের সহযোগিতায় ব্রিজের বিধ্বস্ত অংশটি কংক্রীট দিয়ে পুনঃনির্মাণ করা হয় এবং তৎকালীন নৌ বাহিনীর প্রধান রিয়াল এডমিরাল এম এইচ খান সংস্কারকৃত ব্রিজটি উদ্বোধন করেন; ফলে পুনরায় এটি দিয়ে যান চলাচল শুরু হয়।

সিলেট সার্কিট হাউজ। ছবি: লেখক

ডুবে ছিলাম ইতিহাসে। জুয়েল ভাইয়ের ধাক্কায় ফিরলাম বর্তমান টাইম লাইনে। সুন্দর একটা বিকাল কাটিয়ে সিলেট শহরকে বিদায় ঘণ্টি জানানোর সময় প্রায় ঘনিয়ে এল। এলেবেলে হাঁটার মধ্যেই যেন ফিরে পেলাম জীবনের গতি। কি হবে এত তাড়াহুড়ো করে। সময় না হয় থমকে যাক নতুন কিছুর খোঁজে। সেই নতুনের খোঁজেই হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম সিলেট সার্কিট হাউজের সামনে।

বেশ মনোলোভা সার্কিট হাউজের নির্মাণশৈলী। তবে দুর্ভাগ্য বলতে হবে তাকে দূরে থেলে দেখা ছাড়া উপায় নেই। সুরমা নদীর তীরে বিখ্যাত ক্বীন ব্রিজের ডান পাশেই এই সুন্দর সার্কিট হাউজের অবস্থান। প্রায় ২ একর জমির উপর ২টি সুরম্য ভবন। পর্যটকদের দূর থেকেই চুম্বকের মত আকৃষ্ট করে এই ভবন দুইটি।

জ্বী পথচারী চলাচলের জন্য উন্মুক্ত। ছবি: লেখক

আরেকবার চা পর্ব সেরে। এবার কিছু টুকটাক মার্কেটিংয়ের পালা শুরু হল। সিলেট শহরের ডন রানা ভাই, তাই বাসের টিকেট নিয়ে চিন্তা নাই। আমরা সিলেটের কাঁচা বাজার আসলাম সদাই সেরে নিতে। প্রথমেই আমি গেলাম স্বাদ করা লেবু এবং খাসিয়া পানের দাম দস্তুর করতে। কিন্তু দাম শুনে আকাশ থেকে পড়লাম। বিক্রেতার ফিচকে হাসি মনে সন্দেহের উদ্দ্যেক করে। এই পরিস্থিতিতে ত্রাণকর্তা হিসাবে হাজির হলেন জুয়েল রানা ভাই।

সিলেটে থাকতে থাকতে তার তাদের ভাষাটা বেশ রপ্ত করে ফেলেছে রানা ভাই। আমি যে বস্তুর দাম কমাতে পারলাম। উনি দামাদামি শুরু করার পর সেই বস্তুর দাম হয়ে গেল অর্ধেকের কম। আমি অবাক টিনের চালে কাক। জ্বী আপনি স্থানীয় না হলে এভাবেই সিলেটবাসী আপনাকে বাশ ঝারে নিয়ে যাবে। লেবু ও পান কিনা শেষে এবার চা পাতার খোঁজে চলে এলাম সরকারি চা বাগানের সেলস সেন্টারে। কিনে নিলাম দুই এক প্যাকেট।

মায়ের মমতা মাখানো রান্না। ছবি: লেখক

এবার ক্লান্ত শরীর নিয়ে জুয়েল ভাইয়ের বাসায় ফেরার পালা। আজ চলে যাব তাই রাতে মায়ের মমতা দিয়ে রান্না করলেন ভাত ও ঝাল করা মুরগীর মাংস। সেই মমতার জের যে আমি কত বছর বহন করে নিয়ে চলছি সেই অশ্লীল গল্প না হয় উহ্য থাক। সিলেট কদমতলি বাস স্ট্যান্ড থেকে রাতের বাসে ঢাকা রওনা হলাম। কত গুলো স্মৃতি বুক পকেটে নিয়ে এলাম। সেই স্মৃতির গল্পগুলো হারিয়ে যাবার আগেই লিখে ফেললাম। হয়তো পরের প্রজন্ম এই গল্প পড়ে জানতে পারবে তার পূর্বজের শেকড়। তাদের চোখে না হয় আমার বাংলাদেশটা তুলে দিলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top